দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর
সর্বশেষ

হামের চাপের মাঝেই ঢাকায় নতুন আতঙ্ক ডেঙ্গু: বৃষ্টির পানিতে বাড়ছে এডিসের বিস্তার, সতর্ক প্রশাসন

টানা বৃষ্টিপাতের পর রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে ডেঙ্গুর ঝুঁকি। হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে যখন স্বাস্থ্য খাত কিছুটা চাপের মধ্যে, ঠিক সেই সময়েই এডিস মশার বিস্তার জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। চলতি মৌসুমের শুরুতেই দেশে ডেঙ্গুতে চারজনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে দুইজনই রাজধানীর বাসিন্দা।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৃষ্টি ও উষ্ণ আবহাওয়ার মিশ্রণে ঢাকার পরিবেশ এখন এডিস মশার জন্য অত্যন্ত অনুকূল হয়ে উঠেছে। আর এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে শহরের বিভিন্ন এলাকায়।বৃষ্টির পর ঢাকায় জমে থাকা পানি, বেড়েছে মশার উপদ্রবগত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে রাজধানীর অনেক এলাকায় পানি জমে থাকতে দেখা গেছে। সড়কের পাশে ফেলে রাখা বোতল, ডাবের খোসা, নির্মাণাধীন ভবনের গর্ত—সব জায়গাতেই জমা পানি এখন এডিস মশার প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।[TECHTARANGA-POST:1212]ঢাকার গুলশান এলাকার কড়াইল বস্তির এক দোকানকর্মী আকরাম মিয়া বলেন, “দিনের বেলায়ও কয়েল না জ্বালালে বসে থাকা যায় না। এখন তো এডিস মশা বেশি, দিনে বেশি কামড়ায়।”স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা পানি পরিষ্কার করা হচ্ছে না। ফলে মশার বিস্তার আরও দ্রুত হচ্ছে।কিউলেক্স কমলেও বাড়ছে এডিসের দাপটবৃষ্টির আগে প্রচণ্ড গরমে কিউলেক্স মশার উপদ্রব ছিল বেশি। তবে সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে সেই পরিস্থিতি কিছুটা কমলেও এখন নতুন করে এডিস মশার বিস্তার দেখা যাচ্ছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, এডিস সাধারণত পরিষ্কার পানিতে বংশবিস্তার করে। তবে ঢাকা শহরের বর্তমান বাস্তবতায় তারা বলছেন, নোংরা বা আধা-পরিষ্কার পানিতেও এখন এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে—যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।গুলশান লেকসংলগ্ন কড়াইল এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা ঘোলা পানিও এখন মশার বড় উৎসে পরিণত হয়েছে।নির্মাণাধীন ভবন ও জলাবদ্ধতা: বাড়তি ঝুঁকিরাজধানীতে যত্রতত্র নির্মাণাধীন ভবন এবং সেগুলোর চারপাশে জমে থাকা পানি ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, অনেক ভবনের কাজ দীর্ঘদিন ধরে অসম্পূর্ণ থাকে, ফলে সেখানে পানি জমে মশার প্রজননস্থল তৈরি হয়। একই সঙ্গে ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে বৃষ্টির পানি দ্রুত সরতে পারে না।[TECHTARANGA-POST:1194]তারা মনে করেন, শুধু মশা নিধন অভিযান নয়, বরং নগর ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনা জরুরি।কী বলছেন কীটতত্ত্ববিদরা?জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার জানান, পরিস্থিতি এখনই নিয়ন্ত্রণে না আনলে সামনে ডেঙ্গুর প্রভাব আরও বাড়তে পারে।তিনি বলেন, “টানা বৃষ্টি ও আর্দ্র আবহাওয়া এডিস মশার জন্য খুবই অনুকূল। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি খারাপের দিকে যেতে পারে।”তিনি আরও জানান, গত বছরের তুলনায় এবার ডেঙ্গুর প্রকোপ কিছুটা বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে ২০২৩ সালের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি নাও হতে পারে।মৃত্যুর পরিসংখ্যানেই আতঙ্কের ইঙ্গিতস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে ডেঙ্গুতে মৃত্যু উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২১ সালে দেশে মৃত্যু: ১০৫ জন (ঢাকায় ৯৫ জন) ২০২২ সালে মৃত্যু: ২৮১ জন (ঢাকায় ১৭৩ জন) ২০২৩ সালে মৃত্যু: ১,৭০৫ জন (দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ) ২০২৪ সালে মৃত্যু: ৫৭৫ জন ২০২৫ সালে মৃত্যু: ৪১৩ জন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোট মৃত্যুর প্রায় অর্ধেকই রাজধানী ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বাসিন্দা।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এডিস মশার বিস্তার এখন শুধু শহরেই সীমাবদ্ধ নেই, গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ছে—যা পরিস্থিতিকে আরও বিস্তৃত করছে।দুই সিটির প্রস্তুতি ও অভিযানডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়েছে।ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) লার্ভিসাইডিং ও ফগিং কার্যক্রম জোরদার করেছে। পাশাপাশি ড্রেন, খাল ও জলাবদ্ধ এলাকা পরিষ্কার করা হচ্ছে। কিছু নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষা চালু করা হয়েছে।[TECHTARANGA-POST:1183]ডিএনসিসির প্রশাসক জানিয়েছেন, এবার বাউল গানের মাধ্যমে জনসচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ৭৫টি ওয়ার্ডে প্রাক-বর্ষা এডিস লার্ভা জরিপ শুরু করেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে দ্রুত হটস্পট চিহ্নিত করা হবে।ডিএসসিসি মোবাইল কোর্ট, জরিমানা, খাল-ড্রেন পরিষ্কার এবং মাসিক ক্লিনিং ডে পালনের উদ্যোগও নিয়েছে।স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অবস্থানস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক ডা. হালিমুর রশিদ জানান, ডেঙ্গু নিয়ে স্বাস্থ্য প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় আছে।তিনি বলেন, “হাম বা অন্য কোনো রোগের কারণে ডেঙ্গুকে কম গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে—এমন নয়। আমরা সমান গুরুত্ব দিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি।”তিনি আরও জানান, হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগ ব্যবস্থাপনার জন্য ফোকাল পয়েন্ট নির্ধারণ করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ ও স্যালাইন পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে।নগর ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ননগর বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ডেঙ্গুর মূল সমস্যা শুধু মশা নয়, বরং নগর ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের দুর্বলতা।ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ঢাকার অতিরিক্ত জনঘনত্ব, জলাবদ্ধতা এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধি এডিস মশার জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করছে।তিনি আরও বলেন, “শুধু ফগিং করে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নগর পরিকল্পনা এবং পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন দরকার।”সামাজিক প্রভাব ও বাস্তবতাডেঙ্গু এখন শুধু একটি স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, এটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপও তৈরি করছে। নিম্ন আয়ের মানুষরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে, কারণ অনেকেই দিনে মজুরির কাজ করেন এবং মশার হাত থেকে সুরক্ষার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা তাদের নেই।অন্যদিকে হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়লে চিকিৎসা ব্যয়ও বাড়ে, যা সাধারণ পরিবারের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে শহরের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে আরও দুর্বল করে দিতে পারে।উপসংহারবর্তমানে ঢাকা শহর একসঙ্গে দুইটি বড় জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখোমুখি—হাম ও ডেঙ্গু। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গুর বিস্তার এখন বেশি গতিশীল ও পরিবেশ-নির্ভর। বৃষ্টির পানি, জলাবদ্ধতা এবং নগর অব্যবস্থাপনা মিলিয়ে পরিস্থিতি আগামী দিনে আরও জটিল হতে পারে। সরকার ও সিটি করপোরেশন নানা উদ্যোগ নিলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নাগরিক সচেতনতা ছাড়া এই সমস্যা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। ঘরবাড়ি পরিষ্কার রাখা, জমে থাকা পানি সরানো এবং ব্যক্তিগত সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ।

হামের চাপের মাঝেই ঢাকায় নতুন আতঙ্ক ডেঙ্গু: বৃষ্টির পানিতে বাড়ছে এডিসের বিস্তার, সতর্ক প্রশাসন