কুড়িগ্রামে বিভক্ত আয়োজনে মে দিবস: অধিকার আড়ালে, প্রচারণাই সামনে
আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস ঘিরে কুড়িগ্রামে ছিল রঙিন ব্যানার, আলাদা আলাদা শোভাযাত্রা আর নানা আয়োজন। কিন্তু এসব আয়োজনের ভিড়ে শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার ও বাস্তব সমস্যাগুলো কতটা গুরুত্ব পেয়েছে—সেই প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।শুক্রবার (১ মে) “সুস্থ শ্রমিক, কর্মঠ হাত; আসবে এবার নবপ্রভাত”—এই প্রতিপাদ্য সামনে রেখে কুড়িগ্রাম জেলার বিভিন্ন উপজেলায় দিবসটি উদযাপন করা হয়। তবে একই দিনে পৃথক ব্যানার, রাজনৈতিক পরিচয় ও সংগঠনভিত্তিক কর্মসূচিতে বিভক্তভাবে আয়োজন হওয়ায় শ্রমিকদের মূল দাবিগুলো অনেকটাই আড়ালে পড়ে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।বিভক্ত আয়োজনে দিনব্যাপী কর্মসূচিকুড়িগ্রাম সদরসহ রাজারহাট, উলিপুর, চিলমারী, নাগেশ্বরী, ভূরুঙ্গামারী, রৌমারী ও রাজিবপুর উপজেলায় পৃথকভাবে র্যালি, মানববন্ধন ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা নিজ নিজ ব্যানারে অংশ নেন।মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, প্রতিটি আয়োজনে অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের সংগঠন ও রাজনৈতিক পরিচয় তুলে ধরতে বেশি মনোযোগী ছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এসব কর্মসূচির ছবি ও প্রচারণা আলাদাভাবে প্রকাশ করতে দেখা যায়।একজন স্থানীয় পর্যবেক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “একই দিবস হলেও সবাই আলাদা আলাদা কর্মসূচি করছে। এতে ঐক্যের জায়গাটা দুর্বল হয়ে যাচ্ছে, আর শ্রমিকদের বাস্তব সমস্যাগুলো পেছনে পড়ে যাচ্ছে।”[TECHTARANGA-POST:1010]শ্রমিকদের বাস্তবতা: দাবি আর বাস্তবতার ফারাকদিবসটিকে ঘিরে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে জোরালো বক্তব্য এলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন বলে জানিয়েছেন অনেক শ্রমজীবী মানুষ। বছরজুড়ে তাদের জীবনসংগ্রামে তেমন পরিবর্তন আসে না বলে অভিযোগ রয়েছে।নিম্ন আয়ের কারণে অনেক শ্রমিক পরিবার পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করতে পারেন না। বসবাসের জন্য নিরাপদ আবাসনের অভাবও রয়েছে। চিকিৎসা সেবা অনেক ক্ষেত্রেই তাদের নাগালের বাইরে থেকে যায়, ফলে সামান্য অসুস্থতাও বড় সমস্যায় রূপ নেয়।একজন দিনমজুর বলেন, “মে দিবসে অনেক কথা হয়, কিন্তু আমাদের জীবন তো একই রয়ে যায়। কাজ না থাকলে খাওয়া থাকে না—এই বাস্তবতা বদলায় না।”শিক্ষা ও সামাজিক বৈষম্যশ্রমিক পরিবারের সন্তানদের বেশিরভাগই স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে। তবে অনেক ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত মানের শিক্ষা নিশ্চিত হয় না। দারিদ্র্যের কারণে প্রাইভেট বা কোচিংয়ের সুযোগ না থাকায় তারা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে।অন্যদিকে, সচ্ছল পরিবারের সন্তানদের উন্নত শিক্ষা, চিকিৎসা ও জীবনযাত্রার সুযোগ-সুবিধা তুলনামূলক অনেক বেশি। এই বৈষম্য সমাজের একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উঠে এসেছে।একজন শিক্ষক বলেন, “শিক্ষার সুযোগে বৈষম্য থাকলে ভবিষ্যতেও এই শ্রেণিভেদ থেকে যাবে। শ্রমিক পরিবারের সন্তানদের জন্য বিশেষ সহায়তা দরকার।”শ্রমিকদের প্রত্যাশা কী?শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—
ন্যায্য মজুরি ও সময়মতো বেতন
নিরাপদ কর্মপরিবেশ
চিকিৎসা সুবিধা ও সামাজিক নিরাপত্তা
পর্যাপ্ত খাদ্য ও বাসস্থানের নিশ্চয়তা
শ্রম আইন বাস্তবায়ন
সন্তানের জন্য মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ
তাদের দাবি, এসব বিষয় বাস্তবায়ন ছাড়া মে দিবসের আয়োজন শুধুই আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থেকে যায়।বক্তব্যে যা বললেন সংশ্লিষ্টরাএনসিপির ভূরুঙ্গামারী উপজেলা মূখ্য সংগঠক মো. মাহফুজুল ইসলাম (কিরন) বলেন, “কাজ করতে গিয়ে আহত বা নিহত শ্রমিকদের সরকারিভাবে সম্মাননা ও আর্থিক সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন। শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।”কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির সদস্য সচিব ও জেলা পরিষদের প্রশাসক সোহেল হোসাইন কায়েকোবাদ জানান, তিনি মে দিবসের র্যালি ও আলোচনা সভায় অংশ নিয়েছেন। তবে এ উপলক্ষে সরকারিভাবে কী কী সহায়তা দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানাতে পারেননি।জেলা শ্রম অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আতাউর রহমান মন্ডল বলেন, “মে দিবস পালনের জন্য কোনো বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। নির্দেশনা অনুযায়ী র্যালি ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শ্রমিকদের জন্য আলাদা কোনো খাদ্য, সম্মাননা বা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়নি।”[TECHTARANGA-POST:1018]প্রচারণা বনাম বাস্তব উদ্যোগস্থানীয়দের একটি অংশ মনে করেন, দিবসটি ঘিরে রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলো প্রচারণামূলক কর্মকাণ্ডেই বেশি মনোযোগী থাকে। শ্রমিকদের অংশগ্রহণ থাকলেও তাদের বাস্তব সমস্যা সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ কম দেখা যায়।একজন শ্রমিক নেতা বলেন, “শ্রমিকদের সামনে রেখে অনেকেই নিজেদের প্রচার করে। কিন্তু বছরজুড়ে শ্রমিকদের পাশে কতটা থাকে, সেটাই আসল বিষয়।”অভিযোগের বিষয়ে প্রতিক্রিয়াবিভক্ত আয়োজন ও প্রচারণা-কেন্দ্রিক কার্যক্রমের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।ইতিহাসের আলোকে মে দিবসমে দিবসের ইতিহাস শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। ১৮৮৬ সালের ১ মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে ৮ ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবিতে শ্রমিকরা আন্দোলন শুরু করেন। ৪ মে ‘হে মার্কেট’ ঘটনার পর বিশ্বজুড়ে শ্রমিক আন্দোলনের প্রতীক হিসেবে দিনটি পালিত হয়ে আসছে।এই ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেয়, মে দিবস কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়—বরং অধিকার আদায়ের একটি প্রতীকী দিন।কুড়িগ্রামে এবারের মে দিবস উদযাপন আয়োজনের দিক থেকে সমৃদ্ধ হলেও শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার ও বাস্তব সমস্যার সমাধান নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে। বিভক্ত আয়োজনের কারণে ঐক্যের বার্তা দুর্বল হয়েছে বলে মনে করছেন অনেকেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করতে হলে শুধু একদিনের কর্মসূচি নয়, বরং বছরজুড়ে কার্যকর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন জরুরি। একই সঙ্গে সকল পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগই পারে শ্রমিকদের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনতে।