দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর
সর্বশেষ

চার খাতে বাংলাদেশি দক্ষ কর্মী নিতে চায় কাতার, বাড়তে পারে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ

বাংলাদেশ থেকে আরও বেশি দক্ষ কর্মী নিতে আগ্রহ দেখিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতার। বিশেষ করে ইলেকট্রিশিয়ান, প্লাম্বার, এসি টেকনিশিয়ান ও ওয়েল্ডিং খাতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাংলাদেশি কর্মীদের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করেছেন দেশটির শ্রমমন্ত্রী ড. আলী বিন সামিখ আল মাররি। দুই দেশের যৌথ কমিটির বৈঠকে এই আগ্রহের কথা তুলে ধরা হয়।সোমবার (১৮ মে) ঢাকায় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-কাতার সপ্তম যৌথ কমিটির বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী।[TECHTARANGA-POST:1380]বর্তমানে কাতারের বিভিন্ন খাতে লাখো বাংলাদেশি কর্মরত থাকলেও নতুন করে দক্ষ কর্মী নিয়োগের আগ্রহকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি বাস্তবায়ন হলে দেশের কারিগরি শিক্ষার ক্ষেত্রেও নতুন গতি আসতে পারে।দক্ষ কর্মীদের চাহিদায় গুরুত্ব পাচ্ছে বাংলাদেশবৈঠকে কাতারের শ্রমমন্ত্রী জানান, দেশটির বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ও অবকাঠামো খাতে দক্ষ কর্মীর প্রয়োজন বাড়ছে। এ কারণে বাংলাদেশের কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো থেকে সরাসরি প্রশিক্ষিত কর্মী নিতে চায় কাতার।বিশেষ করে চারটি খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে—ইলেকট্রিশিয়ান, প্লাম্বার, এসি টেকনিশিয়ান এবং ওয়েল্ডিং। কাতারের পক্ষ থেকে বলা হয়, এসব খাতে বাংলাদেশি কর্মীদের কাজের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা ইতোমধ্যে ইতিবাচক সুনাম তৈরি করেছে।বৈঠকে আরও জানানো হয়, বাংলাদেশের পাঁচটি নির্দিষ্ট কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সঙ্গে সরাসরি সমন্বয়ের মাধ্যমে কর্মী নেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ রয়েছে কাতারের। যদিও কোন পাঁচটি কেন্দ্রকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।কাতারে কর্মরত প্রায় পাঁচ লাখ বাংলাদেশিপ্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বৈঠকে বলেন, বর্তমানে কাতারে চার লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মী বিভিন্ন খাতে কাজ করছেন। তারা শুধু নিজেদের পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তনই করছেন না, দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহেও বড় অবদান রাখছেন।অন্যদিকে কাতারের শ্রমমন্ত্রী জানান, তাদের হিসাবে বর্তমানে প্রায় ৪ লাখ ৭৩ হাজার বাংলাদেশি কর্মরত আছেন। এর মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ বিভিন্ন উন্নয়ন ও নির্মাণ প্রকল্পে যুক্ত।তিনি বাংলাদেশি কর্মীদের কর্মনিষ্ঠা, শৃঙ্খলা ও অভিযোজন ক্ষমতার প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতেও বাংলাদেশ থেকে দক্ষ জনশক্তি নিতে আগ্রহের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।বাড়ছে বিদেশগামী কর্মীর সংখ্যাবৈঠকে তুলে ধরা তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাংলাদেশ থেকে ১ লাখ ৭ হাজার ৫৯৮ জন কর্মী কাতারে গেছেন। চলতি বছর এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।বাংলাদেশের শ্রমবাজার বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে এখন ধীরে ধীরে অদক্ষ শ্রমিকের পরিবর্তে প্রশিক্ষিত কর্মীদের চাহিদা বাড়ছে। ফলে শুধু বিদেশে যাওয়ার সুযোগ নয়, ভালো বেতন ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ পাওয়ার ক্ষেত্রেও দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।এ কারণে সরকার পরিচালিত টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারগুলোতে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ চালুর বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পায়।বিভাগীয় শহরে ভিসা ও মেডিকেল সেন্টার চায় বাংলাদেশবৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কাতারগামী কর্মীদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়া ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা সহজ করার দাবি জানানো হয়।প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে রাজধানীকেন্দ্রিক নানা প্রক্রিয়ার কারণে অনেক কর্মীকে অতিরিক্ত খরচ ও ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়। তাই দেশের আটটি বিভাগীয় শহরে কাতারের ভিসা ও মেডিকেল সেন্টার স্থাপনের আহ্বান জানানো হয়েছে।[TECHTARANGA-POST:1367]সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে দেশের দূরবর্তী অঞ্চলের কর্মীরা সহজে বিদেশগমনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারবেন। এতে সময় ও ব্যয়—দুইই কমবে।চিকিৎসক, নার্স ও ধর্মীয় শিক্ষকদের চাহিদার কথাও উঠলবৈঠকে প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক কাতারের শ্রমবাজারে আরও বৈচিত্র্যময় পেশায় বাংলাদেশিদের নিয়োগের অনুরোধ জানান।তিনি বলেন, শুধু নির্মাণশ্রমিক নয়, বাংলাদেশ থেকে দক্ষ ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, নার্স, কেয়ারগিভার, ইমাম, মুয়াজ্জিন ও ধর্মীয় শিক্ষক নেওয়ারও সুযোগ রয়েছে। এসব খাতে প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি করা গেলে দুই দেশই লাভবান হবে।তবে সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, এসব পেশায় বিদেশে কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে আন্তর্জাতিক মানের ভাষা দক্ষতা, পেশাগত সনদ এবং বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণের ওপর আরও জোর দিতে হবে।অদক্ষ শ্রমিককে দক্ষ করতে কাতারের উদ্যোগকাতারের শ্রমমন্ত্রী বৈঠকে জানান, অদক্ষ কর্মীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে তুলতে দেশটিতে ইতোমধ্যে দুটি বিশেষ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালু করা হয়েছে।এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন শ্রমবাজার সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, বিদেশে গিয়ে কাজ শেখার পরিবর্তে আগে থেকেই নির্দিষ্ট দক্ষতা অর্জন করলে কর্মীরা বেশি বেতন ও ভালো কর্মপরিবেশ পেতে পারেন।একই সঙ্গে এতে শ্রমিক নির্যাতন, প্রতারণা বা চাকরি হারানোর ঝুঁকিও কিছুটা কমে আসে।সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাববাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয় একটি বড় চালিকাশক্তি। প্রতি বছর লাখো মানুষ কাজের সন্ধানে বিদেশে যান। তবে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে, অনেকেই প্রয়োজনীয় দক্ষতা ছাড়া বিদেশে গিয়ে কম মজুরি ও অনিশ্চিত পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য হন।[TECHTARANGA-POST:1364]এই পরিস্থিতিতে কাতারের মতো বড় শ্রমবাজার যদি সরাসরি দক্ষ কর্মী নিতে আগ্রহী হয়, তাহলে তা দেশের কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থা ও কর্মসংস্থানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করতে পারে।বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু লোক পাঠানোর সংখ্যার দিকে নজর না দিয়ে এখন দক্ষতা, নিরাপত্তা এবং সম্মানজনক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার দিকে জোর দেওয়া প্রয়োজন। তা না হলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকবে।বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন যারাবাংলাদেশ-কাতার যৌথ কমিটির বৈঠকে বাংলাদেশে নিযুক্ত কাতারের রাষ্ট্রদূত আলি মাহদি সাঈদ আল-কাহতানি, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোখতার আহমেদ এবং প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ড. শাকিরুল ইসলামসহ দুই দেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকের পর তাৎক্ষণিকভাবে কোনো নতুন চুক্তি সই না হলেও দক্ষ কর্মী নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ সহযোগিতা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা আরও এগিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

চার খাতে বাংলাদেশি দক্ষ কর্মী নিতে চায় কাতার, বাড়তে পারে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ