দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর
সর্বশেষ

এনসিটিবির বিনা মূল্যের বই ছাপায় ১৮৩ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ, নিরীক্ষায় চাঞ্চল্যকর তথ্য

বিনা মূল্যের বই ছাপায় ১৮৩ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ, প্রশ্নের মুখে এনসিটিবির নজরদারিপ্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের হাতে বছরের প্রথম দিন বিনা মূল্যের পাঠ্যবই তুলে দেওয়ার কর্মসূচি বাংলাদেশের অন্যতম বড় সামাজিক উদ্যোগ। কিন্তু সেই বই ছাপানোর কাজ ঘিরেই এবার সামনে এসেছে শতকোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ। শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের এক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ শিক্ষাবর্ষের বিনা মূল্যের পাঠ্যবই মুদ্রণ ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে বিভিন্ন ধরনের অনিয়মের কারণে সরকারের প্রায় ১৮৩ কোটি ২০ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।[TECHTARANGA-POST:1577]সরকারি নিরীক্ষায় উঠে আসা এসব তথ্য ইতোমধ্যে শিক্ষা প্রশাসনে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছে। বিশেষ করে অতিরিক্ত ভাতা গ্রহণ, নিয়মিত কাজের জন্য সম্মানী নেওয়া, ভ্যাট-কর আদায়ে গাফিলতি এবং সরকারি কোষাগারে অর্থকোথায় গেল শত কোটি টাকা?শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে সবচেয়ে বড় অনিয়ম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে অর্থবছর শেষে অতিরিক্ত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ার বিষয়টি। নিরীক্ষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত অংশ বোর্ডের তহবিলে রেখে বাকি অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার কথা থাকলেও তা করা হয়নি। এ খাতে সরকারের সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ১৬৭ কোটি ৫৫ লাখ ৮৫ হাজার টাকার বেশি।অন্যদিকে বই মুদ্রণসংক্রান্ত বিভিন্ন বিল থেকে ভ্যাট ও আয়কর সঠিকভাবে আদায় না করায় আরও ১২ কোটির বেশি টাকার রাজস্ব ক্ষতির অভিযোগ উঠেছে। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এসব অর্থ আদায় করে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।সম্মানী ও ভাতার নামে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগপ্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাঠ্যবই উৎপাদন ও বিতরণ কার্যক্রমে যুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আগে থেকেই একাধিক সম্মানী ভাতা পেয়ে থাকেন। তারপরও ‘উদ্দীপনা ভাতা’সহ বিভিন্ন নামে অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।নিরীক্ষকদের তথ্য অনুযায়ী, ২১০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং একটি প্রকল্পের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রায় ৯২ লাখ ৪৩ হাজার টাকা উদ্দীপনা ভাতা হিসেবে দেওয়া হয়েছে, যদিও এ ধরনের ভাতার কোনো বিধান নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। জন্যও চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রায় ৭৬ লাখ টাকার সম্মানী দেওয়া হয়েছে, যা নিয়েও আপত্তি তুলেছেন নিরীক্ষকরা।ছাপাখানা দেখভালে দ্বৈত ব্যয়ের অভিযোগনিরীক্ষা প্রতিবেদনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে বলা হয়েছে, বই ছাপানোর কাজ পর্যবেক্ষণের জন্য একটি স্বাধীন তদারকি প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করা হয়েছিল এবং তাদের বিলও পরিশোধ করা হয়েছে। এরপরও একই কাজের জন্য এনসিটিবির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অতিরিক্ত তদারকি ভাতা দেওয়া হয়েছে।[TECHTARANGA-POST:1559]এ খাতে প্রায় ৬৪ লাখ ৫১ হাজার টাকার ব্যয়কে বিধিবহির্ভূত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি বই মুদ্রণসংক্রান্ত বিভিন্ন কমিটির সদস্যদের অতিরিক্ত হারে সম্মানী দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে, যার পরিমাণ ৩১ লাখ টাকার বেশি।বছরের পর বছর একই অভিযোগ কেন?এনসিটিবির কয়েকজন কর্মকর্তা এবং মুদ্রণ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, পাঠ্যবই ছাপানোকে ঘিরে অনিয়মের বিষয়টি নতুন নয়। সংশ্লিষ্ট মহলে দীর্ঘদিন ধরেই এ নিয়ে আলোচনা রয়েছে। প্রতিবছর বিভিন্ন অভিযোগ সামনে এলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা দেখা যায় না বলে অভিযোগ রয়েছে।শিক্ষা খাত বিশ্লেষকদের মতে, বড় অঙ্কের সরকারি প্রকল্পে পর্যাপ্ত জবাবদিহি না থাকলে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়। বিশেষ করে যখন একই কাজে একাধিক পর্যায়ে অর্থ ব্যয়ের সুযোগ থাকে, তখন স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা আরও জরুরি হয়ে পড়ে।শিক্ষার্থীদের ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে?বিনা মূল্যের পাঠ্যবই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো দেশের সব শিক্ষার্থীর হাতে সময়মতো মানসম্মত বই পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু মুদ্রণ ও বিতরণ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তার প্রভাব শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অর্থ ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা থাকলে বইয়ের গুণগত মান, সময়মতো সরবরাহ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর ফলে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়তে পারে শিক্ষার্থীরাই।সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ হওয়া প্রতিটি টাকা সরাসরি দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই এই ধরনের অভিযোগ মানুষের মধ্যে আস্থার সংকটও তৈরি করতে পারে।কী বলছে কর্তৃপক্ষ?নিরীক্ষা প্রতিবেদন নিয়ে জানতে চাইলে এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু নাসের টুকু বলেন, তিনি সম্প্রতি দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বক্তব্য জানতে শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।[TECHTARANGA-POST:1538]এদিকে দুর্নীতি পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, শিক্ষার্থীদের জন্য পরিচালিত এমন গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিতে অনিয়মের অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাঁর মতে, অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রয়োজনে দুর্নীতি দমন কমিশনের সম্পৃক্ততাও নিশ্চিত করা উচিত।বর্তমানে নিরীক্ষা আপত্তির বিষয়ে এনসিটিবি জবাব প্রস্তুত করছে বলে জানা গেছে। সেই জবাব এবং পরবর্তী তদন্তের ফলাফলই নির্ধারণ করবে অভিযোগগুলোর বাস্তবতা কতটা এবং এ ঘটনায় কারা দায়ী।

এনসিটিবির বিনা মূল্যের বই ছাপায় ১৮৩ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ, নিরীক্ষায় চাঞ্চল্যকর তথ্য