পবিপ্রবিতে ডিফেন্স বন্ধে উত্তাল পরিস্থিতি, একাডেমিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (পবিপ্রবি) শিক্ষকদের চলমান শাটডাউন কর্মসূচির কারণে অনার্স ফাইনাল ইয়ারের থিসিস ডিফেন্স বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন শিক্ষার্থীরা। পূর্বনির্ধারিত ডিফেন্স কার্যক্রম বন্ধ থাকায় মঙ্গলবার (১২ মে) দুপুরে শিক্ষার্থীরা একাডেমিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে বিক্ষোভ করেন। এতে ক্যাম্পাসে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক অচলাবস্থা আরও গভীর হয়।শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, দীর্ঘ প্রস্তুতির পরও হঠাৎ করে ডিফেন্স বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের সেশনজট, ইন্টার্নশিপ এবং ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।হঠাৎ থেমে যাওয়া ডিফেন্স, ক্ষোভে ফেটে পড়েন শিক্ষার্থীরামঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানিমেল সায়েন্স অ্যান্ড ভেটেরিনারি মেডিসিন (এএনএসভিএম) অনুষদের ২০১৯-২০ সেশনের (সেকশন এ) শিক্ষার্থীরা একাডেমিক ভবনের সামনে জড়ো হন। কিছুক্ষণ পর তারা একাডেমিক ভবনের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন।[TECHTARANGA-POST:1233]শিক্ষার্থীদের দাবি, তাদের ব্যাচের একটি বড় অংশের ডিফেন্স ইতিমধ্যে সম্পন্ন হলেও বাকিদের ডিফেন্স মাঝপথে বন্ধ হয়ে যায়। এই অনিশ্চয়তার কারণে তারা চরম মানসিক চাপ ও ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।এক শিক্ষার্থী বলেন,
“আমরা মাসের পর মাস প্রস্তুতি নিয়েছি। অনেকেই ডিফেন্স শেষ করতে পারেনি শুধু এই হঠাৎ সিদ্ধান্তের কারণে। এখন আমাদের ভবিষ্যৎ ঝুলে গেছে।”শিক্ষকদের শাটডাউন কর্মসূচি ঘিরে শুরু হওয়া সংকটজানা গেছে, ১১ মে স্থানীয় একটি ঘটনায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে উত্তেজনার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের একাংশ শিক্ষক ক্লাস, পরীক্ষা ও সব ধরনের একাডেমিক কার্যক্রম বর্জনের ঘোষণা দেন। এই সিদ্ধান্তের পরই মূলত ডিফেন্স কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়।তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পরে একাডেমিক কার্যক্রম চালু রাখার নির্দেশনা দিলেও বাস্তবে সেটি পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। শিক্ষকদের একটি অংশ শাটডাউন চালিয়ে যাওয়ায় প্রশাসনিক নির্দেশনা ও বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে বড় ধরনের সমন্বয়হীনতা দেখা দেয়।ফলে শিক্ষার্থীরা মাঝামাঝি অবস্থায় পড়ে যান—একদিকে প্রশাসনের নির্দেশনা, অন্যদিকে শিক্ষকদের বর্জন কর্মসূচি।একাডেমিক ভবনে তালা, সাময়িক অবরুদ্ধ শিক্ষকরাবিক্ষোভ চলাকালে শিক্ষার্থীরা একাডেমিক ভবনের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেন। এ সময় ভবনের ভেতরে থাকা কয়েকজন শিক্ষক সাময়িকভাবে আটকে পড়েন বলে জানা যায়।তবে পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি এবং পরে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে।প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, আন্দোলন শান্তিপূর্ণ থাকলেও শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ ও হতাশা স্পষ্ট ছিল। তারা দ্রুত ডিফেন্স কার্যক্রম পুনরায় চালুর দাবি জানান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাভাবিক একাডেমিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানান।[TECHTARANGA-POST:1230]শিক্ষার্থীদের অভিযোগ: ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছেশিক্ষার্থীরা বলছেন, ডিফেন্স বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে তাদের একাডেমিক জীবন বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। অনেকেই ইন্টার্নশিপ শুরু করার কথা থাকলেও তা অনিশ্চিত হয়ে গেছে।একজন শিক্ষার্থী বলেন,
“ডিফেন্স শেষ না হলে আমরা সার্টিফিকেট পাব না। ইন্টার্নশিপও শুরু করতে পারব না। এতে আমাদের পুরো ক্যারিয়ার পিছিয়ে যাচ্ছে।”আরেকজন শিক্ষার্থী অভিযোগ করেন,
“একদিকে প্রশাসন বলছে ক্লাস-পরীক্ষা চলবে, অন্যদিকে শিক্ষকরা বন্ধ রেখেছেন। এই দ্বন্দ্বের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি আমরা।”প্রশাসন ও অনুষদ কর্তৃপক্ষের অবস্থানএএনএসভিএম অনুষদের ডিন ড. খোন্দকার জাহাঙ্গীর আলম জানান, শিক্ষকদের ওপর হামলার ঘটনার প্রতিবাদে শাটডাউন চলায় ডিফেন্স কার্যক্রম স্থগিত করতে হয়েছে।তিনি বলেন,
“পরিস্থিতির কারণে সাময়িকভাবে ডিফেন্স বন্ধ রাখা হয়েছে। বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে জানানো হয়েছে এবং দ্রুত সমাধানের আশ্বাস পাওয়া গেছে।”বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা চলছে বলে জানা গেছে, তবে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়নি।ক্যাম্পাসে অচলাবস্থা ও দ্বন্দ্বের ছায়াশিক্ষক-শিক্ষার্থীদের এই অবস্থানের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্যত এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। ক্লাস, পরীক্ষা ও গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পুরো শিক্ষাবর্ষের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।[TECHTARANGA-POST:1213]বিশ্লেষকদের মতে, প্রশাসন ও শিক্ষকদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবই এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ ধরনের দ্বন্দ্ব দীর্ঘস্থায়ী হলে তা শিক্ষার্থীদের ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।সামাজিক প্রভাব: শিক্ষা ব্যবস্থার স্থবিরতা নিয়ে উদ্বেগএই ঘটনার মাধ্যমে আবারও সামনে এসেছে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে প্রশাসনিক সমন্বয় ও সংকট ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় তাদের কোনো কার্যকর অংশগ্রহণ না থাকায় ক্ষোভ আরও বাড়ছে।শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এমন পরিস্থিতি শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যা নয়, বরং বৃহত্তর উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার একটি সংকেত। শিক্ষকদের আন্দোলন, প্রশাসনের নির্দেশনা এবং বাস্তব বাস্তবায়নের মধ্যে যদি ভারসাম্য না থাকে, তবে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়।একই সঙ্গে ক্যাম্পাসে আস্থার সংকট তৈরি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।সমাধানের অপেক্ষায় ক্যাম্পাসবর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিস্থিতি কিছুটা থমথমে থাকলেও শিক্ষার্থীরা দ্রুত ডিফেন্স কার্যক্রম পুনরায় শুরু করার দাবি জানাচ্ছেন। প্রশাসন ও শিক্ষক প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা চলছে বলে জানা গেছে।তবে কবে নাগাদ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। শিক্ষার্থীরা বলছেন, তারা দ্রুত একটি স্থায়ী সমাধান চান যাতে তাদের একাডেমিক জীবন আর ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।উপসংহার
পবিপ্রবির এই ঘটনাটি এখন শুধু একটি বিক্ষোভ বা শাটডাউনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং শিক্ষক-প্রশাসন দ্বন্দ্বের একটি বড় উদাহরণ হয়ে উঠেছে। দ্রুত সমাধান না এলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।