জানুয়ারির শেষেই এসএসসি, জুনে এইচএসসি হতে পারে: সেশনজট কমাতে নতুন পরিকল্পনার ইঙ্গিত
দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের পরীক্ষার সময়সূচিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। আগামী বছর এসএসসি পরীক্ষা জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে এবং এইচএসসি পরীক্ষা জুন মাসে আয়োজনের বিষয়ে আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছেন তিনি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, কয়েক বছর ধরে জমে থাকা সেশনজট ধাপে ধাপে কমিয়ে শিক্ষাব্যবস্থাকে স্বাভাবিক ধারায় ফেরাতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।বুধবার বিকেলে গাজীপুরের বোর্ড বাজার এলাকায় অবস্থিত Islamic University of Technology-এ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী এসব কথা বলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেষ্ঠত্ব পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার সময় তিনি পরীক্ষার সম্ভাব্য সময়সূচি ও শিক্ষাব্যবস্থার বর্তমান চ্যালেঞ্জ নিয়ে কথা বলেন।সেশনজট কাটাতেই সময়সূচি পুনর্বিন্যাসশিক্ষামন্ত্রী বলেন, করোনা মহামারি এবং পরবর্তী সময়ের নানা জটিলতার কারণে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি সেশনজট তৈরি হয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক জীবন পিছিয়ে পড়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও ভর্তি ও পাঠদান কার্যক্রমে অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে।[TECHTARANGA-POST:1217]তার ভাষ্য অনুযায়ী, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এখন ধাপে ধাপে পুরো শিক্ষা ক্যালেন্ডারকে একটি নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। সে কারণেই এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার সময় এগিয়ে আনার আলোচনা চলছে।তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করেই কীভাবে সময়সূচি সমন্বয় করা যায়, সেটিই এখন সরকারের মূল লক্ষ্য। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষা নেওয়ার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও নেওয়া হচ্ছে।“দুই বছর যেন ঝরে না পড়ে”অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, নীতিনির্ধারণী ভুল বা প্রশাসনিক জটিলতার কারণে যেন কোনো শিক্ষার্থীর জীবন থেকে অপ্রয়োজনীয় সময় নষ্ট না হয়, সেদিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।তার দাবি, বর্তমানে এমন একটি সমন্বিত পরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে, যাতে স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়—সব পর্যায়ের একাডেমিক কার্যক্রম একই ছন্দে পরিচালিত হতে পারে। তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একাডেমিক ক্যালেন্ডারও নিয়মিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে এবং লক্ষ্য রাখা হয়েছে প্রতি বছরের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে একাডেমিক কার্যক্রম সম্পন্ন করার।শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে আসে, অতীতে শিক্ষাক্ষেত্রে যে অনিয়ম ও সময়জট তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে উঠতে এখন বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।ডিসেম্বরে পরীক্ষা নেওয়ার প্রস্তাবে আপত্তিএর আগে বুধবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার সম্ভাব্য সময়সূচি নিয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া হয়।সভায় অংশ নেওয়া বেশিরভাগ ব্যক্তি ডিসেম্বরে এসএসসি পরীক্ষা আয়োজনের প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন। তাদের যুক্তি ছিল, এক শিক্ষাবর্ষে হঠাৎ চার মাস সময় কমিয়ে দিলে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এতে শিখন ঘাটতি বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে বলে মত দেন অনেকে।বৈঠকে অংশ নেওয়া কয়েকজন শিক্ষক মনে করেন, শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ বিবেচনায় রেখেই ধাপে ধাপে সময় এগিয়ে আনা উচিত। তাদের মতে, ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষা জানুয়ারিতে এবং এইচএসসি এপ্রিল বা জুনে আয়োজন করা হলে শিক্ষার্থীরা তুলনামূলক ভালো প্রস্তুতির সুযোগ পাবে।[TECHTARANGA-POST:1197]সভায় আরও আলোচনা হয় যে, ভবিষ্যতে ধীরে ধীরে পরীক্ষাগুলো ডিসেম্বরে নেওয়ার মতো পরিবেশ তৈরি করা যেতে পারে। তবে সেটি করতে হলে আগে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাকে একটি স্থিতিশীল কাঠামোয় আনতে হবে।শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়াসম্ভাব্য নতুন সময়সূচি নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ইতোমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, সেশনজট কমানোর উদ্যোগ ইতিবাচক। কারণ এতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ও চাকরির প্রস্তুতিতে সময় বাঁচবে।আবার অনেক অভিভাবক উদ্বেগ প্রকাশ করে বলছেন, হঠাৎ সময় এগিয়ে এলে শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল বা পিছিয়ে থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার্থীরা দ্রুত প্রস্তুতি নিতে সমস্যায় পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।শিক্ষার্থীদের একাংশ বলছে, নিয়মিত ক্লাস ও পূর্ণাঙ্গ সিলেবাস শেষ করার নিশ্চয়তা ছাড়া শুধু পরীক্ষার সময় এগিয়ে আনলে কাঙ্ক্ষিত ফল নাও আসতে পারে।বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সময় নয়—গুণগত দিকেও নজর দরকারশিক্ষাবিদদের একটি অংশ মনে করছেন, সেশনজট নিরসনের জন্য সময়সূচি পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটিই একমাত্র সমাধান নয়। তাদের মতে, শিক্ষার মান, ক্লাসের ধারাবাহিকতা, শিক্ষক সংকট এবং পরীক্ষাকেন্দ্রিক চাপ—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু দ্রুত পরীক্ষা নেওয়ার লক্ষ্য থাকলে শিক্ষার্থীদের মুখস্থনির্ভর পড়াশোনা বাড়তে পারে। তাই সময় কমানোর পাশাপাশি পাঠদান পদ্ধতি ও মূল্যায়ন ব্যবস্থাতেও সংস্কার প্রয়োজন।তারা বলছেন, শিক্ষাব্যবস্থাকে টেকসইভাবে স্বাভাবিক করতে হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো জরুরি।আইইউটির অনুষ্ঠানে উৎসবমুখর পরিবেশএদিকে গাজীপুরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে কৃতিত্ব অর্জনকারী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের হাতে সার্টিফিকেট ও সম্মাননা তুলে দেন শিক্ষামন্ত্রী। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম।[TECHTARANGA-POST:1161]এ সময় উপ-উপাচার্য ড. হিসাইন আরাবি নূরসহ বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক, কর্মকর্তা, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা উপস্থিত ছিলেন। পুরো অনুষ্ঠানজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশ লক্ষ্য করা যায়।চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নিসভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে শিক্ষামন্ত্রী জানান, এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও বিশেষজ্ঞদের মতামত বিবেচনা করেই সরকার পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে।
তিনি বলেন, যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে শিক্ষার্থীদের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে এবং তারা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটি নিশ্চিত করার চেষ্টা থাকবে।