কিয়েভে রাশিয়ার ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা: নিহত ২১, আহত ৪৫—ধ্বংসস্তূপে চলছে উদ্ধার অভিযান
ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে রাশিয়ার চালানো ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় অন্তত ২১ জন নিহত এবং আরও ৪৫ জন আহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার রাতজুড়ে চলা এই হামলায় পুরো শহরজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং বহু আবাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে জানিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় নতুন করে যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও জটিল ও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে বলে মনে করা হচ্ছে।রাতভর কিয়েভে হামলার তীব্রতাইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে বৃহস্পতিবার (১৪ মে) রাতের শুরু থেকেই বিমান হামলার সতর্ক সাইরেন বেজে ওঠে। কিছুক্ষণের মধ্যেই শহরের আকাশে একের পর এক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায় এবং আলো ঝলকানিতে পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে।স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কয়েক ঘণ্টা ধরে চলা এই হামলার সময় মানুষ দিশেহারা হয়ে মেট্রো স্টেশন, বাংকার এবং ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। শহরের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থাও বিঘ্নিত হয় বলে জানা গেছে।[TECHTARANGA-POST:1290]এএফপির সাংবাদিকরা ঘটনাস্থল থেকে জানান, হামলার সময় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সক্রিয়তা এবং বিস্ফোরণের শব্দে পুরো কিয়েভ এক ধরনের যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়।ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যাপক ব্যবহারইউক্রেনের বিমান বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, এই হামলায় রাশিয়া মোট ৬৭৫টি ড্রোন এবং ৫৬টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। এর মধ্যে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ৬৫২টি ড্রোন এবং ৪১টি ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে বলে জানানো হয়।তবে এত বিপুল প্রতিরক্ষা সত্ত্বেও কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় আঘাত হানে বলে দাবি করা হয়েছে। এর ফলে একাধিক আবাসিক ভবন, স্কুল এবং বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের বড় পরিসরের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা যুদ্ধের নতুন মাত্রা যোগ করেছে, যা শহরভিত্তিক জনজীবনের জন্য বড় হুমকি তৈরি করছে।নিহত ও আহতের সর্বশেষ তথ্যইউক্রেনের জরুরি পরিষেবা সংস্থা শুক্রবার (১৫ মে) জানায়, হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ২১ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে তিনজন শিশু রয়েছে। শুরুতে নিহতের সংখ্যা ১৬ বলা হলেও উদ্ধার অভিযান শেষে তা বাড়ে।আহত হয়েছেন অন্তত ৪৫ জন, যাদের অনেকের অবস্থা গুরুতর বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে। আহতদের মধ্যে নারী ও শিশু রয়েছে বলেও নিশ্চিত করা হয়েছে।পুলিশ জানায়, ধ্বংসস্তূপ থেকে এখন পর্যন্ত সাতজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধারকৃতদের মধ্যে তিনজন পুরুষ, তিনজন নারী এবং একজন কিশোরী রয়েছে।ধসে পড়া ভবন ও উদ্ধার অভিযানকিয়েভের একাধিক এলাকায় আবাসিক ভবনে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে বলে স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে। একটি সোভিয়েত আমলের বহুতল ভবন সম্পূর্ণভাবে ধসে পড়ে, যার প্রথম তলা থেকে নবম তলা পর্যন্ত ব্যাপক ক্ষতি হয়।উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষদের খুঁজে বের করতে রাতভর কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। ফায়ার সার্ভিস ও জরুরি সেবা দল জানায়, এখনও কিছু মানুষ নিখোঁজ থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।[TECHTARANGA-POST:1273]ধ্বংসস্তূপের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা স্থানীয় বাসিন্দারা কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং প্রিয়জনদের খুঁজে পাওয়ার অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছেন।প্রত্যক্ষদর্শীদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতাঘটনাস্থলে থাকা কিয়েভের এক বাসিন্দা আন্দ্রিই বলেন, “চারপাশে সবকিছু আগুনে জ্বলছিল। মানুষ দৌড়াচ্ছিল, চিৎকার করছিল, কেউ কাউকে খুঁজে পাচ্ছিল না।”তিনি জানান, একটি ধসে পড়া ভবনের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি আহত অবস্থায় ছিলেন এবং তার শার্টে রক্তের দাগ ছিল।আরেকজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, “এটি শুধু একটি হামলা ছিল না, মনে হচ্ছিল পুরো শহরই লক্ষ্যবস্তু হয়ে গেছে।”জেলেনস্কির প্রতিক্রিয়া ও অভিযোগইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এক ভাষণে বলেন, রাজধানীর অন্তত ২০টিরও বেশি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে আবাসিক ভবন ছাড়াও একটি স্কুল, একটি ভেটেরিনারি ক্লিনিক এবং অন্যান্য বেসামরিক অবকাঠামো রয়েছে।তিনি বলেন, “রুশ ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে একটি আবাসিক ভবনের নিচতলা থেকে ওপর পর্যন্ত পুরো অংশ ধসে গেছে। উদ্ধার অভিযান এখনও চলছে।”জেলেনস্কি এই হামলাকে “নিষ্ঠুর ও পরিকল্পিত আক্রমণ” বলে মন্তব্য করেন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও কঠোর পদক্ষেপের আহ্বান জানান।যুদ্ধ পরিস্থিতি ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাইউক্রেনের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বেশিরভাগ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র সফলভাবে ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে। তবে এত বড় পরিসরের হামলায় কিছু অস্ত্র লক্ষ্যভেদ করতে সক্ষম হয়।সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের হামলা ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়াচ্ছে এবং শহরগুলোর নাগরিক নিরাপত্তাকে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।সামাজিক ও মানবিক প্রভাবএই হামলা কেবল সামরিক সংঘর্ষ নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে। কিয়েভের মতো শহরে প্রতিনিয়ত এমন আতঙ্কের মধ্যে মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছে না।শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য, শিক্ষাব্যবস্থা এবং পরিবারের স্থিতিশীলতা—সবকিছুই এই যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি এই সংঘাত ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর গভীর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলতে পারে।[TECHTARANGA-POST:1249]একজন মানবাধিকার বিশ্লেষক বলেন, “যুদ্ধ শুধু সীমান্তে নয়, মানুষের ঘরেও প্রবেশ করেছে। এর ক্ষতি বহু বছরেও পূরণ করা সম্ভব হবে না।”উপসংহার
কিয়েভে ভয়াবহ এই হামলার পর উদ্ধার অভিযান এখনও চলছে এবং নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পরিস্থিতি এখনো উত্তপ্ত এবং শহরের বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এই হামলা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। যুদ্ধ পরিস্থিতি কোন দিকে গড়াবে, তা এখনো অনিশ্চিত।