দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর
সর্বশেষ

জলাশয়হীন আগারগাঁও এখন ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’, কংক্রিটের চাপে বাড়ছে তাপদাহের ঝুঁকি

একসময় আগারগাঁও ছিল খাল, বিল আর জলাভূমিতে ঘেরা এক স্বস্তির অঞ্চল। বর্ষায় পানি জমত, শুষ্ক মৌসুমেও বিভিন্ন জলাশয়ে থাকত পানির অস্তিত্ব। কিন্তু কয়েক দশকের উন্নয়ন আর অবকাঠামো নির্মাণের ধারায় সেই আগারগাঁও এখন প্রায় সম্পূর্ণ বদলে গেছে। সরকারি অফিস, হাসপাতাল, বহুতল ভবন ও সড়কের বিস্তারে হারিয়ে গেছে অধিকাংশ জলাশয়। এর প্রভাব এখন স্পষ্টভাবে অনুভব করছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রতিদিন যাতায়াতকারী হাজারো মানুষ।বিশেষজ্ঞদের মতে, জলাশয় ও সবুজের ঘাটতির কারণে রাজধানীর এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক অঞ্চল ধীরে ধীরে ‘আরবান হিট আইল্যান্ডে’ পরিণত হয়েছে। ফলে আশপাশের এলাকার তুলনায় এখানে তাপমাত্রা বেশি অনুভূত হচ্ছে এবং গরমের তীব্রতা সাধারণ মানুষের জীবনকে ক্রমেই কঠিন করে তুলছে।[TECHTARANGA-POST:1499]খাল-বিল থেকে কংক্রিটের নগরীআগারগাঁওয়ের পুরোনো বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক দশক আগেও পুরো এলাকা ছিল বিস্তৃত নিচু ভূমি, জলাভূমি এবং প্রাকৃতিক পানির আধারে সমৃদ্ধ। বিভিন্ন জলাশয় শুধু বৃষ্টির পানি ধারণ করত না, বরং এলাকার তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা রাখত।কিন্তু ধাপে ধাপে সরকারি অবকাঠামো নির্মাণ, জমি ভরাট এবং নগর সম্প্রসারণের ফলে সেই প্রাকৃতিক পরিবেশ প্রায় বিলীন হয়ে যায়। বর্তমানে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বহু প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও প্রশাসনিক ভবন থাকলেও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় জলাশয়ের অস্তিত্ব খুবই সীমিত।স্থানীয়দের দাবি, আগে যেখানে বড় বড় জলাশয় ছিল, সেসব জায়গার অনেকগুলোতেই এখন সরকারি ভবন, অফিস, হাসপাতাল কিংবা বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে উঠেছে।কেন বাড়ছে তাপমাত্রা?পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো এলাকায় কংক্রিট, পিচঢালা রাস্তা ও বহুতল ভবনের আধিক্য বাড়লে সেই অঞ্চল দিনের বেলায় প্রচুর তাপ শোষণ করে। পরে রাতেও সেই তাপ ধীরে ধীরে বাতাসে ছড়িয়ে দেয়। ফলে দিনের পাশাপাশি রাতের তাপমাত্রাও অস্বাভাবিকভাবে বেশি থাকে।মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক ড. এএসএম সাইফুল্লাহ বলেন, পর্যাপ্ত জলাশয় ও সবুজ না থাকলে কংক্রিটের এলাকা দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। জলাশয় প্রকৃতির স্বাভাবিক শীতলীকরণ ব্যবস্থার অংশ হিসেবে কাজ করে। কিন্তু আগারগাঁওয়ে সেই প্রাকৃতিক ভারসাম্য এখন অনেকটাই নষ্ট হয়ে গেছে।তার মতে, বড় বড় হাসপাতাল ও সরকারি প্রতিষ্ঠান থাকলেও তাপ শোষণ এবং পরিবেশ রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় জলাধার না থাকা পরিকল্পনাগত দুর্বলতারই ইঙ্গিত দেয়।হারিয়ে যাওয়া জলাশয়ের ইতিহাসনগর পরিকল্পনার ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শেরেবাংলা নগর ও আগারগাঁও অঞ্চলকে কেন্দ্র করে করা প্রাথমিক পরিকল্পনায় জলাশয় সংরক্ষণকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।পাকিস্তান আমলে স্থপতি লুই আই কানের প্রণীত পরিকল্পনায় এই এলাকার খাল ও জলাভূমিকে রক্ষা করার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পর রাজধানীর বিস্তার এবং প্রশাসনিক চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই পরিকল্পনায় পরিবর্তন আসে।পরবর্তী সময়ে সরকারি অফিস ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের জন্য একের পর এক জমি অধিগ্রহণ ও ভরাটের কাজ শুরু হয়। ফলে বহু জলাশয় মানচিত্র থেকেই হারিয়ে যায়।স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, আগারগাঁও ও শেরেবাংলা নগর এলাকায় একসময় অন্তত সাতটি বড় জলাশয় ছিল। বর্তমানে এর বেশ কয়েকটির আর কোনো অস্তিত্ব নেই। কিছু জলাশয় আংশিক টিকে থাকলেও সেগুলোর পরিধি আগের তুলনায় অনেক ছোট হয়ে গেছে।গবেষণাতেও মিলছে সতর্কবার্তাঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোর তাপমাত্রা নিয়ে পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণায়ও নগর তাপদাহের ঝুঁকির বিষয়টি উঠে এসেছে।গবেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দ্রুত নগরায়ণ, বৃক্ষনিধন এবং জলাশয় কমে যাওয়ার কারণে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে বাস্তব তাপমাত্রার চেয়ে অনুভূত তাপমাত্রা কয়েক ডিগ্রি বেশি হয়ে দাঁড়ায়।বিশেষজ্ঞদের মতে, এ পরিস্থিতি শুধু অস্বস্তি সৃষ্টি করে না; বরং জনস্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ ব্যবহার, পানির চাহিদা এবং নগর জীবনের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।সমাধান কী?জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মনিরুজ্জামান মনে করেন, আগারগাঁওয়ের মতো এলাকায় নতুন করে সবুজ অঞ্চল বৃদ্ধি এবং ছোট-বড় জলাশয় তৈরির উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।তার মতে, নগর এলাকায় বিকল্প জলাধার, প্রশস্ত ড্রেনভিত্তিক পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা গেলে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।একই মত দিয়েছেন নগর পরিকল্পনাবিদরাও। তারা বলছেন, উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু পরিবেশগত ভারসাম্য নিশ্চিত না করে শুধুমাত্র কংক্রিটনির্ভর উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে নতুন সংকট তৈরি করে।আগারগাঁও কি পুরো ঢাকার ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি?বিশেষজ্ঞদের মতে, আগারগাঁওয়ের বর্তমান অবস্থা আসলে পুরো ঢাকার নগরায়ণ প্রক্রিয়ারই প্রতিফলন। জলাশয় ভরাট, সবুজ কমে যাওয়া এবং কংক্রিটের বিস্তার রাজধানীর অনেক এলাকাকেই একই ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলামও স্বীকার করেছেন যে, ঢাকাজুড়ে প্রয়োজনের তুলনায় জলাশয় ও সবুজ ভূমির পরিমাণ কম। তবে এখনো পরিকল্পিত উদ্যোগের মাধ্যমে আগারগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকায় নতুন জলাশয় ও সবুজ অঞ্চল তৈরির সুযোগ রয়েছে।বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, আগারগাঁও কেবল একটি প্রশাসনিক কেন্দ্র নয়; এটি একটি সতর্কবার্তা। উন্নয়ন ও পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা না করা গেলে ভবিষ্যতের নগর জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠবে। আর তাই এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে কংক্রিটের এই শহর একসময় তাপের নগরীতে পরিণত হতে পারে।

জলাশয়হীন আগারগাঁও এখন ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’, কংক্রিটের চাপে বাড়ছে তাপদাহের ঝুঁকি