দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর
সর্বশেষ

চট্টগ্রাম বন্দরে ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আসছে ৫ মে, সচল হবে ইস্টার্ন রিফাইনারি

দেশের জ্বালানি খাতে স্বস্তির খবর—আগামী ৫ মে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেলবাহী একটি জাহাজের। এই চালান এলে দীর্ঘদিনের সংকট কাটিয়ে আবারও কার্যক্রম শুরু করতে পারবে রাষ্ট্রায়ত্ত ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসি। ইস্টার্ন রিফাইনারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শরিফ হাসনাত জানিয়েছেন, ‘এমটি নাইনেমিয়া’ নামের জাহাজটি ইতোমধ্যে লোহিত সাগর অতিক্রম করেছে এবং বর্তমানে বঙ্গোপসাগরের পথে রয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে ৫ মে রাতে এটি চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, জাহাজটি যাত্রাপথে ঝুঁকিপূর্ণ কিছু এলাকা এড়িয়ে নিরাপদ পথ ধরে এগিয়েছে। বিশেষ করে ইয়েমেনের হুতি নিয়ন্ত্রিত উপকূলীয় অঞ্চল এবং হরমুজ প্রণালীর যুদ্ধ পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বিকল্প রুট ব্যবহার করা হয়েছে। এর ফলে তেলবাহী এই জাহাজটি নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। জাহাজটি সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে ২১ এপ্রিল সকালে যাত্রা শুরু করে। এর আগে রাতভর এতে অপরিশোধিত তেল লোড করা হয়। এই চালান দেশে পৌঁছালে ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন কার্যক্রম আবার চালু করা সম্ভব হবে, যা সাময়িকভাবে তেলের অভাবে বন্ধ ছিল। তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। একই সময়ে ‘নর্ডিকস পলাক্স’ নামের আরও একটি জাহাজ, যাতে সমপরিমাণ তেল রয়েছে, তা এখনও সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দরে আটকা পড়ে আছে। হরমুজ প্রণালী কার্যত অচল হয়ে পড়ায় এই জাহাজটি এখনো যাত্রা শুরু করতে পারেনি। ফলে ভবিষ্যতে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে। ইস্টার্ন রিফাইনারি দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় তেল পরিশোধনাগার। প্রতিষ্ঠানটি বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করতে পারে। কিন্তু দেশের মোট চাহিদা প্রায় ৭২ লাখ টন হওয়ায় এর মাধ্যমে মোট চাহিদার মাত্র ২০ শতাংশ পূরণ হয়। বাকি জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্র জানায়, দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৯২ শতাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। স্থানীয়ভাবে পাওয়া যায় মাত্র ৮ শতাংশ, যা মূলত কনডেনসেট ও অন্যান্য উৎস থেকে আসে। এই নির্ভরতা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে অনেকটাই আন্তর্জাতিক বাজার ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল করে তুলেছে। দেশে জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বড় বৈচিত্র্য রয়েছে। সবচেয়ে বেশি জ্বালানি ব্যবহার হয় পরিবহন খাতে—মোট ব্যবহারের প্রায় ৬৩ দশমিক ৪১ শতাংশ। এরপর কৃষি খাতে সেচের জন্য ব্যবহৃত হয় প্রায় ১৫ দশমিক ৪১ শতাংশ জ্বালানি। বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত হয় ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ, শিল্পে ৫ দশমিক ৯৬ শতাংশ এবং গৃহস্থালিতে প্রায় ১ শতাংশ। জ্বালানি পণ্যের মধ্যে ডিজেলের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। এরপর রয়েছে ফার্নেস অয়েল, পেট্রোল, অকটেন, কেরোসিন এবং বিমান চলাচলের জন্য ব্যবহৃত জেট ফুয়েল। এই চাহিদা পূরণে নিয়মিত আমদানি ও সরবরাহ বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উল্লেখ্য, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে সাম্প্রতিক অস্থিরতা, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন, সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন রুট—এখানে কোনো ধরনের সংকট দেখা দিলে তার প্রভাব বিশ্বব্যাপী পড়ে। সব মিলিয়ে, ৫ মে আসতে যাওয়া এই তেলের চালান দেশের জ্বালানি খাতে স্বস্তি আনতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিকল্প উৎস ও পরিকল্পনার দিকে আরও জোর দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দরে ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আসছে ৫ মে, সচল হবে ইস্টার্ন রিফাইনারি