তেলের নজেলে যুদ্ধের আঁচ: মন্ত্রীদের আশ্বাসেও কাটছে না পাম্পের তালা
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা | ৮ মার্চ, ২০২৬
রাজধানী ঢাকার রাজপথে গতকাল এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের ছবি ফুটে উঠেছে। একদিকে সরকারের নীতিনির্ধারক ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের অভয়বাণী— ‘মজুত পর্যাপ্ত, ভয়ের কিছু নেই’; অন্যদিকে সাধারণ মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে ভিন্ন কথা। পাম্পে পাম্পে ঝুলছে তালা, কোথাও বা মাইকে ঘোষণা আসছে— ‘তেল নেই’। মধ্যপ্রাচ্যের ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের উত্তাপ হাজার মাইল পেরিয়ে যেন সরাসরি আঘাত হেনেছে বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের নজেলে।
মাঠপর্যায়ে হাহাকার: মন্ত্রীদের আশ্বাসে ফিরছে না স্বস্তি
গতকাল শনিবার সকাল থেকে রাজধানীর মগবাজার, তেজগাঁও, ধানমন্ডি ও মিরপুর এলাকার চিত্র ছিল থমথমে। অথচ এর আগের দিনই জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এবং প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত পাম্প পরিদর্শন করে দাবি করেছিলেন, দেশে তেলের কোনো সংকট নেই এবং আগামী সপ্তাহেই নতুন জাহাজ বন্দরে পৌঁছাবে।
মন্ত্রীদের এই বক্তব্যের ২৪ ঘণ্টা পার না হতেই মাঠপর্যায়ে বিশৃঙ্খলা চরমে পৌঁছেছে। পাম্প মালিকদের একাংশের রহস্যময় আচরণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার স্থবিরতা সাধারণ মানুষকে খাদের কিনারে ঠেলে দিয়েছে।
তুহিনের আর্তনাদ: 'যুদ্ধ কি আমাদের দোরগোড়ায়?'
মগবাজারের একটি বন্ধ পাম্পের সামনে মোটরসাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন রাইড শেয়ারিং চালক তুহিন। তার চোখেমুখে ক্লান্তি আর দুশ্চিন্তার ছাপ। মিরপুর থেকে মতিঝিল পর্যন্ত অন্তত সাতটি পাম্প ঘুরেও এক লিটার অকটেন পাননি তিনি। ক্ষোভের সাথে তুহিন বলেন:
"মন্ত্রীরা বলছেন তেল আছে, কিন্তু পাম্পে এলে বলে নাই। আমাদের তো একদিন গাড়ি না চললে চুলা জ্বলে না। যুদ্ধ হচ্ছে ইরানে, আর শাস্তি পাচ্ছি আমরা। মনে হচ্ছে যুদ্ধটা আমাদের দেশেই হচ্ছে।"
তুহিনের এই আর্তনাদ আজ ঢাকার প্রতিটি শ্রমজীবী মানুষের প্রতিনিধি হয়ে উঠেছে, যাদের কাছে জ্বালানি তেল কেবল তরল পদার্থ নয়—বেঁচে থাকার অক্সিজেন।
কারসাজি না কি বাস্তব সংকট?
তেজগাঁও ও সাতরাস্তা এলাকার ফিলিং স্টেশনগুলোতে গিয়ে দেখা গেছে, প্রবেশপথ দড়ি দিয়ে আটকানো। পাম্প মালিকদের দাবি, ডিপো থেকে সরবরাহ কমেছে। তবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) বলছে ভিন্ন কথা। তাদের মতে, সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও পাম্প মালিকদের একটি অংশ দাম বাড়ার আশায় কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে।
সাধারণ মানুষের অভিযোগ, পাম্পগুলো কেবল পরিচিত গ্রাহকদের কাছে গোপনে বা বেশি দামে তেল বিক্রি করছে। এই অরাজকতা নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের কার্যকর নজরদারিও চোখে পড়েনি।
সংকটের নেপথ্যে তিনটি কারণ
বিশেষজ্ঞরা বর্তমান পরিস্থিতিকে 'মনস্তাত্ত্বিক সংকট' হিসেবে দেখছেন:
১. প্যানিক বায়িং: ফুরিয়ে যাওয়ার ভয়ে মানুষ প্রয়োজনের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি তেল মজুত করছে।
২. গুজব: সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভুল তথ্যে মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পাম্পে ভিড় করছে।
৩. অনাস্থা: সরকারের আশ্বাসের সাথে বাস্তব চিত্রের মিল না থাকায় মানুষের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।
দ্রুত ব্যবস্থার দাবি
পরিবহন ধর্মঘট বা নিত্যপণ্যের দাম আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আগেই সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। বিশেষ করে:
জাহাজ আসার অপেক্ষা না করে বর্তমান মজুত থেকে দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করা।
যেসব পাম্প তেল লুকিয়ে রাখছে, ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাদের লাইসেন্স বাতিল করা।
সঠিক ও স্বচ্ছ তথ্য প্রচার করে গুজব ছড়ানো বন্ধ করা।
যুদ্ধ পৃথিবীর যেখানেই হোক, তার মাশুল যেন বাংলাদেশের খেটে খাওয়া মানুষকে দিতে না হয়। তুহিনের মতো হাজারো চালক আজ তাকিয়ে আছেন কার্যকর পদক্ষেপের দিকে। কারণ, তাদের কাছে চাকা থেমে যাওয়া মানেই সন্তানদের মুখে অন্ন তুলে দিতে না পারার ব্যর্থতা।

রোববার, ০৮ মার্চ ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৮ মার্চ ২০২৬
তেলের নজেলে যুদ্ধের আঁচ: মন্ত্রীদের আশ্বাসেও কাটছে না পাম্পের তালা
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা | ৮ মার্চ, ২০২৬
রাজধানী ঢাকার রাজপথে গতকাল এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের ছবি ফুটে উঠেছে। একদিকে সরকারের নীতিনির্ধারক ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের অভয়বাণী— ‘মজুত পর্যাপ্ত, ভয়ের কিছু নেই’; অন্যদিকে সাধারণ মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে ভিন্ন কথা। পাম্পে পাম্পে ঝুলছে তালা, কোথাও বা মাইকে ঘোষণা আসছে— ‘তেল নেই’। মধ্যপ্রাচ্যের ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের উত্তাপ হাজার মাইল পেরিয়ে যেন সরাসরি আঘাত হেনেছে বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের নজেলে।
মাঠপর্যায়ে হাহাকার: মন্ত্রীদের আশ্বাসে ফিরছে না স্বস্তি
গতকাল শনিবার সকাল থেকে রাজধানীর মগবাজার, তেজগাঁও, ধানমন্ডি ও মিরপুর এলাকার চিত্র ছিল থমথমে। অথচ এর আগের দিনই জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এবং প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত পাম্প পরিদর্শন করে দাবি করেছিলেন, দেশে তেলের কোনো সংকট নেই এবং আগামী সপ্তাহেই নতুন জাহাজ বন্দরে পৌঁছাবে।
মন্ত্রীদের এই বক্তব্যের ২৪ ঘণ্টা পার না হতেই মাঠপর্যায়ে বিশৃঙ্খলা চরমে পৌঁছেছে। পাম্প মালিকদের একাংশের রহস্যময় আচরণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার স্থবিরতা সাধারণ মানুষকে খাদের কিনারে ঠেলে দিয়েছে।
তুহিনের আর্তনাদ: 'যুদ্ধ কি আমাদের দোরগোড়ায়?'
মগবাজারের একটি বন্ধ পাম্পের সামনে মোটরসাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন রাইড শেয়ারিং চালক তুহিন। তার চোখেমুখে ক্লান্তি আর দুশ্চিন্তার ছাপ। মিরপুর থেকে মতিঝিল পর্যন্ত অন্তত সাতটি পাম্প ঘুরেও এক লিটার অকটেন পাননি তিনি। ক্ষোভের সাথে তুহিন বলেন:
"মন্ত্রীরা বলছেন তেল আছে, কিন্তু পাম্পে এলে বলে নাই। আমাদের তো একদিন গাড়ি না চললে চুলা জ্বলে না। যুদ্ধ হচ্ছে ইরানে, আর শাস্তি পাচ্ছি আমরা। মনে হচ্ছে যুদ্ধটা আমাদের দেশেই হচ্ছে।"
তুহিনের এই আর্তনাদ আজ ঢাকার প্রতিটি শ্রমজীবী মানুষের প্রতিনিধি হয়ে উঠেছে, যাদের কাছে জ্বালানি তেল কেবল তরল পদার্থ নয়—বেঁচে থাকার অক্সিজেন।
কারসাজি না কি বাস্তব সংকট?
তেজগাঁও ও সাতরাস্তা এলাকার ফিলিং স্টেশনগুলোতে গিয়ে দেখা গেছে, প্রবেশপথ দড়ি দিয়ে আটকানো। পাম্প মালিকদের দাবি, ডিপো থেকে সরবরাহ কমেছে। তবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) বলছে ভিন্ন কথা। তাদের মতে, সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও পাম্প মালিকদের একটি অংশ দাম বাড়ার আশায় কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে।
সাধারণ মানুষের অভিযোগ, পাম্পগুলো কেবল পরিচিত গ্রাহকদের কাছে গোপনে বা বেশি দামে তেল বিক্রি করছে। এই অরাজকতা নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের কার্যকর নজরদারিও চোখে পড়েনি।
সংকটের নেপথ্যে তিনটি কারণ
বিশেষজ্ঞরা বর্তমান পরিস্থিতিকে 'মনস্তাত্ত্বিক সংকট' হিসেবে দেখছেন:
১. প্যানিক বায়িং: ফুরিয়ে যাওয়ার ভয়ে মানুষ প্রয়োজনের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি তেল মজুত করছে।
২. গুজব: সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভুল তথ্যে মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পাম্পে ভিড় করছে।
৩. অনাস্থা: সরকারের আশ্বাসের সাথে বাস্তব চিত্রের মিল না থাকায় মানুষের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।
দ্রুত ব্যবস্থার দাবি
পরিবহন ধর্মঘট বা নিত্যপণ্যের দাম আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আগেই সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। বিশেষ করে:
জাহাজ আসার অপেক্ষা না করে বর্তমান মজুত থেকে দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করা।
যেসব পাম্প তেল লুকিয়ে রাখছে, ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাদের লাইসেন্স বাতিল করা।
সঠিক ও স্বচ্ছ তথ্য প্রচার করে গুজব ছড়ানো বন্ধ করা।
যুদ্ধ পৃথিবীর যেখানেই হোক, তার মাশুল যেন বাংলাদেশের খেটে খাওয়া মানুষকে দিতে না হয়। তুহিনের মতো হাজারো চালক আজ তাকিয়ে আছেন কার্যকর পদক্ষেপের দিকে। কারণ, তাদের কাছে চাকা থেমে যাওয়া মানেই সন্তানদের মুখে অন্ন তুলে দিতে না পারার ব্যর্থতা।

আপনার মতামত লিখুন