দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর
সর্বশেষ
প্রকাশ : শুক্রবার, ০২ জানুয়ারি ২০২৬

সরাসরি কৃষকের কাছে সহায়তা পৌঁছাতে ‘কৃষক কার্ড’ চালুর বিষয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা সভা

সরাসরি কৃষকের কাছে সহায়তা পৌঁছাতে ‘কৃষক কার্ড’ চালুর বিষয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা সভা

র‍্যাবের সাবেক মহাপরিচালক ও স্ত্রীর ১০ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট অবরুদ্ধ

ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা থেকে কেউ যেন বঞ্চিত না হয়: বিশেষ নির্দেশনা

বগুড়া ও শেরপুর উপনির্বাচন ৯ এপ্রিল: তফসিল ঘোষণা আজ

অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে রাজস্ব আদায়ে ধস, ঘাটতির পাহাড় ৬০ হাজার কোটি।

এবার রাষ্ট্রপতির আরও বিস্ফোরক মন্তব্য; তোলপাড় রাজনৈতিক অঙ্গন

১২ মার্চ বেলা ১১টায় বসছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন

"শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন: পছন্দের জনবল নিয়োগকে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখছে সরকার।

টেন্ডারবাণিজ্য, দুর্নীতি ও হত্যা মামলা: শতকোটি টাকার মালিক গণপূর্তের আহসান হাবীব

টেন্ডারবাণিজ্য, দুর্নীতি ও হত্যা মামলা: শতকোটি টাকার মালিক গণপূর্তের আহসান হাবীব

ক্ষমতার অপব্যবহার, টেন্ডারবাণিজ্য, কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ ও হত্যা মামলার আসামি হয়েও একজন সরকারি কর্মকর্তা কীভাবে বহাল তবিয়তে দাপটের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন-এই প্রশ্ন এখন প্রশাসন থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মুখে মুখে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের নারায়ণগঞ্জ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আহসান হাবীব। সাবেক ছাত্রলীগ নেতা পরিচয়ে পরিচিত এই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ উঠে এলেও এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

একাধিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে আহসান হাবীব টেন্ডারবাণিজ্যের মাধ্যমে শতকোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। সরকারি দায়িত্বে থেকে ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি পছন্দের ঠিকাদারদের মাধ্যমে কাজ বাগিয়ে নিয়ে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ উপার্জন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। শুধু দুর্নীতিই নয়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে অর্থের জোগান দেওয়ার অভিযোগ এবং একাধিক হত্যা মামলার আসামি হওয়ার বিষয়টি তাকে ঘিরে বিতর্ক আরও ঘনীভূত করেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, মো. আহসান হাবীব ২০২৪ সালের ৩০ অক্টোবর গণপূর্ত অধিদপ্তরের নারায়ণগঞ্জ বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে যোগদান করেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি প্রশাসনিক ক্ষমতা নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করেন। অভিযোগ রয়েছে, যোগদানের কয়েক মাসের মধ্যেই দরপত্র প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ভেঙে পড়ে। অধিকাংশ টেন্ডার তার ঘনিষ্ঠ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেওয়া হয় এবং যেসব ঠিকাদার তার সিন্ডিকেটের বাইরে ছিলেন, তাদের নানা অজুহাতে কাজ থেকে বাদ দেওয়া হয়।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মচারী জানান, দরপত্র আহ্বানের আগেই ঠিক হয়ে যেত কোন ঠিকাদার কাজ পাবে। দরপত্রের শর্ত এমনভাবে সাজানো হতো, যাতে নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য কেউ যোগ্যতা অর্জন করতে না পারে। এই প্রক্রিয়ায় সরকারি অর্থ লুটপাট হয়েছে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে গুণগত মান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এই টেন্ডারবাণিজ্যের মাধ্যমে আহসান হাবীব বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করে নামে-বেনামে অঢেল সম্পদ গড়েছেন। রাজধানী ও নারায়ণগঞ্জে একাধিক ফ্ল্যাট, জমি এবং বিলাসবহুল গাড়ির মালিকানা তার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। এসব সম্পদের সঙ্গে তার সরকারি বেতনের কোনো সামঞ্জস্য নেই বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন।

গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানায়, আহসান হাবীবের বিরুদ্ধে কয়েক কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল। এমনকি দেশের বাইরে শতকোটি টাকা পাচারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তবে রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে এসব অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

আহসান হাবীবের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর পেছনে তার রাজনৈতিক পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন এবং ছাত্রলীগের রাজনীতির মাধ্যমে ক্ষমতার কেন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এই রাজনৈতিক নেটওয়ার্কই তাকে দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ রাখছে বলে ধারণা করছেন অনেকে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক গণপূর্ত কর্মকর্তা বলেন, আহসান হাবীবের বিরুদ্ধে কোনো সংবাদ প্রকাশ হলে তা দ্রুত ম্যানেজ করা হয়। কখনো রাজনৈতিক চাপ, কখনো প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়া হয়। তার নিজস্ব একটি সিন্ডিকেট রয়েছে, যারা গণপূর্তের ভেতরে তার স্বার্থ রক্ষা করে।

সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি হলো বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় তার ভূমিকা। অভিযোগ রয়েছে, আন্দোলন চলাকালে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা ও সহিংসতায় অর্থ ও রসদ জুগিয়েছেন আহসান হাবীব। আওয়ামী লীগ সরকারের সুবিধাভোগী কর্মকর্তা হিসেবে তিনি আন্দোলন দমনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তার বিরুদ্ধে ক্ষোভ আরও বেড়ে যায়।

৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর অনেক আওয়ামী লীগঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা আত্মগোপনে গেলেও আহসান হাবীব প্রকাশ্যে কর্মস্থলে বহাল থাকেন। অভিযোগ রয়েছে, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার অন্যতম মাস্টারমাইন্ড হিসেবে চিহ্নিত হলেও তিনি এখনো দাপটের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন।

আহসান হাবীব বর্তমানে রাজধানীর পল্টন মডেল থানার একটি হত্যা মামলার আসামি। মামলা নংু৮৭৪ অনুযায়ী তিনি ৭০ নম্বর আসামি। জানা গেছে, কে এম শাহরিয়ার শুভ বাদী হয়ে গত ৩১ অক্টোবর ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তার বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করার আবেদন করেন। আদালত পল্টন মডেল থানাকে নির্দেশ দেন, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে একই ধরনের আরও হত্যা মামলা রয়েছে কি না, তা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জানাতে।

আদালতের আদেশ অনুযায়ী পল্টন মডেল থানা থেকে পাঠানো প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, একই ঘটনায় এর আগেও একটি হত্যা মামলা দায়ের হয়েছিল। ওই মামলায় মো. জামাল মিয়া বাদী হয়ে একই ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছিলেন। ফলে আদালত আবেদনটিকে হত্যা মামলায় রূপান্তর করেন এবং বিষয়টি বিচারাধীন রয়েছে।

হত্যা মামলার আসামি হওয়ার পর থেকেই বাদীর ওপর চাপ সৃষ্টি ও আর্থিক প্রলোভন দেখিয়ে মামলা থেকে নিজের নাম প্রত্যাহারের চেষ্টা করছেন আহসান হাবীব-এমন অভিযোগও পাওয়া গেছে। একাধিক সূত্র জানায়, মামলার বাদীর সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা চলছে এবং এই মীমাংসা প্রক্রিয়ায় গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন মহলের একটি অংশ সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, আহসান হাবীব আওয়ামী লীগের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি ছিলেন। তার বিরুদ্ধে যত গুরুতর অভিযোগই থাকুক না কেন, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি শেষ পর্যন্ত পার পেয়ে যাবেন-এমন ধারণাই এখন প্রতিষ্ঠানের ভেতরে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

আইনজ্ঞদের মতে, একজন সরকারি কর্মকর্তা যদি হত্যা মামলার আসামি হয়েও বহাল থাকেন, তবে তা প্রশাসনিক জবাবদিহিতা ও আইনের শাসনের জন্য অশনিসংকেত। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিচার ব্যবস্থার ওপর আস্থা আরও ক্ষুণ্ণ হয়।

এ বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য একাধিকবার মো. আহসান হাবীবের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায় কিংবা তিনি কল রিসিভ করেননি।

দুর্নীতি, টেন্ডারবাণিজ্য, অর্থ পাচার ও হত্যা মামলার মতো গুরুতর অভিযোগের পরও আহসান হাবীবের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা না থাকায় প্রশ্ন উঠেছেআইনের ঊর্ধ্বে কি তিনি? নাকি রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় সবকিছুই সম্ভব? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে এখন দেশবাসী।

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর

বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬


টেন্ডারবাণিজ্য, দুর্নীতি ও হত্যা মামলা: শতকোটি টাকার মালিক গণপূর্তের আহসান হাবীব

প্রকাশের তারিখ : ০২ জানুয়ারি ২০২৬

featured Image

ক্ষমতার অপব্যবহার, টেন্ডারবাণিজ্য, কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ ও হত্যা মামলার আসামি হয়েও একজন সরকারি কর্মকর্তা কীভাবে বহাল তবিয়তে দাপটের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন-এই প্রশ্ন এখন প্রশাসন থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মুখে মুখে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের নারায়ণগঞ্জ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আহসান হাবীব। সাবেক ছাত্রলীগ নেতা পরিচয়ে পরিচিত এই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ উঠে এলেও এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

একাধিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে আহসান হাবীব টেন্ডারবাণিজ্যের মাধ্যমে শতকোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। সরকারি দায়িত্বে থেকে ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি পছন্দের ঠিকাদারদের মাধ্যমে কাজ বাগিয়ে নিয়ে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ উপার্জন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। শুধু দুর্নীতিই নয়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে অর্থের জোগান দেওয়ার অভিযোগ এবং একাধিক হত্যা মামলার আসামি হওয়ার বিষয়টি তাকে ঘিরে বিতর্ক আরও ঘনীভূত করেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, মো. আহসান হাবীব ২০২৪ সালের ৩০ অক্টোবর গণপূর্ত অধিদপ্তরের নারায়ণগঞ্জ বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে যোগদান করেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি প্রশাসনিক ক্ষমতা নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করেন। অভিযোগ রয়েছে, যোগদানের কয়েক মাসের মধ্যেই দরপত্র প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ভেঙে পড়ে। অধিকাংশ টেন্ডার তার ঘনিষ্ঠ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেওয়া হয় এবং যেসব ঠিকাদার তার সিন্ডিকেটের বাইরে ছিলেন, তাদের নানা অজুহাতে কাজ থেকে বাদ দেওয়া হয়।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মচারী জানান, দরপত্র আহ্বানের আগেই ঠিক হয়ে যেত কোন ঠিকাদার কাজ পাবে। দরপত্রের শর্ত এমনভাবে সাজানো হতো, যাতে নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য কেউ যোগ্যতা অর্জন করতে না পারে। এই প্রক্রিয়ায় সরকারি অর্থ লুটপাট হয়েছে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে গুণগত মান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এই টেন্ডারবাণিজ্যের মাধ্যমে আহসান হাবীব বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করে নামে-বেনামে অঢেল সম্পদ গড়েছেন। রাজধানী ও নারায়ণগঞ্জে একাধিক ফ্ল্যাট, জমি এবং বিলাসবহুল গাড়ির মালিকানা তার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। এসব সম্পদের সঙ্গে তার সরকারি বেতনের কোনো সামঞ্জস্য নেই বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন।

গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানায়, আহসান হাবীবের বিরুদ্ধে কয়েক কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল। এমনকি দেশের বাইরে শতকোটি টাকা পাচারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তবে রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে এসব অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

আহসান হাবীবের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর পেছনে তার রাজনৈতিক পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন এবং ছাত্রলীগের রাজনীতির মাধ্যমে ক্ষমতার কেন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এই রাজনৈতিক নেটওয়ার্কই তাকে দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ রাখছে বলে ধারণা করছেন অনেকে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক গণপূর্ত কর্মকর্তা বলেন, আহসান হাবীবের বিরুদ্ধে কোনো সংবাদ প্রকাশ হলে তা দ্রুত ম্যানেজ করা হয়। কখনো রাজনৈতিক চাপ, কখনো প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়া হয়। তার নিজস্ব একটি সিন্ডিকেট রয়েছে, যারা গণপূর্তের ভেতরে তার স্বার্থ রক্ষা করে।

সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি হলো বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় তার ভূমিকা। অভিযোগ রয়েছে, আন্দোলন চলাকালে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা ও সহিংসতায় অর্থ ও রসদ জুগিয়েছেন আহসান হাবীব। আওয়ামী লীগ সরকারের সুবিধাভোগী কর্মকর্তা হিসেবে তিনি আন্দোলন দমনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তার বিরুদ্ধে ক্ষোভ আরও বেড়ে যায়।

৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর অনেক আওয়ামী লীগঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা আত্মগোপনে গেলেও আহসান হাবীব প্রকাশ্যে কর্মস্থলে বহাল থাকেন। অভিযোগ রয়েছে, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার অন্যতম মাস্টারমাইন্ড হিসেবে চিহ্নিত হলেও তিনি এখনো দাপটের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন।

আহসান হাবীব বর্তমানে রাজধানীর পল্টন মডেল থানার একটি হত্যা মামলার আসামি। মামলা নংু৮৭৪ অনুযায়ী তিনি ৭০ নম্বর আসামি। জানা গেছে, কে এম শাহরিয়ার শুভ বাদী হয়ে গত ৩১ অক্টোবর ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তার বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করার আবেদন করেন। আদালত পল্টন মডেল থানাকে নির্দেশ দেন, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে একই ধরনের আরও হত্যা মামলা রয়েছে কি না, তা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জানাতে।

আদালতের আদেশ অনুযায়ী পল্টন মডেল থানা থেকে পাঠানো প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, একই ঘটনায় এর আগেও একটি হত্যা মামলা দায়ের হয়েছিল। ওই মামলায় মো. জামাল মিয়া বাদী হয়ে একই ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছিলেন। ফলে আদালত আবেদনটিকে হত্যা মামলায় রূপান্তর করেন এবং বিষয়টি বিচারাধীন রয়েছে।

হত্যা মামলার আসামি হওয়ার পর থেকেই বাদীর ওপর চাপ সৃষ্টি ও আর্থিক প্রলোভন দেখিয়ে মামলা থেকে নিজের নাম প্রত্যাহারের চেষ্টা করছেন আহসান হাবীব-এমন অভিযোগও পাওয়া গেছে। একাধিক সূত্র জানায়, মামলার বাদীর সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা চলছে এবং এই মীমাংসা প্রক্রিয়ায় গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন মহলের একটি অংশ সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, আহসান হাবীব আওয়ামী লীগের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি ছিলেন। তার বিরুদ্ধে যত গুরুতর অভিযোগই থাকুক না কেন, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি শেষ পর্যন্ত পার পেয়ে যাবেন-এমন ধারণাই এখন প্রতিষ্ঠানের ভেতরে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

আইনজ্ঞদের মতে, একজন সরকারি কর্মকর্তা যদি হত্যা মামলার আসামি হয়েও বহাল থাকেন, তবে তা প্রশাসনিক জবাবদিহিতা ও আইনের শাসনের জন্য অশনিসংকেত। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিচার ব্যবস্থার ওপর আস্থা আরও ক্ষুণ্ণ হয়।

এ বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য একাধিকবার মো. আহসান হাবীবের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায় কিংবা তিনি কল রিসিভ করেননি।

দুর্নীতি, টেন্ডারবাণিজ্য, অর্থ পাচার ও হত্যা মামলার মতো গুরুতর অভিযোগের পরও আহসান হাবীবের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা না থাকায় প্রশ্ন উঠেছেআইনের ঊর্ধ্বে কি তিনি? নাকি রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় সবকিছুই সম্ভব? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে এখন দেশবাসী।


দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর

প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
কপিরাইট © ২০২৫ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর