বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আর নেই। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। দীর্ঘদিনের অসুস্থতার পর রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আজ মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে তিনি ইন্তেকাল করেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে জানান, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাঁকে ফোন করে বলেন, “আম্মা আর নেই।” মৃত্যুর সময় তারেক রহমান ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা তাঁর পাশে ছিলেন।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আগামীকাল বুধবার রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে খালেদা জিয়ার জানাজা অনুষ্ঠিত হতে পারে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিত খালেদা জিয়া চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে জীবনের পরম সত্যের কাছে আত্মসমর্পণ করলেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, ব্যক্তিগত শোক, কারাবাস ও রোগযন্ত্রণায় পরিপূর্ণ এক বর্ণাঢ্য ও বেদনাবিধুর জীবনের অবসান হলো আজ।
খালেদা জিয়ার জন্ম ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুরে—যদিও এই তারিখ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে মতপার্থক্য রয়েছে। তাঁর বাবা ইস্কান্দার মজুমদার ছিলেন ফেনী জেলার পরশুরামের শ্রীপুর গ্রামের বাসিন্দা এবং মা তৈয়বা বেগমের জন্ম পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার চন্দনবাড়ীতে। পাঁচ সন্তানের মধ্যে খালেদা জিয়া ছিলেন তৃতীয়।
জন্মের পর তাঁর নাম রাখা হয় খালেদা খানম। শৈশবে সৌন্দর্যের কারণে পরিবারের সবাই তাঁকে ‘পুতুল’ নামে ডাকতেন। প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন সেন্ট যোসেফ কনভেন্টে। পরে দিনাজপুর সরকারি স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন এবং দিনাজপুর সুরেন্দ্রনাথ কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন।
শৈশবে তিনি নৃত্যচর্চা করতেন এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নৃত্য পরিবেশন করে প্রশংসিত হন। ফুল, পরিচ্ছন্নতা ও পরিপাট্য তাঁর ব্যক্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল, যা পরবর্তী জীবনেও বজায় ছিল।
১৯৬০ সালের ৫ আগস্ট সেনাবাহিনীর তরুণ কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে খালেদা খানমের বিয়ে হয়। বিয়ের পর তিনি ‘বেগম খালেদা জিয়া’ নামেই পরিচিত হয়ে ওঠেন।
এই দম্পতির দুই পুত্র—তারেক রহমান (জন্ম: ১৯৬৫) ও আরাফাত রহমান কোকো (জন্ম: ১৯৭০)। কোকো ২০১৫ সালে মালয়েশিয়ায় হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৮১ সালের ৩০ মার্চ এক ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শহীদ হলে মাত্র ৩৬ বছর বয়সে খালেদা জিয়া বৈধব্য বরণ করেন।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পরই খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়। ১৯৮২ সালের ৪ জানুয়ারি তিনি বিএনপির সদস্যপদ গ্রহণ করেন। ধাপে ধাপে ভাইস চেয়ারম্যান, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হয়ে ১৯৮৪ সালে দলের চেয়ারপারসনের দায়িত্ব নেন।
এরশাদবিরোধী স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তিনি নেতৃত্ব দিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। ১৯৮৬ সালে বিতর্কিত নির্বাচনে অংশ না নিয়ে তিনি ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে দেশজুড়ে পরিচিতি লাভ করেন।
১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হলে ২০ মার্চ বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। মুসলিম বিশ্বে তিনি ছিলেন দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী। তিনি ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১—এই তিন মেয়াদে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি দু’বার বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবেও সংসদে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত তিনি ২৩টি সংসদীয় আসনে নির্বাচন করে কখনো পরাজিত হননি। দীর্ঘ রাজনৈতিক সফর, মাঠপর্যায়ের কর্মসূচি ও সংগঠনের প্রতি তাঁর নিষ্ঠা তাঁকে দলীয় নেতৃত্বে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।
সাফল্যের পাশাপাশি তাঁর রাজনৈতিক জীবনে বিতর্ক ও সমালোচনাও ছিল। বিশেষ করে দুর্নীতির অভিযোগ, ‘হাওয়া ভবন’ ইস্যু এবং আন্তর্জাতিক দুর্নীতি সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান তাঁর সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে।
তিনি জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে কারাবাস ও গৃহবন্দিত্বের শিকার হন—মুক্তিযুদ্ধকাল, ১৯৮১ সালের পরবর্তী সময়, ওয়ান-ইলেভেন পর্ব এবং ২০১৮ সালে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে কারাবাস তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
দীর্ঘদিন ধরে নানা জটিল রোগে ভুগছিলেন খালেদা জিয়া। ২০২০ সালে মানবিক কারণে তাঁকে গৃহবন্দী অবস্থায় মুক্তি দেওয়া হয়। চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি লন্ডনে চিকিৎসা নেওয়ার পর কিছুটা সুস্থতা ফিরলেও বয়স ও রোগের জটিলতায় তিনি ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়েন।
গত ২৩ নভেম্বর তাঁকে শেষবারের মতো এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এক মাসের বেশি সময় চিকিৎসাধীন থাকার পর অবশেষে আজ তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে সক্রিয় থাকা ‘দেশনেত্রী’ বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণে এক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। তাঁর জীবন ছিল সংগ্রাম, নেতৃত্ব, বিতর্ক ও দৃঢ়তার প্রতিচ্ছবি—যা ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫
বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আর নেই। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। দীর্ঘদিনের অসুস্থতার পর রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আজ মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে তিনি ইন্তেকাল করেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে জানান, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাঁকে ফোন করে বলেন, “আম্মা আর নেই।” মৃত্যুর সময় তারেক রহমান ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা তাঁর পাশে ছিলেন।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আগামীকাল বুধবার রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে খালেদা জিয়ার জানাজা অনুষ্ঠিত হতে পারে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিত খালেদা জিয়া চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে জীবনের পরম সত্যের কাছে আত্মসমর্পণ করলেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, ব্যক্তিগত শোক, কারাবাস ও রোগযন্ত্রণায় পরিপূর্ণ এক বর্ণাঢ্য ও বেদনাবিধুর জীবনের অবসান হলো আজ।
খালেদা জিয়ার জন্ম ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুরে—যদিও এই তারিখ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে মতপার্থক্য রয়েছে। তাঁর বাবা ইস্কান্দার মজুমদার ছিলেন ফেনী জেলার পরশুরামের শ্রীপুর গ্রামের বাসিন্দা এবং মা তৈয়বা বেগমের জন্ম পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার চন্দনবাড়ীতে। পাঁচ সন্তানের মধ্যে খালেদা জিয়া ছিলেন তৃতীয়।
জন্মের পর তাঁর নাম রাখা হয় খালেদা খানম। শৈশবে সৌন্দর্যের কারণে পরিবারের সবাই তাঁকে ‘পুতুল’ নামে ডাকতেন। প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন সেন্ট যোসেফ কনভেন্টে। পরে দিনাজপুর সরকারি স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন এবং দিনাজপুর সুরেন্দ্রনাথ কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন।
শৈশবে তিনি নৃত্যচর্চা করতেন এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নৃত্য পরিবেশন করে প্রশংসিত হন। ফুল, পরিচ্ছন্নতা ও পরিপাট্য তাঁর ব্যক্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল, যা পরবর্তী জীবনেও বজায় ছিল।
১৯৬০ সালের ৫ আগস্ট সেনাবাহিনীর তরুণ কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে খালেদা খানমের বিয়ে হয়। বিয়ের পর তিনি ‘বেগম খালেদা জিয়া’ নামেই পরিচিত হয়ে ওঠেন।
এই দম্পতির দুই পুত্র—তারেক রহমান (জন্ম: ১৯৬৫) ও আরাফাত রহমান কোকো (জন্ম: ১৯৭০)। কোকো ২০১৫ সালে মালয়েশিয়ায় হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৮১ সালের ৩০ মার্চ এক ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শহীদ হলে মাত্র ৩৬ বছর বয়সে খালেদা জিয়া বৈধব্য বরণ করেন।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পরই খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়। ১৯৮২ সালের ৪ জানুয়ারি তিনি বিএনপির সদস্যপদ গ্রহণ করেন। ধাপে ধাপে ভাইস চেয়ারম্যান, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হয়ে ১৯৮৪ সালে দলের চেয়ারপারসনের দায়িত্ব নেন।
এরশাদবিরোধী স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তিনি নেতৃত্ব দিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। ১৯৮৬ সালে বিতর্কিত নির্বাচনে অংশ না নিয়ে তিনি ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে দেশজুড়ে পরিচিতি লাভ করেন।
১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হলে ২০ মার্চ বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। মুসলিম বিশ্বে তিনি ছিলেন দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী। তিনি ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১—এই তিন মেয়াদে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি দু’বার বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবেও সংসদে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত তিনি ২৩টি সংসদীয় আসনে নির্বাচন করে কখনো পরাজিত হননি। দীর্ঘ রাজনৈতিক সফর, মাঠপর্যায়ের কর্মসূচি ও সংগঠনের প্রতি তাঁর নিষ্ঠা তাঁকে দলীয় নেতৃত্বে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।
সাফল্যের পাশাপাশি তাঁর রাজনৈতিক জীবনে বিতর্ক ও সমালোচনাও ছিল। বিশেষ করে দুর্নীতির অভিযোগ, ‘হাওয়া ভবন’ ইস্যু এবং আন্তর্জাতিক দুর্নীতি সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান তাঁর সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে।
তিনি জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে কারাবাস ও গৃহবন্দিত্বের শিকার হন—মুক্তিযুদ্ধকাল, ১৯৮১ সালের পরবর্তী সময়, ওয়ান-ইলেভেন পর্ব এবং ২০১৮ সালে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে কারাবাস তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
দীর্ঘদিন ধরে নানা জটিল রোগে ভুগছিলেন খালেদা জিয়া। ২০২০ সালে মানবিক কারণে তাঁকে গৃহবন্দী অবস্থায় মুক্তি দেওয়া হয়। চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি লন্ডনে চিকিৎসা নেওয়ার পর কিছুটা সুস্থতা ফিরলেও বয়স ও রোগের জটিলতায় তিনি ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়েন।
গত ২৩ নভেম্বর তাঁকে শেষবারের মতো এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এক মাসের বেশি সময় চিকিৎসাধীন থাকার পর অবশেষে আজ তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে সক্রিয় থাকা ‘দেশনেত্রী’ বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণে এক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। তাঁর জীবন ছিল সংগ্রাম, নেতৃত্ব, বিতর্ক ও দৃঢ়তার প্রতিচ্ছবি—যা ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

আপনার মতামত লিখুন