আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতার পতনে স্বস্তির নিশ্বাস এলাকাবাসীর
উপজেলা প্রতিনিধি, মির্জাগঞ্জ (পটুয়াখালী):
পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপি নেতা আলতাফ হোসেন চৌধুরীর গাড়িবহরে হামলার মামলায় আওয়ামী লীগের এক প্রভাবশালী নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও দখলবাজির মাধ্যমে ভয়ঙ্কর রাজত্ব কায়েম করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তি হলেন কাকড়াবুনিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক ইউপি সদস্য মো. ফোরকান হাওলাদার (৫২)। তিনি গাজীপুরা গ্রামের মৃত আসমত আলী হাওলাদারের ছেলে। মঙ্গলবার রাতে পুলিশ বিশেষ অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করে এবং বুধবার আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
তার বিরুদ্ধে মামলা (মির্জাগঞ্জ থানার মামলা নং–০৮, তারিখ: ২৭-০৮-২০২৪, জিআর–৯১/২০২৪) আইন শৃঙ্খলা বিঘ্নকারী অপরাধ (দ্রুত বিচার) আইন ২০০২ এর ৪/৫ তৎসহ দণ্ডবিধির ১৪৩/৩৪১/৩২৩/৩০৭/৩৮৫/৩৭৯/৩৮০/৫০৬ ধারায় দায়ের করা হয়েছে। অভিযোগে হত্যাচেষ্টা, চাঁদাবাজি, ডাকাতি, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও মারধরের মতো গুরুতর অপরাধ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
হামলার পটভূমি: ২০২৩ সালের ৮ এপ্রিল বিএনপির অবস্থান কর্মসূচিতে যোগ দিতে সাবেক স্বরাষ্ট্র ও বাণিজ্যমন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরীর নেতৃত্বে নেতাকর্মীরা সুবিদখালী যাচ্ছিলেন। সুবিদখালী বন্দরের তিন রাস্তার মোড়ে পৌঁছালে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে তাদের ওপর হামলা চালায়।
লোহার রড, হকিস্টিক ও দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহার করে এলোপাতাড়ি মারধরে বহু বিএনপি কর্মী আহত হন। এলাকাজুড়ে ভাঙচুর ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সরকার পরিবর্তনের পর গত ২৭ আগস্ট জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আলমগীর হোসেন দ্রুত বিচার আইনে মামলা করেন। আসামির তালিকায় ১০২ জনের নাম উল্লেখ করা হয় এবং আরও ৫০–৬০ জনকে অজ্ঞাত আসামি রাখা হয়।
ফোরকানের অপরাধ সাম্রাজ্য: স্থানীয়রা জানান, রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে ফোরকান হাওলাদার একটি সন্ত্রাসী সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন।
সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড: প্রতিপক্ষের বাড়িঘর ভাঙচুর, মারধর ও ভয়ভীতি প্রদর্শন ছিল তার নিয়মিত কৌশল।
চাঁদাবাজি ও দখলবাজি: বাজার ও ঘাট থেকে চাঁদা আদায়, জমি দখল ও সাধারণ মানুষকে জিম্মি করা তার শক্তির মূল ভিত্তি।
মাদক ব্যবসা: ইয়াবা ও ফেনসিডিল কারবারে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে। যুবসমাজকে মাদকের ফাঁদে ফেলেও তিনি প্রভাব বিস্তার করতেন।
রাজনৈতিক দমননীতি: বিরোধী মতাবলম্বীদের ওপর হামলা চালিয়ে স্তব্ধ করে রাখতেন।
অবৈধ সম্পদ: এসব অপরাধ থেকে উপার্জিত অর্থে বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ করে নিজেকে অঘোষিত সম্রাটে পরিণত করেন।
সহযোগী চক্র: এলাকাবাসীর অভিযোগ অনুযায়ী, তার সহযোগীদের মধ্যে রয়েছেন—মোঃ হক মিয়া (৫৫), মোঃ জসিম উদ্দিন রাজীব (৩৫), মোঃ রাজ মিয়া (২০), মোঃ রুহুল আমিন (৬৫), মোঃ আজিজ মিয়া (৬০), মোঃ শহিদুল ইসলাম (৪৮), মোঃ কামাল মিয়া (৩৫) ও মোঃ জামাল মিয়া (৩০)।
রাজনৈতিক উত্থান: একসময় সাধারণ কর্মী থেকে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পর্যন্ত উঠেন ফোরকান। রাজনৈতিক পরিচয়কে ঢাল বানিয়ে তিনি এলাকায় দাপট বিস্তার করেন এবং সময়ের সঙ্গে একটি শক্তিশালী অপরাধী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন।
মির্জাগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নজরুল ইসলাম বলেন,
“দ্রুত বিচার আইনের মামলায় কাকড়াবুনিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ফোরকান হাওলাদারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে পূর্বের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সম্পর্কেও তদন্ত চলছে।”
এলাকায় স্বস্তি ও প্রতিক্রিয়া: দীর্ঘদিনের দাপটের অবসান ঘটায় এলাকাবাসীর মধ্যে স্বস্তি নেমে এসেছে।
একজন বয়স্ক গ্রামবাসী বলেন, “আমরা বহু বছর তার ভয়ে মুখ খুলতে পারিনি। আজকে তার গ্রেপ্তারের খবর শুনে মনে হচ্ছে বুকের ভেতর থেকে পাথর নেমে গেছে।”
স্থানীয়রা আশা প্রকাশ করেছেন, শুধু গ্রেপ্তার নয়, ন্যায়বিচারের মাধ্যমে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত হলে তবেই এলাকায় স্থায়ী শান্তি ফিরে আসবে।

বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৫
আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতার পতনে স্বস্তির নিশ্বাস এলাকাবাসীর
উপজেলা প্রতিনিধি, মির্জাগঞ্জ (পটুয়াখালী):
পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপি নেতা আলতাফ হোসেন চৌধুরীর গাড়িবহরে হামলার মামলায় আওয়ামী লীগের এক প্রভাবশালী নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও দখলবাজির মাধ্যমে ভয়ঙ্কর রাজত্ব কায়েম করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তি হলেন কাকড়াবুনিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক ইউপি সদস্য মো. ফোরকান হাওলাদার (৫২)। তিনি গাজীপুরা গ্রামের মৃত আসমত আলী হাওলাদারের ছেলে। মঙ্গলবার রাতে পুলিশ বিশেষ অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করে এবং বুধবার আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
তার বিরুদ্ধে মামলা (মির্জাগঞ্জ থানার মামলা নং–০৮, তারিখ: ২৭-০৮-২০২৪, জিআর–৯১/২০২৪) আইন শৃঙ্খলা বিঘ্নকারী অপরাধ (দ্রুত বিচার) আইন ২০০২ এর ৪/৫ তৎসহ দণ্ডবিধির ১৪৩/৩৪১/৩২৩/৩০৭/৩৮৫/৩৭৯/৩৮০/৫০৬ ধারায় দায়ের করা হয়েছে। অভিযোগে হত্যাচেষ্টা, চাঁদাবাজি, ডাকাতি, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও মারধরের মতো গুরুতর অপরাধ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
হামলার পটভূমি: ২০২৩ সালের ৮ এপ্রিল বিএনপির অবস্থান কর্মসূচিতে যোগ দিতে সাবেক স্বরাষ্ট্র ও বাণিজ্যমন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরীর নেতৃত্বে নেতাকর্মীরা সুবিদখালী যাচ্ছিলেন। সুবিদখালী বন্দরের তিন রাস্তার মোড়ে পৌঁছালে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে তাদের ওপর হামলা চালায়।
লোহার রড, হকিস্টিক ও দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহার করে এলোপাতাড়ি মারধরে বহু বিএনপি কর্মী আহত হন। এলাকাজুড়ে ভাঙচুর ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সরকার পরিবর্তনের পর গত ২৭ আগস্ট জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আলমগীর হোসেন দ্রুত বিচার আইনে মামলা করেন। আসামির তালিকায় ১০২ জনের নাম উল্লেখ করা হয় এবং আরও ৫০–৬০ জনকে অজ্ঞাত আসামি রাখা হয়।
ফোরকানের অপরাধ সাম্রাজ্য: স্থানীয়রা জানান, রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে ফোরকান হাওলাদার একটি সন্ত্রাসী সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন।
সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড: প্রতিপক্ষের বাড়িঘর ভাঙচুর, মারধর ও ভয়ভীতি প্রদর্শন ছিল তার নিয়মিত কৌশল।
চাঁদাবাজি ও দখলবাজি: বাজার ও ঘাট থেকে চাঁদা আদায়, জমি দখল ও সাধারণ মানুষকে জিম্মি করা তার শক্তির মূল ভিত্তি।
মাদক ব্যবসা: ইয়াবা ও ফেনসিডিল কারবারে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে। যুবসমাজকে মাদকের ফাঁদে ফেলেও তিনি প্রভাব বিস্তার করতেন।
রাজনৈতিক দমননীতি: বিরোধী মতাবলম্বীদের ওপর হামলা চালিয়ে স্তব্ধ করে রাখতেন।
অবৈধ সম্পদ: এসব অপরাধ থেকে উপার্জিত অর্থে বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ করে নিজেকে অঘোষিত সম্রাটে পরিণত করেন।
সহযোগী চক্র: এলাকাবাসীর অভিযোগ অনুযায়ী, তার সহযোগীদের মধ্যে রয়েছেন—মোঃ হক মিয়া (৫৫), মোঃ জসিম উদ্দিন রাজীব (৩৫), মোঃ রাজ মিয়া (২০), মোঃ রুহুল আমিন (৬৫), মোঃ আজিজ মিয়া (৬০), মোঃ শহিদুল ইসলাম (৪৮), মোঃ কামাল মিয়া (৩৫) ও মোঃ জামাল মিয়া (৩০)।
রাজনৈতিক উত্থান: একসময় সাধারণ কর্মী থেকে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পর্যন্ত উঠেন ফোরকান। রাজনৈতিক পরিচয়কে ঢাল বানিয়ে তিনি এলাকায় দাপট বিস্তার করেন এবং সময়ের সঙ্গে একটি শক্তিশালী অপরাধী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন।
মির্জাগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নজরুল ইসলাম বলেন,
“দ্রুত বিচার আইনের মামলায় কাকড়াবুনিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ফোরকান হাওলাদারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে পূর্বের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সম্পর্কেও তদন্ত চলছে।”
এলাকায় স্বস্তি ও প্রতিক্রিয়া: দীর্ঘদিনের দাপটের অবসান ঘটায় এলাকাবাসীর মধ্যে স্বস্তি নেমে এসেছে।
একজন বয়স্ক গ্রামবাসী বলেন, “আমরা বহু বছর তার ভয়ে মুখ খুলতে পারিনি। আজকে তার গ্রেপ্তারের খবর শুনে মনে হচ্ছে বুকের ভেতর থেকে পাথর নেমে গেছে।”
স্থানীয়রা আশা প্রকাশ করেছেন, শুধু গ্রেপ্তার নয়, ন্যায়বিচারের মাধ্যমে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত হলে তবেই এলাকায় স্থায়ী শান্তি ফিরে আসবে।

আপনার মতামত লিখুন