রাজধানীর ব্যস্ততম বাণিজ্যিক কেন্দ্র গুলিস্তান—যেখানে প্রতিদিন লাখো মানুষের চলাচল। কিন্তু সেই গুলিস্তান এখন অনেকের কাছে আতঙ্কের নাম। অভিযোগ উঠেছে, ফুটপাত থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ সড়কের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে একটি শক্তিশালী চাঁদাবাজ চক্র, যার কারণে সাধারণ মানুষ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা পড়ছেন চরম ভোগান্তিতে।
গুলিস্তান এলাকায় সরেজমিনে গেলে দেখা যায়, ফুটপাতের বড় অংশজুড়ে বসে আছে অস্থায়ী দোকান ও ভ্যান। এতে পথচারীদের চলাচল কঠিন হয়ে পড়েছে, পাশাপাশি যানজটও বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। স্থানীয়দের দাবি, রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হলেও চাঁদাবাজির কাঠামোতে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন আসেনি। বরং পুরোনো প্রভাবশালীরা নতুন পরিচয়ে আবার সক্রিয় হয়েছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কিছু হকার্স সংগঠনের আড়ালে একটি সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে গুলিস্তানের বিভিন্ন অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা নিজেদের মধ্যে এলাকা ভাগ করে নিয়েছে এবং প্রতিদিন নির্দিষ্ট হারে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
গুলিস্তানের জিরো পয়েন্ট, জিপিও এলাকা, বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ ও গোলাপশাহ মাজারসংলগ্ন এলাকায় নতুন করে হকার বসতে চাইলে দিতে হয় ‘পজিশন ফি’। স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, এই ফি ২ লাখ থেকে ৫ লাখ টাকার মধ্যে হয়ে থাকে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক হকার বলেন,
“এখানে দাঁড়াতে গেলেও টাকা লাগে। বসতে চাইলে আগে বড় অঙ্ক দিতে হয়, তারপর প্রতিদিন আলাদা টাকা দিতে হয়।”
তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি দোকান বা ভ্যান থেকে দৈনিক ৫০ টাকা থেকে শুরু করে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। এছাড়া নির্দিষ্ট এলাকা বা ‘বিট’ ধরে মাসিক ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা দিতে হয়। বিশেষ দিবস বা উৎসবের সময় অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।
হিসাব করলে দেখা যায়, হাজার হাজার হকার থেকে প্রতিদিন বিপুল অঙ্কের অর্থ সংগ্রহ করা হচ্ছে, যা মিলিয়ে কয়েক কোটি টাকায় পৌঁছায় বলে দাবি স্থানীয়দের।
গুলিস্তানে চাঁদাবাজির এই কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তথাকথিত ‘লাইনম্যান’রা। অভিযোগ রয়েছে, তারা বিভিন্ন অংশে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে হকারদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করে থাকেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গুলিস্তান সিনেমা হল, জিপিও এলাকা, বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ, ফুলবাড়িয়া বাসস্ট্যান্ড, স্টেডিয়ামসংলগ্ন এলাকা—প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের অধীনে রয়েছে।
একাধিক হকার জানান, প্রতিদিন বিকেলে নির্দিষ্ট স্থানে দাঁড়িয়ে থাকেন এই লাইনম্যানরা। তাদের প্রতিনিধিরা হকারদের কাছ থেকে টাকা তুলে এনে জমা দেন। কেউ নির্ধারিত অর্থ দিতে দেরি করলে বা অস্বীকৃতি জানালে তাকে উচ্ছেদ বা হয়রানির শিকার হতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
চাঁদাবাজির এই নেটওয়ার্কের পেছনে কয়েকটি হকার্স সংগঠনের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে। যদিও এসব সংগঠনের নেতারা বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।
বাংলাদেশ হকার্স ফেডারেশনের এক নেতা বলেন,
“রাজধানীতে হকারদের শৃঙ্খলায় আনতে হলে প্রথমেই অবৈধভাবে অর্থ আদায়ের অভিযোগে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে হবে। এরপর হকারদের তালিকা করে নির্দিষ্ট জায়গায় বসানোর ব্যবস্থা করতে হবে।”
তবে অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সম্প্রতি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন গুলিস্তানসহ কয়েকটি এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে। বায়তুল মোকাররম দক্ষিণ গেটসহ বিভিন্ন স্থান থেকে হকার সরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই আগের অবস্থায় ফিরে যায় এলাকা।
সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, হকারদের পুনর্বাসনের জন্য আইডি কার্ড দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। নির্দিষ্ট জায়গায় বৈধভাবে বসার সুযোগ দেওয়া হবে কার্ডধারীদের।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের এক কর্মকর্তা বলেন,
“চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে আমাদের জিরো টলারেন্স নীতি রয়েছে। বৈধ হকারদের জন্য কার্ড দেওয়া হবে, যাতে তারা কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হন।”
গুলিস্তান এলাকার এই পরিস্থিতির কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে সড়কে হাঁটতে হচ্ছে পথচারীদের। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।
একজন পথচারী বলেন,
“ফুটপাত দিয়ে হাঁটার সুযোগ নেই। সব জায়গায় দোকান। রাস্তায় নামলে আবার গাড়ির চাপ।”
এছাড়া যানজটের কারণে ব্যবসায়িক কার্যক্রমেও প্রভাব পড়ছে বলে জানান স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই অবৈধ কাঠামো ভাঙতে হলে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। শুধু উচ্ছেদ অভিযান নয়, টেকসই পুনর্বাসন ও কঠোর নজরদারি দরকার।
আইনশৃঙ্খলা বিশ্লেষকরা বলছেন,
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি পদক্ষেপের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন—
রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র গুলিস্তান এখন এক জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে জীবিকার তাগিদে ফুটপাতে বসা হাজারো হকার, অন্যদিকে অভিযোগের মুখে থাকা চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট। এই দ্বৈত সংকটের সমাধান না হলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমবে না। তাই প্রয়োজন কার্যকর, দীর্ঘমেয়াদি এবং স্বচ্ছ উদ্যোগ—যেখানে আইনের শাসন নিশ্চিত হবে এবং জীবিকার পথও বন্ধ হবে না।

মঙ্গলবার, ০৫ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ মে ২০২৬
রাজধানীর ব্যস্ততম বাণিজ্যিক কেন্দ্র গুলিস্তান—যেখানে প্রতিদিন লাখো মানুষের চলাচল। কিন্তু সেই গুলিস্তান এখন অনেকের কাছে আতঙ্কের নাম। অভিযোগ উঠেছে, ফুটপাত থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ সড়কের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে একটি শক্তিশালী চাঁদাবাজ চক্র, যার কারণে সাধারণ মানুষ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা পড়ছেন চরম ভোগান্তিতে।
গুলিস্তান এলাকায় সরেজমিনে গেলে দেখা যায়, ফুটপাতের বড় অংশজুড়ে বসে আছে অস্থায়ী দোকান ও ভ্যান। এতে পথচারীদের চলাচল কঠিন হয়ে পড়েছে, পাশাপাশি যানজটও বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। স্থানীয়দের দাবি, রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হলেও চাঁদাবাজির কাঠামোতে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন আসেনি। বরং পুরোনো প্রভাবশালীরা নতুন পরিচয়ে আবার সক্রিয় হয়েছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কিছু হকার্স সংগঠনের আড়ালে একটি সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে গুলিস্তানের বিভিন্ন অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা নিজেদের মধ্যে এলাকা ভাগ করে নিয়েছে এবং প্রতিদিন নির্দিষ্ট হারে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
গুলিস্তানের জিরো পয়েন্ট, জিপিও এলাকা, বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ ও গোলাপশাহ মাজারসংলগ্ন এলাকায় নতুন করে হকার বসতে চাইলে দিতে হয় ‘পজিশন ফি’। স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, এই ফি ২ লাখ থেকে ৫ লাখ টাকার মধ্যে হয়ে থাকে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক হকার বলেন,
“এখানে দাঁড়াতে গেলেও টাকা লাগে। বসতে চাইলে আগে বড় অঙ্ক দিতে হয়, তারপর প্রতিদিন আলাদা টাকা দিতে হয়।”
তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি দোকান বা ভ্যান থেকে দৈনিক ৫০ টাকা থেকে শুরু করে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। এছাড়া নির্দিষ্ট এলাকা বা ‘বিট’ ধরে মাসিক ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা দিতে হয়। বিশেষ দিবস বা উৎসবের সময় অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।
হিসাব করলে দেখা যায়, হাজার হাজার হকার থেকে প্রতিদিন বিপুল অঙ্কের অর্থ সংগ্রহ করা হচ্ছে, যা মিলিয়ে কয়েক কোটি টাকায় পৌঁছায় বলে দাবি স্থানীয়দের।
গুলিস্তানে চাঁদাবাজির এই কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তথাকথিত ‘লাইনম্যান’রা। অভিযোগ রয়েছে, তারা বিভিন্ন অংশে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে হকারদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করে থাকেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গুলিস্তান সিনেমা হল, জিপিও এলাকা, বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ, ফুলবাড়িয়া বাসস্ট্যান্ড, স্টেডিয়ামসংলগ্ন এলাকা—প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের অধীনে রয়েছে।
একাধিক হকার জানান, প্রতিদিন বিকেলে নির্দিষ্ট স্থানে দাঁড়িয়ে থাকেন এই লাইনম্যানরা। তাদের প্রতিনিধিরা হকারদের কাছ থেকে টাকা তুলে এনে জমা দেন। কেউ নির্ধারিত অর্থ দিতে দেরি করলে বা অস্বীকৃতি জানালে তাকে উচ্ছেদ বা হয়রানির শিকার হতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
চাঁদাবাজির এই নেটওয়ার্কের পেছনে কয়েকটি হকার্স সংগঠনের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে। যদিও এসব সংগঠনের নেতারা বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।
বাংলাদেশ হকার্স ফেডারেশনের এক নেতা বলেন,
“রাজধানীতে হকারদের শৃঙ্খলায় আনতে হলে প্রথমেই অবৈধভাবে অর্থ আদায়ের অভিযোগে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে হবে। এরপর হকারদের তালিকা করে নির্দিষ্ট জায়গায় বসানোর ব্যবস্থা করতে হবে।”
তবে অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সম্প্রতি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন গুলিস্তানসহ কয়েকটি এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে। বায়তুল মোকাররম দক্ষিণ গেটসহ বিভিন্ন স্থান থেকে হকার সরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই আগের অবস্থায় ফিরে যায় এলাকা।
সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, হকারদের পুনর্বাসনের জন্য আইডি কার্ড দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। নির্দিষ্ট জায়গায় বৈধভাবে বসার সুযোগ দেওয়া হবে কার্ডধারীদের।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের এক কর্মকর্তা বলেন,
“চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে আমাদের জিরো টলারেন্স নীতি রয়েছে। বৈধ হকারদের জন্য কার্ড দেওয়া হবে, যাতে তারা কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হন।”
গুলিস্তান এলাকার এই পরিস্থিতির কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে সড়কে হাঁটতে হচ্ছে পথচারীদের। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।
একজন পথচারী বলেন,
“ফুটপাত দিয়ে হাঁটার সুযোগ নেই। সব জায়গায় দোকান। রাস্তায় নামলে আবার গাড়ির চাপ।”
এছাড়া যানজটের কারণে ব্যবসায়িক কার্যক্রমেও প্রভাব পড়ছে বলে জানান স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই অবৈধ কাঠামো ভাঙতে হলে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। শুধু উচ্ছেদ অভিযান নয়, টেকসই পুনর্বাসন ও কঠোর নজরদারি দরকার।
আইনশৃঙ্খলা বিশ্লেষকরা বলছেন,
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি পদক্ষেপের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন—
রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র গুলিস্তান এখন এক জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে জীবিকার তাগিদে ফুটপাতে বসা হাজারো হকার, অন্যদিকে অভিযোগের মুখে থাকা চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট। এই দ্বৈত সংকটের সমাধান না হলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমবে না। তাই প্রয়োজন কার্যকর, দীর্ঘমেয়াদি এবং স্বচ্ছ উদ্যোগ—যেখানে আইনের শাসন নিশ্চিত হবে এবং জীবিকার পথও বন্ধ হবে না।

আপনার মতামত লিখুন