দেশে বাড়ছেই হামের প্রকোপ, আরও ৮ শিশুর মৃত্যু নিয়ে উদ্বেগ
২৪ ঘণ্টায় শনাক্ত ১২৬ নতুন রোগী, উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভিড় বাড়ছেদেশে হাম ও হামের উপসর্গে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা আবারও বেড়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় আরও আট শিশুর মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এর মধ্যে একজন নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত ছিল, আর বাকি সাতজনের মধ্যে হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে বলে জানানো হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ১২৬ জনের শরীরে নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে।বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়। মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এই হিসাব তৈরি করা হয়েছে।কোন বিভাগে কত মৃত্যুস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় বরিশাল বিভাগে একজন নিশ্চিত হামে আক্রান্ত রোগীর মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে হামের উপসর্গ নিয়ে সিলেটে তিনজন, ময়মনসিংহে দুইজন এবং ঢাকা ও চট্টগ্রামে একজন করে শিশুর মৃত্যু হয়েছে।[TECHTARANGA-POST:1235]চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ শিশুর মধ্যে জ্বর, শরীরে লালচে ফুসকুড়ি, শ্বাসকষ্ট এবং দুর্বলতার মতো উপসর্গ দেখা যাচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া ও পানিশূন্যতার জটিলতাও তৈরি হচ্ছে বলে জানা গেছে।আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা কোথায় দাঁড়ালস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্যে বলা হয়েছে, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে নিশ্চিত হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ১৫০ জনে।একই সময়ে নিশ্চিত হামে মারা গেছে ৬৯ জন। এছাড়া সন্দেহজনক হাম রোগ ও উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা পৌঁছেছে ৩৬৩ জনে। সব মিলিয়ে হাম ও হামের উপসর্গে মোট মৃত্যুর সংখ্যা এখন ৪৩২।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। কারণ দেশের অনেক এলাকায় এখনো পরীক্ষা ও রিপোর্টিং ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা রয়েছে।হাসপাতালে বাড়ছে রোগীর চাপগত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে হামের উপসর্গ শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ৪৮৯ জনের শরীরে। তাদের মধ্যে ১ হাজার ১৭৩ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। একই সময়ে চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছেন ৯৫৫ জন।রাজধানীসহ বিভাগীয় শহরগুলোর সরকারি হাসপাতালগুলোতে শিশু রোগীর চাপ বাড়ছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। বিশেষ করে শিশু ওয়ার্ডে অতিরিক্ত রোগীর কারণে অনেক হাসপাতালে শয্যা সংকটের অভিযোগ উঠেছে।একজন শিশু বিশেষজ্ঞ বলেন, “অনেক অভিভাবক শুরুতে সাধারণ জ্বর ভেবে চিকিৎসা নিতে দেরি করছেন। পরে অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতালে আনছেন। এতে ঝুঁকি বাড়ছে।”টিকা না নেওয়া শিশুদের ঝুঁকি বেশিস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেসব শিশু নিয়মিত টিকা পায়নি বা টিকার আওতার বাইরে রয়েছে, তাদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে।গ্রামাঞ্চল ও শহরের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি বলে দাবি করা হচ্ছে। বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের মধ্যে জটিলতা দ্রুত বাড়ছে।স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অভিভাবকদের শিশুদের টিকাদান নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি জ্বর বা ফুসকুড়ির মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।কেন বাড়ছে উদ্বেগচিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ। একজন আক্রান্ত শিশু থেকে দ্রুত অন্যদের মধ্যে এটি ছড়িয়ে পড়তে পারে। স্কুল, বস্তি ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি বেশি থাকে।[TECHTARANGA-POST:1236]তারা বলছেন, টিকাদান কর্মসূচিতে ঘাটতি, স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাব এবং কিছু এলাকায় চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতার কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠছে।একজন জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক বলেন, “শুধু হাসপাতালে চিকিৎসা বাড়ালেই হবে না। প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। টিকাদান কভারেজ বাড়ানো এখন সবচেয়ে জরুরি।”পরিবারগুলোতে বাড়ছে আতঙ্কহাসপাতালগুলোতে সন্তানকে নিয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবকদের ভিড় বাড়ছে। অনেকেই বলছেন, শিশুদের জ্বর ও ফুসকুড়ি দেখা দিলেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে পরিবারে।ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এক স্বজন জানান, কয়েকদিনের জ্বরের পর শিশুটির শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। পরে হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও তাকে বাঁচানো যায়নি।ঢাকার কয়েকটি হাসপাতালে দেখা গেছে, অনেক অভিভাবক আগেভাগেই শিশুদের নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে আসছেন। এতে বহির্বিভাগেও রোগীর চাপ বেড়েছে।পরিস্থিতি সামাল দিতে কী করা হচ্ছেস্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, আক্রান্ত এলাকা চিহ্নিত করে নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে। হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসা সহায়তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।[TECHTARANGA-POST:1233]তবে মাঠপর্যায়ে জনবল সংকট ও অতিরিক্ত রোগীর চাপ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। কিছু এলাকায় শিশু বিশেষজ্ঞের স্বল্পতার কথাও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে শিশুদের সুরক্ষায় টিকাদান কার্যক্রম জোরদার এবং সচেতনতামূলক প্রচারণা বাড়ানো জরুরি।উপসংহার
দেশে হাম পরিস্থিতি এখন নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। প্রতিদিন আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকায় স্বাস্থ্যখাতের ওপর চাপও বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা না গেলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। শিশুদের সুরক্ষায় টিকা নিশ্চিত করা এবং উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার ওপরই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন চিকিৎসকরা।