দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর
সর্বশেষ

হাম ও উপসর্গে মৃত্যু ১১০০ ছাড়াল, দায়ীদের চিহ্নিত করার দাবি জনস্বাস্থ্যবিদদের

দেশে হামের প্রকোপ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছরে নিশ্চিত হামে ১০১ জন এবং হামের উপসর্গ নিয়ে ১ হাজার ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। সব মিলিয়ে হাম ও এর উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১০৪ জনে।মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত হেলথ বুলেটিনে এ তথ্য জানানো হয়। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে ১ হাজার ৩৩৯ জন রোগী এসেছে।এ পরিস্থিতিতে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যুর পেছনের কারণ অনুসন্ধান এবং দায়ীদের চিহ্নিত করার দাবি জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্যবিদেরা।স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুলেটিন অনুযায়ী, সোমবার সকাল ৮টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগেই মারা গেছেন তিনজন।এ সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে ১ হাজার ৩৩৯ জন রোগী এসেছে।বিভাগভিত্তিক হিসাবে ঢাকা বিভাগে ৫১৬ জন, রাজশাহীতে ২৯, সিলেটে ২০৬, চট্টগ্রামে ২৭৯, বরিশালে ১০৭, ময়মনসিংহে ৮৬, খুলনায় ৮৯ এবং রংপুরে ২৭ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ১ লাখ ৬৮ হাজার ৬৫৫ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। তাদের মধ্যে ১ লাখ ৬১ হাজার ৭৯৮ জন চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন।একই সময়ের হিসাবে দেশে সন্দেহজনক হামের রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৯০ হাজার ৫৫০ জনে। এর মধ্যে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছেন ২১ হাজার ৩৯২ জন।সংক্রমণ ও মৃত্যুর এই পরিসংখ্যান নিয়ে চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্যবিদ ও গবেষকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।জনস্বাস্থ্যবিদদের দাবি, বাংলাদেশে হামে এত মৃত্যু ও সংক্রমণের ঘটনা আগে দেখা যায়নি। বিশেষ করে শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এই রোগ টিকাদানের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের কাছাকাছি চলে এসেছিল বলে তারা উল্লেখ করছেন।বিশিষ্ট জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন এ পরিস্থিতিকে রাষ্ট্রীয় অবহেলার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ বলে মন্তব্য করেছেন।তার দাবি, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিকাদানে অবহেলা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে চিকিৎসা ও টিকাদান—উভয় ক্ষেত্রেই অবহেলা হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। এসব অবহেলার দায় নির্ধারণ করে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তিনি।তবে সরকারের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত বক্তব্য এই প্রতিবেদনের সরবরাহ করা তথ্যে নেই।চলতি বছরের শুরু থেকেই দেশে হামের প্রকোপ বাড়তে থাকে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মার্চে সংক্রমণ আরও বাড়লেও পরিস্থিতি মোকাবিলায় যথেষ্ট তৎপরতা ছিল কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জনস্বাস্থ্যবিদেরা।তাদের অভিযোগ, গণটিকাদান কর্মসূচির সময় বিপুলসংখ্যক শিশু টিকার আওতার বাইরে থেকে যাওয়ার বিষয়টিও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে।তবে কতজন শিশু কেন টিকার আওতার বাইরে ছিল, কোথায় ঘাটতি হয়েছে এবং এর সঙ্গে বর্তমান সংক্রমণের সরাসরি সম্পর্ক কতটা—এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে পূর্ণাঙ্গ তথ্যভিত্তিক তদন্ত প্রয়োজন।জনস্বাস্থ্যবিদ বে-নজির আহমেদ মনে করেন, হাম প্রতিরোধে সরকার কার্যত ব্যর্থ হয়েছে। তিনি পরিস্থিতির দায় নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পদত্যাগের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে বলেও মত দিয়েছেন।দেশজুড়ে সংক্রমণ ও শত শত শিশুর মৃত্যুর পর হামের পরিস্থিতির নেপথ্যের কারণ অনুসন্ধানের দাবি উঠলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর তদন্ত হয়নি বলে অভিযোগ তার।বে-নজির আহমেদ বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে হামের পরিস্থিতির কারণ অনুসন্ধানের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু তা বাস্তবে কতটা এগিয়েছে, সে বিষয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন।তার মতে, তদন্ত হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের সংকট মোকাবিলায় করণীয় নির্ধারণে দিকনির্দেশনা পাওয়া যেত। একই সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির নেপথ্যের কারণ বিশ্লেষণ এবং দায়ীদের চিহ্নিত করা প্রয়োজন।হামে মৃত্যুর সংখ্যা ১ হাজার ১০০ ছাড়িয়ে যাওয়ার পর এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—কেন পরিস্থিতি এতটা খারাপ হলো?টিকাদান কর্মসূচির আওতায় কত শিশু ছিল, কতজন বাদ পড়েছে, টিকা সরবরাহ বা প্রয়োগে কোথাও ঘাটতি ছিল কি না, রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসায় কী ধরনের সমস্যা হয়েছে—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।একই সঙ্গে হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের মধ্যে মৃত্যুহার, রোগীদের বয়স, টিকাদানের অবস্থা এবং কোন কোন এলাকায় সংক্রমণ বেশি—এসব তথ্য বিশ্লেষণ করলে সংকটের প্রকৃতি আরও স্পষ্ট হতে পারে।হাম প্রতিরোধে টিকাদান গুরুত্বপূর্ণ হলেও শুধু টিকা দেওয়ার পরিসংখ্যান দিয়ে পরিস্থিতি বোঝা যাবে না। কোন শিশু টিকা পেল, কারা বাদ পড়ল এবং বাদ পড়ার কারণ কী—এসব তথ্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ।একই সঙ্গে আক্রান্ত শিশুরা কত দ্রুত চিকিৎসা পাচ্ছে, হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় সক্ষমতা রয়েছে কি না এবং গুরুতর রোগীদের চিকিৎসায় কোথায় ঘাটতি হচ্ছে—সেসব বিষয়ও সামনে আনা দরকার।১ হাজার ১০৪ মৃত্যুর তথ্য সামনে আসার পর দায় নির্ধারণের আগে একটি পূর্ণাঙ্গ ও তথ্যভিত্তিক তদন্ত প্রয়োজন। কারণ টিকাদান, রোগ শনাক্তকরণ, চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার একাধিক স্তরে সমস্যা থাকলে শুধু একটি পক্ষকে দায়ী করে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না।তদন্তে যদি অব্যবস্থাপনা বা অবহেলার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যাতে টিকাপ্রতিরোধযোগ্য একটি রোগ আবার এমন মাত্রায় ছড়িয়ে না পড়ে, সে জন্য তদন্তের সুপারিশ বাস্তবায়নও গুরুত্বপূর্ণ।

হাম ও উপসর্গে মৃত্যু ১১০০ ছাড়াল, দায়ীদের চিহ্নিত করার দাবি জনস্বাস্থ্যবিদদের