বন্যার ঝুঁকিতে বাংলাদেশ: মেঘালয়ের রেকর্ড বৃষ্টিতে সিলেট-সুনামগঞ্জসহ ৬ জেলায় প্লাবনের শঙ্কা
বন্যার ঝুঁকিতে দেশ: সিলেট-সুনামগঞ্জসহ ৬ জেলায় প্লাবনের শঙ্কা, তিস্তা-সুরমার পানি বাড়ছে দ্রুতমাত্র ২৪ ঘণ্টায় ভারতের মেঘালয়ের মাওসিনারামে ৫৩০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের নদ-নদীতে। পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অন্তত ছয় জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।[TECHTARANGA-POST:1630]এরই মধ্যে সুনামগঞ্জে সড়ক তলিয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে, কুড়িগ্রামে নদীভাঙন বেড়েছে, শেরপুরে পাহাড়ি ঢলে সড়ক ভেঙে গ্রাম বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং জামালপুরে বাঁধ ভেঙে কৃষিজমি প্লাবিত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের বিশেষ বুলেটিন অনুযায়ী, আগামী সাত দিনে রংপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বন্যা দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ ও শেরপুরের কিছু এলাকাও সাময়িক প্লাবনের ঝুঁকিতে রয়েছে।মেঘালয়ের রেকর্ড বৃষ্টিতে বাড়ছে উদ্বেগবিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেঘালয়ের পাহাড়ি অঞ্চল বাংলাদেশের জন্য সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সেখানকার অতিবৃষ্টি কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সুরমা, কুশিয়ারা, গোয়াইন, যাদুকাটা ও তিস্তা অববাহিকার নদীগুলোতে পানির চাপ বাড়িয়ে দেয়।ভারতীয় আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ তথ্যে দেখা গেছে, মাওসিনারামে একদিনে যে পরিমাণ বৃষ্টি হয়েছে, তা ভারতের অনেক শুষ্ক অঞ্চলের কয়েক মাসের মোট বৃষ্টিপাতের সমান। এছাড়া সোহরা, মাওকিরওয়াটসহ মেঘালয়ের বিভিন্ন এলাকাতেও অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হয়েছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, উজানে এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি দ্রুত বাড়বে।সুনামগঞ্জে সড়ক তলিয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নসুনামগঞ্জে কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি এবং ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে জেলার প্রধান নদীগুলোর পানি বাড়ছে। ইতোমধ্যে তাহিরপুরের আনোয়ারপুর সড়ক পানির নিচে চলে যাওয়ায় জেলা সদরের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ব্যাহত হয়েছে।জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, আগামী ৪৮ ঘণ্টায় সিলেট, সুনামগঞ্জ ও মেঘালয়ে ভারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টিপাত হতে পারে। এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে সুরমা, বৌলাই ও রক্তি নদীর পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।[TECHTARANGA-POST:1623]সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী কর্মকর্তা মামুন হাওলাদার জানিয়েছেন, চেরাপুঞ্জি অঞ্চলে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় নদীর পানি বাড়ছে। ফলে স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।সিলেটে আকস্মিক বন্যার শঙ্কাসিলেটে এখনো কোনো নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি। তবে সুরমা নদীর কানাইঘাট পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার খুব কাছাকাছি অবস্থান করছে।পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, সুরমা, কুশিয়ারা, গোয়াইন ও পিয়াইন নদীর কয়েকটি পয়েন্টে পানির সমতল বাড়ছে। উজানে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন হতে পারে।সিলেট পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাশ বলেন, উজানের ঢল ও স্থানীয় বৃষ্টিপাত চলতে থাকলে নদীগুলোর পানি আরও বাড়বে। এ কারণে আকস্মিক বন্যার সম্ভাবনা মাথায় রেখে সার্বক্ষণিক নজরদারি করা হচ্ছে।তিস্তা অববাহিকায় বাড়ছে বন্যার আশঙ্কাকুড়িগ্রাম, রংপুর, নীলফামারী ও লালমনিরহাট অঞ্চলে তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।কুড়িগ্রামে বর্তমানে প্রায় ৩৫টি স্থানে নদীভাঙন চলছে। এর মধ্যে ২০টি ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ফেলা হচ্ছে।কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান জানিয়েছেন, আগামী পাঁচ দিনে নদীর পানি আরও বাড়তে পারে। এতে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।রংপুর অঞ্চলেও তিস্তার পানি বিপৎসীমা ছুঁয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। দ্বিতীয় তিস্তা সেতু রক্ষায় নির্মিত বাঁশের স্পারের বিভিন্ন অংশ ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।পাহাড়ি ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত শেরপুর ও জামালপুরশেরপুরের নালিতাবাড়ীতে পাহাড়ি ঢলে একটি পাকা সড়ক ভেঙে যাওয়ায় বাতকুচি গ্রাম কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের স্কুল, বাজার ও ইউনিয়ন পরিষদে যাতায়াতে ভোগান্তি বেড়েছে।[TECHTARANGA-POST:1593]অন্যদিকে জামালপুরের বকশীগঞ্জে পাহাড়ি ঢলের চাপে একটি বাঁধ ভেঙে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে আউশ ধান ও পাটের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন কৃষকরা।স্থানীয়দের দাবি, পানি বাড়তে থাকলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।কেন গুরুত্বপূর্ণ এই পরিস্থিতি?
আগামী ১০ দিনে উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে।
সিলেট, সুনামগঞ্জ, কুড়িগ্রাম ও তিস্তা অববাহিকার নিম্নাঞ্চল সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে।
নদীভাঙনের কারণে হাজারো পরিবার নতুন করে বাস্তুচ্যুত হওয়ার শঙ্কায় রয়েছে।
কৃষিজমি প্লাবিত হলে খাদ্য উৎপাদনেও প্রভাব পড়তে পারে।
বিশ্লেষণ: শুধু বন্যা নয়, এটি অর্থনীতি ও জীবিকারও সংকটবাংলাদেশে বন্যা নতুন ঘটনা নয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের প্রবণতা বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা একে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের সঙ্গে যুক্ত করছেন। আগে যেখানে কয়েক দিনে যে পরিমাণ বৃষ্টি হতো, এখন তা অনেক ক্ষেত্রে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হচ্ছে। ফলে নদীগুলো দ্রুত ফুলে ওঠে এবং মানুষ প্রস্তুতির সুযোগ পায় না।এবারের পরিস্থিতির একটি বিশেষ দিক হলো—বন্যার আশঙ্কা একই সময়ে উত্তরাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল উভয় অঞ্চলে দেখা দিয়েছে। সাধারণত এক অঞ্চলে চাপ বেশি থাকলেও এবার একাধিক নদী অববাহিকায় একযোগে পানি বাড়ছে। এটি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।নিজস্ব পর্যবেক্ষণ: উদ্বেগের কেন্দ্র এখন ‘হাওর ও নদীভাঙন অঞ্চল’সাধারণত মানুষ বন্যা মানেই নদীর পানি বৃদ্ধি বোঝে। কিন্তু এবারের পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হতে পারে নদীভাঙন ও হাওরাঞ্চলের দ্রুত প্লাবন। কারণ পানি বাড়ার আগেই অনেক এলাকায় ভাঙন শুরু হয়েছে। এতে শুধু ঘরবাড়ি নয়, সড়ক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় অর্থনীতিও ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। দুর্যোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, আগাম আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা এবং স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া এখন সবচেয়ে জরুরি।সাধারণ মানুষের ভাবনা ও সতর্কতা
নদী তীরবর্তী ও নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের এখন থেকেই সতর্ক থাকা প্রয়োজন। স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা অনুসরণ, প্রয়োজনীয় নথিপত্র নিরাপদ স্থানে রাখা, শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা এবং গবাদিপশুর নিরাপদ আশ্রয়ের পরিকল্পনা রাখা জরুরি। কারণ উজানের বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি খুব দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে।