৯৫ বারেও শেষ হয়নি তদন্ত, ফের পিছাল বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি মামলার প্রতিবেদন
বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত আর্থিক কেলেঙ্কারিগুলোর একটি—বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল আবারও পিছিয়েছে। ঢাকার আদালত আগামী ২ জুলাই নতুন তারিখ নির্ধারণ করেছেন। এর মধ্য দিয়ে মামলাটিতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময় বাড়ানো হলো ৯৫তম বারের মতো।সোমবার (১৮ মে) ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলাম নতুন এই দিন ধার্য করেন। আদালত সূত্র জানিয়েছে, নির্ধারিত দিনেও তদন্ত সংস্থা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) প্রতিবেদন জমা না দেওয়ায় শুনানি পিছিয়ে যায়।দীর্ঘ এক দশকের কাছাকাছি সময়, তবু অজানা মূল হোতারা২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঘটে যাওয়া এই ঘটনা শুধু বাংলাদেশ নয়, আন্তর্জাতিক আর্থিক অঙ্গনেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে রাখা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে সাইবার জালিয়াতির মাধ্যমে ৮ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার সরিয়ে নেওয়া হয়।[TECHTARANGA-POST:1368]হ্যাকাররা সুইফট (SWIFT) কোড ব্যবহার করে ভুয়া লেনদেনের নির্দেশ পাঠায়। পরে অর্থের বড় একটি অংশ ফিলিপাইনের কয়েকটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও ক্যাসিনোতে পৌঁছে যায় বলে আন্তর্জাতিক তদন্তে উঠে আসে।ঘটনার পরপরই দেশে ও বিদেশে তদন্ত শুরু হলেও প্রায় নয় বছর পার হতে চললেও এখনো নিশ্চিতভাবে মূল পরিকল্পনাকারী কিংবা স্থানীয় সহযোগীদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। তদন্তের এই দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন রয়েছে।আদালতে যা জানা গেলআদালতের প্রসিকিউশন বিভাগ জানিয়েছে, সোমবার ছিল তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্ধারিত দিন। তবে সিআইডি আদালতে কোনো প্রতিবেদন জমা দেয়নি। এরপর বিচারক নতুন তারিখ নির্ধারণ করেন।আইনজীবীদের একাংশ বলছেন, এত বড় আর্থিক অপরাধের তদন্তে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ এবং বিভিন্ন দেশের সংস্থার তথ্য প্রয়োজন হওয়ায় সময় লাগছে। তবে দীর্ঘ সময়েও দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় হতাশা বাড়ছে।একজন আইনজীবী বলেন, “এ ধরনের মামলায় জটিলতা থাকতেই পারে। কিন্তু ৯৫ বার সময় নেওয়ার পরও যদি চূড়ান্ত প্রতিবেদন না আসে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মনে প্রশ্ন উঠবে।”যেভাবে হয়েছিল রিজার্ভ চুরি২০১৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি রাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে কয়েকটি ভুয়া ট্রান্সফার রিকোয়েস্ট পাঠানো হয়। এসব নির্দেশনা যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে পৌঁছায় সুইফট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে।[TECHTARANGA-POST:1357]তদন্ত সংশ্লিষ্টদের ধারণা, বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতরের কোনো দুর্বলতা কিংবা অভ্যন্তরীণ সহায়তা ছাড়া এত বড় সাইবার জালিয়াতি সম্ভব ছিল না। যদিও এখনো কাউকে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়ী করা হয়নি।সেই সময় মোট প্রায় ১০০ কোটি ডলারের লেনদেনের চেষ্টা করা হয়েছিল বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হয়। তবে বানান ভুলসহ কিছু অসঙ্গতির কারণে বেশিরভাগ লেনদেন আটকে যায়। শেষ পর্যন্ত ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার ফিলিপাইনে পাঠানো সম্ভব হয়।পরে অর্থের একটি অংশ উদ্ধার করা গেলেও পুরো টাকা ফেরত আনা যায়নি।মামলা ও তদন্তের বর্তমান অবস্থাঘটনার এক মাসের মাথায়, ২০১৬ সালের ১৫ মার্চ মতিঝিল থানায় মামলা করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগের তৎকালীন উপপরিচালক জোবায়ের বিন হুদা বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করেন।মামলাটি করা হয় মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ও তথ্যপ্রযুক্তি আইনের কয়েকটি ধারায়। পরে তদন্তের দায়িত্ব পায় সিআইডি।তদন্তসংশ্লিষ্টরা বিভিন্ন সময়ে বলেছে, বিদেশি তদন্ত সংস্থার সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান চলছে। বিশেষ করে ফিলিপাইন ও যুক্তরাষ্ট্রের সংস্থাগুলোর সহযোগিতা নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সেই তদন্ত কতদূর এগিয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।প্রশ্ন উঠছে জবাবদিহি নিয়েবাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনা দেশের ব্যাংকিং নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা সামনে নিয়ে আসে। ঘটনার পর সাইবার নিরাপত্তা জোরদার, সার্ভার আপডেট এবং নজরদারি বাড়ানোর নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবু মূল অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা না যাওয়ায় ক্ষোভ রয়েই গেছে।অর্থনীতিবিদদের কেউ কেউ মনে করছেন, দীর্ঘসূত্রতা দেশের আর্থিক খাতের ভাবমূর্তির ওপরও প্রভাব ফেলছে। কারণ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এমন বড় আর্থিক জালিয়াতির সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার একটি দেশের আর্থিক ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে জড়িত।[TECHTARANGA-POST:1330]একজন সাবেক ব্যাংকার বলেন, “ঘটনাটি শুধু অর্থ চুরির বিষয় নয়। এটি ছিল দেশের আর্থিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার বড় ধাক্কা। তাই তদন্ত শেষ হওয়া জরুরি।”সাধারণ মানুষের আস্থার প্রশ্নদেশের সাধারণ মানুষের কাছেও এই মামলাটি একটি আলোচিত বিষয় হয়ে আছে। কারণ রাষ্ট্রের রিজার্ভ মানে দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি। সেই অর্থ চুরির ঘটনায় বছরের পর বছর তদন্ত ঝুলে থাকায় অনেকে হতাশা প্রকাশ করছেন।বিশ্লেষকদের মতে, বড় আর্থিক অপরাধের তদন্তে ধীরগতি থাকলে জনগণের মধ্যে বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে অনাস্থা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে সাইবার অপরাধ মোকাবিলায়ও শক্ত বার্তা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।তবে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক অর্থপাচার ও সাইবার অপরাধের তদন্ত স্বাভাবিকভাবেই সময়সাপেক্ষ। বিভিন্ন দেশের আইন, তথ্য সংগ্রহ এবং প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের কারণে প্রক্রিয়া দীর্ঘ হয়।এখন কী অপেক্ষা?আগামী ২ জুলাই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নতুন দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে ওই দিন সত্যিই প্রতিবেদন জমা হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।মামলাটির অগ্রগতি নিয়ে জনমনে কৌতূহল ও উদ্বেগ দুটোই আছে। বিশেষ করে এত বছর পরও যদি মূল হোতাদের শনাক্ত করা না যায়, তাহলে দেশের আর্থিক নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।