দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর
সর্বশেষ

সিলেটে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা: ট্রাক-পিকআপ সংঘর্ষে নিহত ৮ নির্মাণ শ্রমিক

ভোরের নিস্তব্ধতা ভেঙে সিলেট-ঢাকা মহাসড়কে ঘটে গেল এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। কর্মস্থলে যাওয়ার পথে প্রাণ হারালেন একসঙ্গে ৮ জন নির্মাণ শ্রমিক। আহত হয়েছেন আরও কয়েকজন, যাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছে চিকিৎসকরা।কী ঘটেছিল ঘটনাস্থলেরোববার (৩ মে) সকাল প্রায় ৬টার দিকে সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার তেলিবাজার ব্রিজসংলগ্ন এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, একটি ডিআই পিকআপে করে কয়েকজন নির্মাণ শ্রমিক সুনামগঞ্জের দিকে যাচ্ছিলেন। একই সময়ে বিপরীত দিক থেকে আসা কাঠবোঝাই একটি ট্রাকের সঙ্গে তাদের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।[TECHTARANGA-POST:1045]সংঘর্ষটি ছিল এতটাই ভয়াবহ যে ঘটনাস্থলেই চারজন শ্রমিকের মৃত্যু হয়। গুরুতর আহতদের দ্রুত সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে আরও চারজনকে মৃত ঘোষণা করা হয়। এতে মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় আটে।নিহত ও আহতদের পরিচয়নিহতদের মধ্যে চারজনের পরিচয় নিশ্চিত করা গেছে। তারা হলেন— মো. সুরুজ আলী (৬০), দিরাই উপজেলার ভাটিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মোছা. মুন্নি (৩৫), একই উপজেলার শেষস্তি গ্রামের মো. বদরুল (৩০), সিলেটের জালালাবাদ এলাকার মো. ফরিদুল (৩৫), দিরাই উপজেলার নুরনগর এলাকার অন্য চারজনের পরিচয় এখনও শনাক্ত করা যায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ।আহতদের মধ্যে রয়েছেন বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা শ্রমিকরা, যাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনাস্থানীয় কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, দুর্ঘটনার শব্দ ছিল প্রচণ্ড জোরালো। “আমরা হঠাৎ একটা বিকট শব্দ শুনে ছুটে যাই। গিয়ে দেখি পিকআপটা দুমড়ে-মুচড়ে গেছে, অনেকেই ছিটকে পড়ে আছেন,”—এমনটাই বলেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় বাসিন্দা।[TECHTARANGA-POST:1023]আরেকজন বলেন, “ঘটনাটা এত দ্রুত ঘটেছে যে কেউ কিছু বুঝে ওঠার সুযোগ পায়নি। উদ্ধার কাজেও সময় লেগেছে, কারণ গাড়িগুলো একেবারে জড়িয়ে গিয়েছিল।”দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণপুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে অতিরিক্ত গতি, চালকের অসাবধানতা অথবা রাস্তার পরিস্থিতি এই দুর্ঘটনার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এখনো নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, “দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে তদন্ত শুরু হয়েছে। উভয় গাড়ির চালক পলাতক রয়েছেন, তাদের শনাক্ত ও গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।”সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্নএই দুর্ঘটনা আবারও সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে ভোরবেলা শ্রমিকদের পরিবহনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা নিশ্চিত করা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শ্রমিক পরিবহনে ব্যবহৃত যানবাহনগুলো অনেক সময় নিরাপত্তা মানদণ্ড পূরণ করে না। এছাড়া চালকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও নিয়ম মেনে গাড়ি চালানোর বিষয়টিও যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না।[TECHTARANGA-POST:1031]একজন পরিবহন বিশ্লেষক বলেন, “এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে হলে শুধু আইন করলেই হবে না, বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। নিয়মিত তদারকি ও কঠোর শাস্তি প্রয়োজন।”প্রশাসনের ভূমিকা ও করণীয়প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দুর্ঘটনার বিষয়ে বিস্তারিত তদন্ত করা হবে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি সড়কে নজরদারি বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে।তবে স্থানীয়দের দাবি, শুধু ঘটনার পর তৎপরতা দেখালেই হবে না, বরং আগেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। তেলিবাজার ব্রিজ এলাকা আগে থেকেই দুর্ঘটনাপ্রবণ হিসেবে পরিচিত বলে জানান অনেকেই।অভিযোগ ও প্রতিক্রিয়াদুর্ঘটনার বিষয়ে ট্রাক ও পিকআপ সংশ্লিষ্টদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে, তবে তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পুলিশ জানিয়েছে, চালকদের খুঁজে বের করার পর বিস্তারিত জানা যাবে।মানবিক দিক: একটি পরিবারের গল্পনিহতদের মধ্যে কয়েকজনই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। ফলে এই দুর্ঘটনা শুধু প্রাণহানিই নয়, একাধিক পরিবারকে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।একজন নিহত শ্রমিকের স্বজন বলেন, “সকালে কাজ করতে গিয়েছিল, আর ফিরল লাশ হয়ে। এখন পরিবার কীভাবে চলবে, সেটাই বড় প্রশ্ন।”উপসংহারসিলেটের এই মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা আবারও আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল সড়ক নিরাপত্তার দুর্বলতা। প্রতিদিনের মতো কর্মস্থলে যাওয়ার পথে যারা প্রাণ হারালেন, তাদের মৃত্যু যেন শুধু পরিসংখ্যান হয়ে না থাকে—এটাই প্রত্যাশা। সঠিক তদন্ত, দায়ীদের জবাবদিহি এবং কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা কমিয়ে আনা সম্ভব—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সিলেটে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা: ট্রাক-পিকআপ সংঘর্ষে নিহত ৮ নির্মাণ শ্রমিক