দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর
সর্বশেষ

প্রবাসী অধ্যুষিত মৌলভীবাজারে চিকিৎসার হাহাকার, ‘সিজার বাণিজ্য’ নিয়ে বাড়ছে ক্ষোভ

অর্থনৈতিকভাবে দেশের অন্যতম সমৃদ্ধ জেলা হিসেবে পরিচিত মৌলভীবাজার। প্রবাসী আয়, চা শিল্প ও পর্যটননির্ভর এ জেলায় টাকা আছে, উন্নয়নের নানা গল্পও আছে—কিন্তু নেই মানসম্মত চিকিৎসাসেবা। স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা মেলে না, আর বেসরকারি ক্লিনিকগুলোতে প্রসূতিদের সিজার করানো যেন এক ধরনের অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। সাধারণ রোগের চিকিৎসা থেকে শুরু করে জরুরি সেবা—সবকিছুর জন্য রোগীদের ছুটতে হচ্ছে সিলেটে।প্রায় ২২ লাখ মানুষের এই জেলায় দীর্ঘদিন ধরেই স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। বিশেষ করে প্রসূতি চিকিৎসা ও জরুরি সেবা নিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ বাড়ছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, সরকারি হাসপাতালগুলোতে কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা না থাকায় মানুষ বাধ্য হয়ে বেসরকারি ক্লিনিকে যাচ্ছেন, আর সেখানে অপ্রয়োজনীয় সিজারের অভিযোগ প্রায় নিয়মিত।[TECHTARANGA-POST:1369]সরকারি হাসপাতালে সীমিত সেবা, জটিল রোগী গেলেই রেফারখোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতাল জেলার প্রধান সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র হলেও সেখানে নেই আধুনিক অনেক গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা। আইসিইউ, সিসিইউ, সিটি স্ক্যান, ইকো কিংবা হৃদরোগের পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা ব্যবস্থা এখনো চালু হয়নি। ফলে রোগীদের সামান্য জটিলতা দেখা দিলেও দ্রুত সিলেট পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে।শুধু জেলা সদর নয়, উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর অবস্থাও একই রকম। কোথাও যন্ত্রপাতি আছে কিন্তু চালানোর লোক নেই, কোথাও আবার অপারেশন থিয়েটার থাকলেও পর্যাপ্ত চিকিৎসক নেই। এতে সাধারণ মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।স্থানীয়দের মতে, স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও মৌলভীবাজারে এখনো একটি আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল গড়ে না ওঠা হতাশাজনক। বিশেষ করে এত বিপুলসংখ্যক প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকায় স্বাস্থ্য খাতের এমন দুরবস্থা অনেকের কাছেই বিস্ময়কর।‘সিজার ছাড়া চিকিৎসা হয় না’—রোগীদের অভিযোগজেলা শহরের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক নিয়ে স্থানীয়দের অভিযোগ আরও তীব্র। অনেকে বলছেন, এসব প্রতিষ্ঠানের বড় অংশ মূলত প্রসূতিদের সিজার করানোর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন ক্লিনিকে ১৭ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত প্যাকেজে সিজার করানো হচ্ছে। রোগী আনার জন্য ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রতিনিধি বা দালাল নিয়োগের অভিযোগও রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ক্লিনিক মালিকদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।সচেতন নাগরিক আবুল কালাম, জুয়েল চৌধুরী ও আব্দুল আহাদ বলেন, “মৌলভীবাজারে চিকিৎসাসেবার অভাব এখন বড় সামাজিক সংকটে পরিণত হয়েছে। সরকারি হাসপাতালে সেবা নেই, আর বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার চেয়ে ব্যবসার প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে। সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।”তাদের দাবি, বিশেষ করে গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে অনেক সময় স্বাভাবিক প্রসবের সুযোগ না দিয়ে দ্রুত সিজারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এতে রোগীর পরিবার আর্থিক ও মানসিকভাবে চাপে পড়ে যাচ্ছে।রোগীদের দুর্ভোগ বাড়াচ্ছে সিলেটনির্ভরতাকমলগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা কাওছার আহমেদ জানান, তাঁর মাকে জ্বর নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছিল। কিন্তু দুই দিনেও রোগ শনাক্ত করা যায়নি। পরে বাধ্য হয়ে সিলেটে নিতে হয়েছে।তিনি বলেন, “জেলায় বড় হাসপাতাল থাকলেও কার্যকর চিকিৎসা পাওয়া কঠিন। শেষ পর্যন্ত রোগীকে সিলেটেই নিতে হয়।”একই অভিজ্ঞতার কথা জানান রোগী মাহবুবা আক্তার। তিনি বলেন, “শুধু অক্সিজেন সাপোর্টের জন্যও আমাদের সিলেটে যেতে হয়েছে। মৌলভীবাজারে একটি পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল খুব প্রয়োজন।”[TECHTARANGA-POST:1342]রাজনগরের বাসিন্দা মনাফ মিয়া জানান, তাঁর নবজাতক সন্তানের জন্মের পর জটিলতা দেখা দিলে সদর হাসপাতাল থেকে সিলেটে পাঠানো হয়। পরে চিকিৎসকরা জানান, জন্মের সময় শিশুর মাথায় আঘাত লেগেছিল।এসব ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলো চিকিৎসা ব্যয় সামলাতে গিয়ে আর্থিক সংকটে পড়ছেন।চিকিৎসক সংকটের কথাও বলছে প্রশাসনমৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. প্রণয় কান্তি দাশ বলেন, হাসপাতালের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সেবা চালুর জন্য নিয়মিত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হচ্ছে।তিনি বলেন, “আইসিইউ, সিসিইউ, সিটি স্ক্যান, ইকো ও হৃদরোগ চিকিৎসাসেবা চালুর বিষয়ে আমরা বারবার চিঠি পাঠাচ্ছি। আশা করছি ভবিষ্যতে এসব সুবিধা চালু হবে।”এদিকে সিভিল সার্জন ডা. মো. মামুনুর রহমান বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকটের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তাঁর ভাষ্য, জেলার মানুষকে উন্নত চিকিৎসা দিতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকেও এগিয়ে আসতে হবে।তিনি বলেন, “মৌলভীবাজারে আধুনিক হাসপাতাল ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ঘাটতি রয়েছে। প্রবাসী ও বিত্তবানদের ব্যক্তি উদ্যোগে উন্নত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করলে রোগীদের সিলেটমুখী হওয়া কমবে।”স্বাস্থ্যখাতের সংকটের সামাজিক প্রভাববিশেষজ্ঞদের মতে, একটি জেলার স্বাস্থ্যব্যবস্থা দুর্বল হলে তার প্রভাব শুধু চিকিৎসাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না; সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও এর বড় প্রভাব পড়ে। মৌলভীবাজারের মতো প্রবাসীনির্ভর এলাকায় মানুষ অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম হলেও জরুরি স্বাস্থ্যসেবা না থাকায় অনেক পরিবার অনিশ্চয়তায় ভুগছে।বিশেষ করে গর্ভবতী নারী, শিশু ও বয়স্ক রোগীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে জটিলতা বাড়ছে, আবার সিলেটে নিতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে।[TECHTARANGA-POST:1331]সামাজিক বিশ্লেষকদের মতে, জেলার স্বাস্থ্যসেবাকে কেন্দ্রীয় শহরনির্ভর রেখে দিলে ভবিষ্যতে সংকট আরও বাড়বে। তাই জেলা পর্যায়ে আধুনিক চিকিৎসা অবকাঠামো গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।এখন অপেক্ষা বাস্তব উদ্যোগেরমৌলভীবাজারের মানুষ দীর্ঘদিন ধরেই উন্নত স্বাস্থ্যসেবার দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, নানা প্রতিশ্রুতি মিললেও বাস্তব অগ্রগতি খুব কম। ফলে প্রতিদিনই কেউ না কেউ চিকিৎসার আশায় সিলেটমুখী হচ্ছেন। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, শুধু নতুন ভবন নির্মাণ নয়—দক্ষ চিকিৎসক, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও জবাবদিহিমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিশ্চিত করা হোক। একই সঙ্গে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর কার্যক্রমেও কঠোর নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তারা।

প্রবাসী অধ্যুষিত মৌলভীবাজারে চিকিৎসার হাহাকার, ‘সিজার বাণিজ্য’ নিয়ে বাড়ছে ক্ষোভ