কুষ্টিয়ায় এসএসসি পরীক্ষায় সুপারের ছেলের খাতা লিখে দিচ্ছিলেন শিক্ষকরা, আটক ৩
ছাত্রের খাতা লিখছিলেন শিক্ষকরা, হাতেনাতে আটক ৩কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে এসএসসি (দাখিল) পরীক্ষাকে ঘিরে সামনে এসেছে চাঞ্চল্যকর এক অনিয়মের অভিযোগ। পরীক্ষার হলে বসে থাকা এক শিক্ষার্থীর উত্তরপত্র বাইরে বসে লিখছিলেন তিন শিক্ষক—এমন অভিযোগে তাদের হাতেনাতে আটক করেছে র্যাব। পরে জানা যায়, বহিষ্কৃত ওই পরীক্ষার্থী স্থানীয় একটি মাদ্রাসার সুপারের ছেলে। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসতেই এলাকায় ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।[TECHTARANGA-POST:1429]বুধবার (২০ মে) দুপুরে দৌলতপুর উপজেলার চুয়ামল্লিকপাড়া রেজওয়ানুল উলুম দাখিল মাদ্রাসা পরীক্ষাকেন্দ্রে জীববিজ্ঞান পরীক্ষা চলাকালে এই ঘটনা ঘটে। অভিযুক্ত তিন শিক্ষক হলেন—মহিষকুণ্ডি মুসলিমনগর দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষক মো. বজলুর রহমান (৪৮), মো. নুরুল ইসলাম (৪৫) এবং মোছা. মাতোয়ারা খাতুন।অভিযোগ রয়েছে, তারা বাইরে থেকে উত্তরপত্র লিখে এনে পরীক্ষার্থীর খাতার সঙ্গে জমা দেওয়ার কাজ করছিলেন। র্যাব সদস্যরা অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করে। পরে অভিযুক্ত শিক্ষার্থী মোহাম্মদ নাসিরুল্লাহকে পরীক্ষাকেন্দ্র থেকে বহিষ্কার করা হয়।যে শিক্ষার্থীকে ঘিরে পুরো কাণ্ডবহিষ্কৃত পরীক্ষার্থী নাসিরুল্লাহ স্থানীয় মহিষকুণ্ডি মুসলিমনগর দাখিল মাদ্রাসার সুপার মাওলানা আব্দুল ওহাব বিশ্বাসের ছেলে বলে জানা গেছে। এ তথ্য প্রকাশের পর ঘটনাটি আরও বেশি আলোচনায় আসে। স্থানীয়দের একাংশের দাবি, সাধারণ শিক্ষার্থীদের তুলনায় প্রভাবশালী পরিবারের সন্তানরা অনেক সময় বাড়তি সুবিধা পেয়ে থাকে।র্যাব সূত্রের ভাষ্য, জীববিজ্ঞান পরীক্ষা চলাকালে শিক্ষার্থীর জন্য বাইরে বসে উত্তরপত্র লিখছিলেন ওই তিন শিক্ষক। এরপর সেগুলো কেন্দ্রে পাঠানোর প্রস্তুতির সময় তাদের আটক করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এ ধরনের কাজ তারা নতুন করে শুরু করেননি; বরং বেশ কিছুদিন ধরেই একই কৌশলে অনিয়ম চলছিল।তবে এই অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন রয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।“আমরা বাধ্য হয়েছিলাম”—আটক শিক্ষকদের দাবিআটকের পর তিন শিক্ষক দাবি করেন, তারা স্বেচ্ছায় এই কাজে জড়াননি। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মাদ্রাসার সুপার মো. আব্দুল ওহাব বিশ্বাস তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিলেন। সুপারের ছেলের পরীক্ষার খাতা লিখে দিতে বাধ্য করা হয়েছে বলেও তারা দাবি করেন।যদিও এই দাবির সত্যতা এখনো যাচাই হয়নি। অন্যদিকে, অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মাদ্রাসার সুপার আব্দুল ওহাব বিশ্বাসের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।এ কারণে ঘটনার আরেকটি দিক নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভেতরে ক্ষমতার প্রভাব কতটা গভীরে পৌঁছে গেছে?ঘটনাস্থলে ছুটে যান ম্যাজিস্ট্রেটঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত পরীক্ষাকেন্দ্রে যান দৌলতপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট প্রদীপ কুমার দাস। তিনি ঘটনাস্থলে তদন্ত চালিয়ে শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করার সিদ্ধান্ত নেন।তিনি সাংবাদিকদের বলেন, প্রাথমিক তদন্তে আগেও বাইরে থেকে উত্তরপত্র লিখে এনে জমা দেওয়ার মতো অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। বুধবার র্যাবের হাতে তিন শিক্ষক আটক হওয়ার ঘটনাও সত্য বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।তিনি আরও জানান, যেহেতু অভিযুক্ত শিক্ষকদের কেন্দ্রের বাইরে আটক করা হয়েছে, তাই তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।[TECHTARANGA-POST:1405]বর্তমানে আটক শিক্ষকরা র্যাবের হেফাজতে রয়েছেন এবং আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।শিক্ষা ব্যবস্থায় নতুন করে প্রশ্নএই ঘটনা আবারও দেশের পাবলিক পরীক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। প্রতি বছর নকল, প্রশ্নফাঁস কিংবা কেন্দ্রভিত্তিক অনিয়মের অভিযোগ শোনা গেলেও শিক্ষক জড়িত থাকার অভিযোগ সাধারণ মানুষকে আরও বেশি হতাশ করছে।শিক্ষাবিদদের মতে, যখন একজন শিক্ষক নিজেই পরীক্ষার সততা নষ্ট করার অভিযোগে জড়িয়ে পড়েন, তখন সেটি শুধু একটি কেন্দ্রের সমস্যা থাকে না; পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর আস্থার সংকট তৈরি করে।মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, অনেক অভিভাবক কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তি সন্তানের ফল ভালো করাতে গিয়ে শর্টকাট পথ বেছে নেন। এর ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও একটি ভুল বার্তা যায়—যোগ্যতার চেয়ে প্রভাব বা টাকার জোর বেশি কার্যকর। দীর্ঘমেয়াদে এটি তরুণদের নৈতিকতা ও আত্মবিশ্বাস দুটোকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে।কেন বারবার ঘটছে এমন অনিয়ম?শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, পরীক্ষায় ভালো ফলের সামাজিক চাপ এখন অনেক বেশি। একটি ভালো রেজাল্টকে ভবিষ্যৎ সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে দেখা হয়। ফলে কিছু পরিবার কিংবা প্রতিষ্ঠান যেকোনো উপায়ে ভালো ফল নিশ্চিত করতে চায়।বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের কিছু প্রতিষ্ঠানে নজরদারির ঘাটতি, স্থানীয় প্রভাব এবং পরীক্ষাকেন্দ্র ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।তবে প্রশাসনের সাম্প্রতিক অভিযানগুলোতে এমন ঘটনা প্রকাশ্যে আসায় অনেকেই মনে করছেন, নজরদারি বাড়ছে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রবণতাও আগের তুলনায় শক্ত হচ্ছে।[TECHTARANGA-POST:1347]এখন কী হতে পারে?আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্র বলছে, আটক শিক্ষকদের জিজ্ঞাসাবাদ করে পুরো চক্রের বিষয়ে তথ্য নেওয়া হতে পারে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে শিক্ষা আইন ও ফৌজদারি আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়েও তদন্ত হতে পারে।এদিকে স্থানীয়দের একাংশ বলছেন, শুধু একজন শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। যারা বছরের পর বছর ধরে পরীক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নষ্ট করছে, তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নিলে এমন ঘটনা বন্ধ হবে না।
ঘটনাটি এখন শুধু একটি পরীক্ষাকেন্দ্রের অনিয়ম নয়; বরং দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার নৈতিক সংকট নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে।