সিঙ্গাপুরে শেষ নিঃশ্বাস: গুলিবিদ্ধ হওয়ার ছয় দিনের মাথায় মারা গেলেন শরিফ ওসমান হাদি
রাজধানীর পুরানা পল্টনে মাথায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে টানা কয়েকদিন লড়াই করেছিলেন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি। শেষ পর্যন্ত সেই লড়াই আর জেতা হলো না। উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেওয়া হলেও বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) রাত পৌনে ১০টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়েছে। এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই রাজনৈতিক অঙ্গন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং তাঁর অনুসারীদের মধ্যে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। একই সঙ্গে ইনকিলাব মঞ্চের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজেও শোকবার্তাসহ মৃত্যুর খবর প্রকাশ করা হয়েছে। মৃত্যুর সংবাদ প্রকাশের পর থেকেই সামাজিক মাধ্যমে শোক, ক্ষোভ এবং নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে শুরু করেছে।যেভাবে গুলিবিদ্ধ হন ওসমান হাদিগত ১২ ডিসেম্বর ঢাকার পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট রোড এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন শরিফ ওসমান হাদি। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থলে হঠাৎ আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং পরে জানা যায়, তাঁর মাথায় গুলি লেগেছে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে প্রথমে রাজধানীর একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে পরে সরকারিভাবে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়।চিকিৎসকরা শুরু থেকেই তাঁর অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছিলেন। সিঙ্গাপুরে নেওয়ার পর কয়েকদিন নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হলেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।তদন্তে যেসব তথ্য সামনে আসছেঘটনার তদন্তে ইতোমধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এসেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের এক নেতাকে সম্ভাব্য গুলিবর্ষণকারী হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।তবে এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, অভিযুক্ত ব্যক্তি ঘটনার পর দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে গেছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে তাঁকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি।ঘটনার প্রকৃত কারণ, পরিকল্পনা এবং এর পেছনে অন্য কোনো পক্ষ জড়িত আছে কি না—সেসব বিষয়ও তদন্তাধীন রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।রাজনৈতিক অঙ্গনে শোক ও উত্তেজনাশরিফ ওসমান হাদি শুধু ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্রই ছিলেন না, রাজনৈতিক অঙ্গনেও ধীরে ধীরে আলোচিত একটি মুখ হয়ে উঠছিলেন। জানা গেছে, তিনি ঢাকা-৮ আসনে সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেও প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।তাঁর মৃত্যুর পর বিভিন্ন মহল থেকে সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের দ্রুত বিচারের দাবি উঠেছে। সামাজিক মাধ্যমে অনেকে এটিকে দেশের রাজনৈতিক সহিংসতার ভয়ংকর উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করছেন। আবার কেউ কেউ বলছেন, রাজনৈতিক মতবিরোধ এখন এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে যেখানে ভিন্ন কণ্ঠকে সহ্য করার সংস্কৃতি দুর্বল হয়ে পড়ছে।যদিও ঘটনার পূর্ণ তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো পক্ষকে সরাসরি দায়ী করা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা।কেন বারবার বাড়ছে রাজনৈতিক সহিংসতা?রাজনৈতিক সহিংসতা নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যক্তিগত আক্রোশ, দলীয় আধিপত্য এবং সামাজিক বিভাজনের কারণে সংঘাত আরও তীব্র হচ্ছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক মতভেদকে সহনশীলভাবে মোকাবিলা করার সংস্কৃতি দুর্বল হয়ে পড়লে এমন ঘটনা বাড়তে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ঘৃণা, উসকানি ও বিভাজনমূলক বক্তব্য অনেক সময় বাস্তব জীবনের সহিংসতাকে প্রভাবিত করে।মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে দেখার প্রবণতা সমাজে সহিংস আচরণকে স্বাভাবিক করে তুলছে। এর ফলে তরুণদের একটি অংশ সহজেই চরমপন্থী মানসিকতায় জড়িয়ে পড়ছে।পরিবার ও অনুসারীদের আহাজারিওসমান হাদির মৃত্যুর খবরে তাঁর পরিবার, সহকর্মী ও অনুসারীদের মধ্যে শোকের মাতম দেখা গেছে। সামাজিক মাধ্যমে তাঁর পুরোনো বক্তব্য, রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং বিভিন্ন ছবি ছড়িয়ে পড়েছে।অনেকেই লিখছেন, “একটি প্রাণ চলে গেল, কিন্তু থেকে গেল অনেক প্রশ্ন।” আবার কেউ কেউ দ্রুত বিচার এবং নিরাপদ রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি তুলেছেন।এদিকে তাঁর জানাজা ও মরদেহ দেশে আনার বিষয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বিস্তারিত ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।