দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর
সর্বশেষ

কাদের-নাছিম-আরাফাতসহ ৭ জনের রায় আজ

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির বিরুদ্ধে আজ রায় ঘোষণা করবেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করবেন। মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ আসামিদের বিরুদ্ধে আন্দোলন দমনে রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সহিংসতায় উসকানি, অর্থের জোগান ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনেছে। তবে আসামিপক্ষ এসব অভিযোগ অস্বীকার করে খালাস চেয়েছে।ওবায়দুল কাদের ছাড়া মামলার অন্য আসামিরা হলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল এবং ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান।ট্রাইব্যুনালের বিচারিক প্যানেলে চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর সঙ্গে রয়েছেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।মামলার সাত আসামিই বর্তমানে পলাতক। তাঁদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব না হওয়ায় পলাতক অবস্থাতেই বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। এ কারণে তাঁদের পক্ষে রাষ্ট্রীয় খরচে স্টেট ডিফেন্স আইনজীবী নিয়োগ করা হয়।রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ, আন্দোলন দমনে আসামিরা সমন্বিতভাবে নির্দেশ, প্ররোচনা ও উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন। দলীয় নেতাকর্মীদের রাজপথে নামিয়ে আন্দোলন প্রতিহত করার আহ্বানের পাশাপাশি বিভিন্ন বৈঠকে সহিংসতার পরিকল্পনা, সশস্ত্র হামলা ও দমন-পীড়নে তাঁদের ভূমিকা ছিল বলেও দাবি করেছে প্রসিকিউশন।রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, এসব কর্মকাণ্ডের পর দেশজুড়ে ছাত্র-জনতা হত্যা, হত্যাচেষ্টা ও ব্যাপক সহিংসতার ঘটনা ঘটে।যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সময় প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম অভিযোগ করেন, ওবায়দুল কাদের বিভিন্ন সমাবেশে দলীয় নেতাকর্মীদের আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ‘ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে প্রতিরোধ গড়ে তোলো’ বলে নির্দেশ দিয়েছিলেন।এ ছাড়া ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের সঙ্গে ওবায়দুল কাদেরের কথোপকথনের একটি অডিও এবং বিভিন্ন সংবাদপত্রের প্রতিবেদন আদালতে উপস্থাপন করা হয়। রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, এসব তথ্য আন্দোলন মোকাবিলায় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টি তুলে ধরে।গত ১২ আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষে যুক্তিতর্ক শেষ করেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি মামলার সব অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে দাবি করে আসামিদের সর্বোচ্চ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান।অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় খরচে নিয়োগ পাওয়া আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তাঁদের মক্কেলদের খালাস চেয়েছেন।ওবায়দুল কাদের, বাহাউদ্দিন নাছিম ও মোহাম্মদ আলী আরাফাতের পক্ষে আইনজীবী এম হাসান ইমাম যুক্তি দেন, জনগণের জানমাল রক্ষায় ‘শুট অ্যাট সাইট’ নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তাঁর দাবি, তাঁর মক্কেলরা কোনো কমান্ডিং পজিশনে ছিলেন না এবং কাউকে হত্যার নির্দেশ দেননি।ছাত্রলীগ ও যুবলীগের চার নেতার পক্ষে আইনজীবী ইশরাত জাহান অমি দাবি করেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন দমনের ঘটনায় তাঁর মক্কেলদের নাম আসেনি। তাঁদের বিরুদ্ধে অধীনস্ত নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগও প্রমাণিত হয়নি বলে তিনি দাবি করেন।২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়ে সাত আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল। আসামিদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব না হওয়ায় তাঁদের পক্ষে রাষ্ট্রীয় খরচে স্টেট ডিফেন্স আইনজীবী নিয়োগ করা হয়।চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-২। এরপর ১৭ ফেব্রুয়ারি সূচনা বক্তব্যের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়। তদন্ত কর্মকর্তাসহ রাষ্ট্রপক্ষে মোট ২৯ জন সাক্ষ্য দেন।গত ২ আগস্ট সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। এরপর শুরু হয় যুক্তিতর্ক। ১৭ আগস্ট উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ হলে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়।গুরুত্বপূর্ণ দিকমামলায় মোট সাতজন আসামি রয়েছেন এবং সবাই পলাতক।রাষ্ট্রপক্ষ আসামিদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, উসকানি, অর্থের জোগান ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনেছে।রাষ্ট্রপক্ষ সর্বোচ্চ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চেয়েছে।আসামিপক্ষ অভিযোগ অস্বীকার করে খালাস চেয়েছে।আজকের রায়ে মূলত ট্রাইব্যুনালের মূল্যায়ন জানা যাবে—রাষ্ট্রপক্ষ যে অভিযোগ ও প্রমাণ উপস্থাপন করেছে, সেগুলো আইনগতভাবে কতটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং আসামিদের দায় কতটা প্রমাণিত হয়েছে। দোষী সাব্যস্ত হলে তাঁদের প্রত্যেকের ক্ষেত্রে কী সাজা হবে, সেটিও রায়ের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।এ মামলার গুরুত্ব শুধু সাত আসামির সম্ভাব্য সাজা নিয়ে নয়। আন্দোলন দমনের সময় সিদ্ধান্ত গ্রহণ, রাজনৈতিক নির্দেশ, মাঠপর্যায়ের সহিংসতা এবং এসবের মধ্যে দায়ের সম্পর্ক কীভাবে বিচারিকভাবে মূল্যায়ন করা হয়—আজকের রায় সেই প্রশ্নেও একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে।তবে রায় ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ বা আসামিপক্ষের বক্তব্য—কোনোটিকেই চূড়ান্ত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।

কাদের-নাছিম-আরাফাতসহ ৭ জনের রায় আজ