কুমিল্লা-চাঁদপুর রুটে অনির্দিষ্টকালের বাস ধর্মঘট, হাজীগঞ্জে হামলার অভিযোগে আতঙ্ক
অনির্দিষ্টকালের জন্য কুমিল্লা-চাঁদপুর রুটে বাস চলাচল বন্ধচাঁদপুরের হাজীগঞ্জে গভীর রাতে যাত্রীবাহী বাসের শ্রমিকদের ওপর হামলার অভিযোগ ঘিরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। পরিবহন শ্রমিকদের দাবি, অন্ধকারের মধ্যে অতর্কিত হামলা চালিয়ে একদল দুর্বৃত্ত অন্তত ১৫টি বাস ভাঙচুর করেছে এবং মারধর করেছে শ্রমিকদের। এ ঘটনার পর নিরাপত্তার দাবিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য কুমিল্লা-চাঁদপুর আঞ্চলিক মহাসড়কে বাস চলাচল বন্ধ ঘোষণা করেছেন শ্রমিকরা। এতে রাতারাতি দুর্ভোগে পড়েছেন হাজারো যাত্রী।[TECHTARANGA-POST:1429]বুধবার (২০ মে) রাতে হাজীগঞ্জ পৌরসভার বলাখাল বাজার এলাকার একটি স্কুল মাঠে এ ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা ও শ্রমিকরা। হামলার পর আহতদের হাসপাতালে নেওয়া হলে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই বিভিন্ন স্ট্যান্ডে যাত্রীদের ভিড় দেখা গেছে।অন্ধকারে হামলার অভিযোগ, আতঙ্কিত শ্রমিকরাআহত শ্রমিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাতে বাসগুলো স্কুল মাঠে রাখা ছিল। কয়েকজন শ্রমিক বাসের ভেতরে ও আশপাশে অবস্থান করছিলেন। এমন সময় হঠাৎ করেই অন্ধকারের মধ্যে একদল লোক এসে হামলা চালায়। অভিযোগ উঠেছে, হামলাকারীরা শ্রমিকদের বেধড়ক মারধর করার পাশাপাশি একের পর এক বাসে ভাঙচুর চালায়।শ্রমিকদের দাবি, পুরো ঘটনাটি এত দ্রুত ঘটে যে কেউ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেননি। হামলার সময় চিৎকার শুনে আশপাশের মানুষ এগিয়ে এলেও তখন পর্যন্ত বেশ কয়েকটি বাস ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায়।হামলায় আহতদের মধ্যে রয়েছেন মো. হান্নান, আকরাম হোসেন, আমজাদ হোসেন, ইমান হোসেন, নাহিদ, রেজাউল করিম, আবুল হোসেন, হৃদয় হোসেন, মো. সুমন, আকাশ, শাহআলম ও রিদয় হোসেন। তাদের কয়েকজনের শরীরে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন রয়েছে বলে জানা গেছে।হাজীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্র জানিয়েছে, আহত অবস্থায় অন্তত ১২ জন চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের মধ্যে পাঁচজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।কেন বন্ধ হলো পুরো রুট?হামলার ঘটনার পর থেকেই পরিবহন শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বোগদাদ ও আইদি পরিবহনের শ্রমিকরা জানান, তারা এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। বিচার এবং হামলাকারীদের গ্রেপ্তার না হওয়া পর্যন্ত তারা বাস চালাতে রাজি নন।বোগদাদ পরিবহনের সুপারভাইজার ইউসুফ ও শ্রমিক ওমর ফারুকসহ কয়েকজন বলেন, “রাতের মধ্যে এভাবে হামলা হবে, এটা আমরা কল্পনাও করিনি। আজ শ্রমিকদের ওপর হামলা হয়েছে, কাল যাত্রীদের ওপরও হতে পারে।”শ্রমিকদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কুমিল্লা-চাঁদপুর আঞ্চলিক মহাসড়কে বোগদাদ ও আইদি পরিবহনের সব ধরনের বাস অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও দূরপাল্লার যাত্রীরা।[TECHTARANGA-POST:1419]বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ডে যাত্রীদের দীর্ঘ অপেক্ষা করতে দেখা যায়। অনেকে বিকল্প হিসেবে সিএনজি ও ছোট যানবাহনে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে গন্তব্যে যাওয়ার চেষ্টা করেন।স্থানীয়দের মধ্যেও ছড়িয়েছে উদ্বেগবলাখাল বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম বেপারী বলেন, ঘটনাটি খুব অল্প সময়ের মধ্যে ঘটে গেছে। কে বা কারা হামলা চালিয়েছে, সেটি নিশ্চিতভাবে কেউ বলতে পারছেন না। তবে এমন ঘটনা স্থানীয়দের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি করেছে।স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা দাবি করেছেন, এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই পরিবহন সংশ্লিষ্ট নানা দ্বন্দ্ব ও আধিপত্য নিয়ে চাপা উত্তেজনা ছিল। যদিও এই হামলার সঙ্গে কোনো নির্দিষ্ট পক্ষ জড়িত কিনা, সেটি এখনো নিশ্চিত হয়নি।এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ঘটনাটি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকে প্রশ্ন তুলছেন, রাতের মধ্যে এত বড় হামলার পরও কেন আগাম কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না। আবার কেউ কেউ বলছেন, আঞ্চলিক সড়কে পরিবহন খাতে বিরোধ এখন ক্রমেই সহিংস রূপ নিচ্ছে।পুলিশের বক্তব্য কী?হাজীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুল মান্নান জানিয়েছেন, খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং নতুন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।তিনি বলেন, হামলার ঘটনায় তদন্ত চলছে। কারা জড়িত ছিল এবং কী কারণে হামলা হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত কাউকে আটক করা হয়নি বলেও জানান তিনি।পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ঘটনার পেছনে ব্যক্তিগত বিরোধ, পরিবহন ব্যবসার দ্বন্দ্ব নাকি অন্য কোনো কারণ রয়েছে—সব দিক বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।বারবার কেন বাড়ছে পরিবহন খাতে সহিংসতা?দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গত কয়েক বছরে পরিবহন শ্রমিকদের মধ্যে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও হামলার ঘটনা বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবহন খাতে নিয়ন্ত্রণ, আধিপত্য বিস্তার, রুট দখল এবং আর্থিক স্বার্থের দ্বন্দ্ব থেকে অনেক সময় এমন সহিংস পরিস্থিতি তৈরি হয়।মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, দীর্ঘসময় ধরে চাপ, অনিশ্চয়তা এবং প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে কাজ করতে গিয়ে অনেক শ্রমিক মানসিকভাবে অস্থির হয়ে পড়েন। অন্যদিকে আইন প্রয়োগে দুর্বলতা থাকলে ছোট বিরোধও বড় সংঘাতে রূপ নেয়।[TECHTARANGA-POST:1395]সামাজিক বিশ্লেষকদের মতে, শুধু ঘটনার পর ব্যবস্থা নিলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। পরিবহন খাতে নিরাপত্তা, জবাবদিহি এবং বিরোধ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে এমন ঘটনা আবারও ঘটতে পারে।
এদিকে কুমিল্লা-চাঁদপুর রুটে বাস চলাচল কবে স্বাভাবিক হবে, তা নিয়ে এখনো কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। শ্রমিকরা জানিয়েছেন, নিরাপত্তা নিশ্চিত ও হামলাকারীদের বিচারের আশ্বাস না পাওয়া পর্যন্ত তাদের কর্মসূচি চলবে।