দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর
সর্বশেষ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি, সংস্কার বাস্তবায়ন নিয়ে উদ্বেগ ব্রিটিশ প্রতিবেদনে

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সামগ্রিক উন্নতি ও স্থিতিশীলতা এসেছে বলে উল্লেখ করেছে যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (হোম অফিস)। তবে গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রস্তাবিত সংস্কারগুলোর সীমিত বাস্তবায়ন, দুর্নীতি এবং পুলিশের জবাবদিহি ও কার্যকারিতা নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।গত ১৪ অক্টোবর প্রকাশিত ‘রিপোর্ট অব আ ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশন বাংলাদেশ: পলিটিক্যাল সিচুয়েশন, অক্টোবর ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির এই মূল্যায়ন তুলে ধরা হয়।প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান, অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনকাল এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর বিএনপির নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পরিবর্তন এসেছে।ব্রিটিশ হোম অফিসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সাংবাদিক, নাগরিক সমাজের সংগঠন এবং মানবাধিকারকর্মীদের মতে, আগের আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের তুলনায় বর্তমানে তাঁরা বেশি স্বাধীনভাবে কাজ করতে, নিজেদের মত প্রকাশ করতে এবং জনপরিসরে বিতর্কে অংশ নিতে পারছেন।বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও অন্যান্য রাজনৈতিক গোষ্ঠী সভা-সমাবেশ, প্রচার, প্রতিবাদ এবং সরকারের সমালোচনা করতে পারছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।তবে রাজনৈতিক পরিবেশে উন্নতির কথা বলা হলেও সহিংসতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। প্রতিবেদনে উদ্ধৃত বিভিন্ন সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব সহিংসতার বড় অংশ স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ এবং স্থানীয় প্রভাব, ব্যবসায়িক স্বার্থ, সম্পদ ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের সঙ্গে সম্পর্কিত।প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন সূত্রের মূল্যায়নে ২০২৬ সালের নির্বাচন মোটের ওপর শান্তিপূর্ণ ছিল। আগের নির্বাচনগুলোর তুলনায় সহিংসতার ঘটনাও কম হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।নির্বাচনের পর রাজনৈতিক সহিংসতা কমেছে বলেও বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।তবে এসব মূল্যায়নের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক বিরোধ ও সহিংসতার ঘটনা অব্যাহত থাকার বিষয়টিও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। ফলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক সহনশীলতা বজায় রাখার চ্যালেঞ্জও রয়ে গেছে।বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকার বিষয়টিও প্রতিবেদনে আলোচিত হয়েছে।ব্রিটিশ হোম অফিসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষমতায় থাকার সময় দলটির বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এবং ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান ঘিরে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর কারণে দলটি সম্পর্কে জনমনে বিরূপ মনোভাব রয়েছে।প্রতিবেদনে উদ্ধৃত সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, দুর্নীতি, সহিংসতা বা দমন-পীড়নের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না—এমন সাধারণ পর্যায়ের আওয়ামী লীগ সমর্থকেরা সাধারণত নিজেদের এলাকায় থাকতে পারছেন। তবে প্রকাশ্যে দলটির প্রতি সমর্থন জানালে তাঁদের হয়রানি বা সহিংসতার ঝুঁকিতে পড়তে হতে পারে।এ ছাড়া আওয়ামী লীগের কিছু নেতা-কর্মী অন্য রাজনৈতিক দলে যোগ দিয়েছেন, দেশের ভেতরে অন্য এলাকায় চলে গেছেন অথবা দেশ ছেড়েছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া বেশির ভাগ ব্যক্তি মুক্তি পেয়েছেন এবং অনেক মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে।পুলিশের সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা মিথ্যা অভিযোগে করা ২১ হাজারের বেশি মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। পুরোনো মামলাগুলো পর্যালোচনার কাজ এখনো চলছে।তবে সাবেক সরকারের সময় এবং ২০২৪ সালের জুলাইয়ের বিক্ষোভ চলাকালে সংঘটিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগে আওয়ামী লীগের বিপুলসংখ্যক রাজনীতিক, কর্মী ও কর্মকর্তা এখনো ফৌজদারি মামলার মুখোমুখি।এসব মামলার কিছু আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) এবং অন্যগুলো সাধারণ আদালতে বিচারাধীন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি জামিনে মুক্তি পেয়েছেন, অন্যরা বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত আটক রয়েছেন।বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে উন্নতির কথা উল্লেখ করলেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে উদ্বেগের কথা জানিয়েছে ব্রিটিশ হোম অফিস।এর মধ্যে রয়েছে দুর্নীতি, পুলিশের জবাবদিহি ও কার্যকারিতা এবং গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রস্তাবিত ব্যাপক সংস্কারগুলোর সীমিত বাস্তবায়ন।প্রতিবেদনে বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, আইনজীবী, গবেষক, সাংবাদিক, মানবাধিকার সংগঠন ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। এ ছাড়া পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গেও আলোচনা করা হয়।বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের জন্য যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কান্ট্রি পলিসি অ্যান্ড ইনফরমেশন টিমের (সিপিআইটি) তিন কর্মকর্তা গত ৭ থেকে ১৫ জুন ঢাকা সফর করেন।সফরকালে তাঁরা মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিনিধি, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, আইনজীবী, গবেষক ও পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেন। এসব সাক্ষাৎকার ও সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়।প্রতিবেদনটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য ও মূল্যায়ন তুলে ধরেছে। তাই এতে উল্লেখিত তথ্য ও মতামতকে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বক্তব্য হিসেবে বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি, সংস্কার বাস্তবায়ন নিয়ে উদ্বেগ ব্রিটিশ প্রতিবেদনে