ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল নরসিংদীতে শিশুসহ চারজন নিহত
ভয়াবহ ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল নরসিংদীতে শিশুসহ চারজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া আতঙ্কে উঁচু ভবন থেকে দ্রুত নামতে গিয়ে জেলার বিভিন্ন এলাকায় শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিটে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির এ তথ্য জানানো হয়। ভূমিকম্পের পর থেকেই জেলার বিভিন্ন এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ ঘরবাড়ি ও অফিস ফেলে রাস্তায় নেমে আসে।নির্মাণাধীন ভবনের মালামাল পড়ে শিশুর মৃত্যুজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, সদর উপজেলার গাবতলি এলাকায় একটি নির্মাণাধীন ভবনের মালামাল নিচে পড়ে শিশুসহ চারজন আহত হন। পরে তাদের উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক শিশু হাফেজ ওমর (৮)-কে মৃত ঘোষণা করেন।ওমরের বাবা দেলোয়ার হোসেন উজ্জ্বলের অবস্থাও আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে। স্থানীয়রা জানান, ভূমিকম্পের সময় নির্মাণাধীন ভবন থেকে হঠাৎ বিভিন্ন মালামাল নিচে পড়ে গেলে হতাহতের ঘটনা ঘটে।আতঙ্কে দৌড়াতে গিয়ে প্রাণহানিশিবপুর উপজেলার গআজকিতলা পূর্বপাড়া গ্রামের ফোরকান (৪০) ভূমিকম্পের সময় গাছ থেকে পড়ে যান। পরে তাকে ঢাকায় নেওয়ার পথে মৃত্যু হয়।অন্যদিকে, পলাশ উপজেলার ইসলামপাড়া নয়াপাড়া গ্রামের নাসিরউদ্দিন ভূমিকম্পের সময় কৃষিজমিতে কাজ করছিলেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ার পর আতঙ্কে দৌড় দিতে গিয়ে তিনি রাস্তা থেকে নিচে পড়ে যান। এতে গুরুতর আহত হলে পরে তার মৃত্যু হয়।একই উপজেলার মালিতা পশ্চিমপাড়া গ্রামের কাজেম আলী ভূইয়া (৭৫) ভূমিকম্পের সময় নিজের মাটির ঘরের নিচে চাপা পড়েন। পরে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যু হয়।শতাধিক ভবনে ফাটলভূমিকম্পের প্রভাবে নরসিংদীর বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি স্থাপনায় ফাটল দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, সার্কিট হাউসসহ শতাধিক ভবনে ফাটল দেখা গেছে। অনেক বাসিন্দা ভবনে নতুন করে ফাটল দেখা দেওয়ায় আতঙ্কে ঘর ছাড়তে শুরু করেছেন।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প হলেও উৎপত্তিস্থল ভূপৃষ্ঠের খুব কাছাকাছি হওয়ায় নরসিংদীতে এর প্রভাব বেশি অনুভূত হয়েছে।বিদ্যুৎকেন্দ্রে আগুন, বন্ধ ইউরিয়া উৎপাদনভূমিকম্পের পর ঘোড়াশাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সাবস্টেশনে আগুন লাগার ঘটনাও ঘটেছে। পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন।জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, সাবস্টেশনের বিপুল পরিমাণ পিটিও (প্রডাকশন ট্রান্সফরমার) ভূমিকম্পের কারণে ভেঙে পড়ে। এতে বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।এছাড়া ঘোড়াশাল-পলাশ ফার্টিলাইজার কারখানার ইউরিয়া উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কারখানার নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।আতঙ্কে হাসপাতাল ও রাস্তায় ভিড়ভূমিকম্পের পর জেলার হাসপাতালগুলোতে আহতদের ভিড় বাড়তে দেখা গেছে। বেশিরভাগ মানুষই আতঙ্কে দৌড়াতে গিয়ে আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। কেউ সিঁড়ি থেকে পড়ে, কেউ ভিড়ের মধ্যে চাপা পড়ে আহত হয়েছেন।প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মানুষ ভবন থেকে বের হতে হুড়োহুড়ি শুরু করে। বিশেষ করে বহুতল ভবনগুলোতে আতঙ্ক ছিল সবচেয়ে বেশি।খোলা হয়েছে কন্ট্রোল রুমপরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসন একটি কন্ট্রোল রুম খুলেছে। ক্ষয়ক্ষতি ও দুর্যোগসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।প্রশাসনের পক্ষ থেকে জনগণকে গুজব না ছড়ানো এবং আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে সতর্কতার সঙ্গে চলাচলের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।ভূমিকম্পের মাত্রা নিয়ে ভিন্ন তথ্যশুক্রবার সকাল ১০টা ৩৯ মিনিটে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী এই ভূমিকম্প অনুভূত হয়।বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৭ এবং এর উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদী। ভূমিকম্পের গভীরতা ছিল ১০ কিলোমিটার।অন্যদিকে, মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস জানিয়েছে, ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৫।বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ ভূমিকম্প ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে থাকলেও সচেতনতা ও দুর্যোগ প্রস্তুতির অভাব এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। শুক্রবারের এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল, যেকোনো বড় দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতি ও নিরাপদ অবকাঠামো কতটা জরুরি।