দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর
সর্বশেষ

ঈদযাত্রায় রেললাইনে খড় শুকানোয় ট্রেনের চাকা স্লিপ, সকালে বিলম্বিত ৩ ট্রেন: রেলমন্ত্রী

ঈদুল আজহার আগে ঘরমুখো মানুষের চাপ যখন চূড়ায়, ঠিক তখনই সকালে কয়েকটি ট্রেনের হঠাৎ বিলম্বে ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা। পরে জানা যায়, রেললাইনের ওপর ধানের খড় শুকাতে দেওয়ায় একটি ট্রেনের চাকা পিছলে যায়। সেই এক ঘটনার প্রভাব গিয়ে পড়ে আরও কয়েকটি ট্রেনের সূচিতে। রোববার কমলাপুর রেলস্টেশনে আকস্মিক পরিদর্শনে এসে এমন তথ্য জানিয়েছেন সড়ক, রেল ও নৌমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।[TECHTARANGA-POST:1461]মন্ত্রী অবশ্য আশ্বস্ত করে বলেছেন, পুরোনো রেললাইন ও সীমিত লোকোমোটিভ নিয়েও ঈদযাত্রা নিরাপদ রাখতে সর্বোচ্চ সতর্কতা নেওয়া হয়েছে। বড় ধরনের কোনো বিপর্যয়ের আশঙ্কা আপাতত দেখছেন না তারা। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা যে এখনো রেলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ, সেটিও খোলাখুলিভাবে স্বীকার করেছেন তিনি।সকালের সেই বিপত্তি কীভাবে ঘটল?রেলমন্ত্রী জানান, সকালে তিনটি ট্রেন নির্ধারিত সময়ের চেয়ে দেরিতে চলেছে। এর মধ্যে একটি ট্রেনের চাকা স্লিপ করার ঘটনা সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, রেললাইনের ওপর ধানের খড় শুকাতে দেওয়া হয়েছিল। ফলে লাইনের ওপর পিচ্ছিল স্তর তৈরি হয় এবং ট্রেনের চাকা স্বাভাবিকভাবে গ্রিপ নিতে পারেনি।পরিস্থিতি সামাল দিতে দ্রুত সেখানে অতিরিক্ত ইঞ্জিন ও রেলকর্মী পাঠানো হয়। এরপর ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক করা সম্ভব হলেও সময়সূচিতে প্রভাব পড়ে। একটি ট্রেন প্রায় ২০ মিনিট, আরেকটি প্রায় এক ঘণ্টা এবং অন্যটি প্রায় দুই ঘণ্টা বিলম্বিত হতে পারে বলে জানান মন্ত্রী।রেলের কয়েকজন কর্মকর্তা বলছেন, এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রেললাইনের পাশে বসবাসকারী মানুষ অনেক সময় শুকনো জায়গা হিসেবে রেললাইন ব্যবহার করেন। বিশেষ করে ধান কাটার মৌসুমে খড় বা ধান শুকাতে লাইনের ওপর জিনিসপত্র রাখার অভিযোগ প্রায়ই ওঠে। তবে ঈদের মতো ব্যস্ত সময়ে এমন ঘটনা বাড়তি উদ্বেগ তৈরি করেছে।“চাহিদা অনেক, সক্ষমতা সীমিত”কমলাপুর স্টেশনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষের কাছে ট্রেন এখনো সবচেয়ে স্বস্তিদায়ক ও জনপ্রিয় যাতায়াত মাধ্যমগুলোর একটি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যাত্রীদের চাহিদার তুলনায় ট্রেনের সংখ্যা এখনো কম।তার ভাষ্য অনুযায়ী, সাধারণ সময়ে আন্তনগর ট্রেনে প্রতিদিন প্রায় ৩২ হাজার যাত্রী পরিবহন করা হয়। ঈদ উপলক্ষে অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ টিকিট ছাড়ার ফলে বর্তমানে প্রায় ৪০ হাজার যাত্রী পরিবহনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।[TECHTARANGA-POST:1439]তিনি বলেন, লাখ লাখ মানুষ ঈদের সময় বাড়ি যেতে চান। সেই চাপ সামাল দেওয়া রেলের জন্য বড় পরীক্ষা। তারপরও সীমিত সম্পদ নিয়ে সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।মন্ত্রী আরও জানান, ঈদ উপলক্ষে নতুন করে ৫১টি কোচ যুক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে ৮২ থেকে ৮৩টি লোকোমোটিভ সচল রয়েছে। আরও কয়েকটি ইঞ্জিন চালু করা গেলে পরিস্থিতি আরও স্বাভাবিক হবে বলে আশা করছেন তিনি।পুরোনো রেললাইন নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগরেলমন্ত্রীর বক্তব্যের সবচেয়ে আলোচিত অংশ ছিল দেশের পুরোনো রেল অবকাঠামো নিয়ে তার স্বীকারোক্তি। তিনি বলেন, এখনো দেশে ১৯৩০, ১৯৪০ ও ১৯৪৫ সালের রেললাইন ব্যবহার হচ্ছে। বহু পুরোনো লোকোমোটিভ ও কোচ দিয়েই ট্রেন পরিচালনা করতে হচ্ছে।বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, ঈদের মতো অতিরিক্ত চাপের সময়ে এসব পুরোনো অবকাঠামো আরও ঝুঁকির মুখে পড়ে। যদিও মন্ত্রণালয় বলছে, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো আগেই চিহ্নিত করা হয়েছে এবং দুর্ঘটনা এড়াতে বাড়তি নজরদারি রাখা হচ্ছে।রেলপথ বিশ্লেষকদের মতে, শুধু নতুন ট্রেন বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না। একই সঙ্গে লাইন সংস্কার, সিগন্যালিং আধুনিকীকরণ এবং লোকবল বাড়ানোও জরুরি। তা না হলে সাময়িক সমাধান মিললেও দীর্ঘমেয়াদে সংকট থেকেই যাবে।“খড় সরাতে গেলেও ক্ষোভ”রেললাইনের ওপর খড় শুকানোর বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে মন্ত্রী একটি বাস্তব সমস্যার কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, অনেক জায়গায় কিলোমিটারের পর কিলোমিটার এলাকা জুড়ে খড় শুকাতে দেওয়া হয়। এগুলো সরাতে গেলে স্থানীয়দের ক্ষোভের মুখে পড়তে হয়।এ ছাড়া দেশের সব স্টেশন ও রেললাইন পুরোপুরি সুরক্ষিত নয় বলেও স্বীকার করেন তিনি। অনেক এলাকায় অবাধ প্রবেশ বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। ফলে রেল কর্তৃপক্ষকে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেই কাজ করতে হচ্ছে।সামাজিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের ঘটনা শুধু প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়, সচেতনতার ঘাটতিরও প্রতিফলন। বহু মানুষ এখনো রেললাইনকে ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে না দেখে খোলা জায়গা হিসেবে ব্যবহার করেন। এর পেছনে নিরাপত্তা শিক্ষার অভাব, স্থানীয় তদারকির দুর্বলতা এবং দীর্ঘদিনের অভ্যাস—সবই কাজ করছে।[TECHTARANGA-POST:1435]তাদের মতে, দুর্ঘটনা ঘটার পর দায় চাপানোর বদলে স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা কার্যক্রম বাড়ানো জরুরি। বিশেষ করে ঈদের মতো ব্যস্ত সময়ে রেললাইনের নিরাপত্তা নিয়ে আলাদা প্রচারণা প্রয়োজন।আকস্মিক পরিদর্শনে কী দেখলেন মন্ত্রী?রোববার সকালে পূর্বঘোষণা ছাড়াই কমলাপুর স্টেশনে যান মন্ত্রী। তিনি জানান, কোন ট্রেনে উঠবেন বা কখন যাবেন—এমন কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনা আগে ছিল না। স্টেশনে গিয়ে দুটি ট্রেনে ওঠেন এবং যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলেন।তার দাবি, যাত্রীদের সন্তুষ্টি আগের তুলনায় বেড়েছে। পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমও ভালো চলছে। স্টেশনের পরিবেশ ও সেবার মান উন্নত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।অনলাইনে টিকিট বিক্রি নিয়েও ইতিবাচক মন্তব্য করেন মন্ত্রী। তার দাবি, আগে অনলাইনে টিকিট নিয়ে যেসব অভিযোগ উঠত, এবার তা অনেকটাই কমেছে। কোনো সিন্ডিকেট বা বড় ধরনের অনিয়ম হয়নি বলেও উল্লেখ করেন তিনি।ঈদে চালু হচ্ছে বিশেষ ট্রেনঈদযাত্রার চাপ সামাল দিতে আগামীকাল থেকে পাঁচ জোড়া বিশেষ ট্রেন চালু হবে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী। পাশাপাশি কোরবানির পশু পরিবহনের জন্য তিনটি ক্যাটেল ট্রেনও চালানো হচ্ছে। রেল কর্তৃপক্ষ বলছে, অতিরিক্ত যাত্রী চাপের মধ্যেও যাত্রা “স্মুদ” রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে যাত্রীদেরও সতর্ক থাকতে হবে। রেললাইন দখল, অবৈধ পারাপার বা অসচেতন ব্যবহার বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে—এমন সতর্কবার্তাও দেওয়া হয়েছে।

ঈদযাত্রায় রেললাইনে খড় শুকানোয় ট্রেনের চাকা স্লিপ, সকালে বিলম্বিত ৩ ট্রেন: রেলমন্ত্রী