অধিকার আদায়ে সাংবাদিকদের রাজপথে নামার ডাক ৭ মে প্রেস ক্লাব ঘিরে বড় সমাবেশের প্রস্তুতি
রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে গণমাধ্যমকে দেখা হয় বহুদিন ধরেই। আর এই খাতের মূল চালিকাশক্তি হচ্ছেন সাংবাদিকরা, যারা প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে তথ্য তুলে ধরেন মানুষের সামনে। তবে বাস্তবতা হলো, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কলম ধরলেও নিজেদের অধিকার ও পেশাগত নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা সংকটের মুখোমুখি হচ্ছেন দেশের সংবাদকর্মীরা। এই প্রেক্ষাপটে আগামী ৭ মে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সাংবাদিকদের একটি বড় দাবি সমাবেশ আয়োজনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি নয়; বরং সাংবাদিকদের পেশাগত মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং ন্যায্য অধিকার আদায়ের একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টা। সকাল ১১টায় শুরু হতে যাওয়া এই সমাবেশকে ঘিরে ইতোমধ্যে বিভিন্ন জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের সংবাদকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।গণমাধ্যম সপ্তাহ ঘিরে ভিন্ন ধরনের আয়োজনপ্রতি বছর বিভিন্ন আয়োজনের মধ্য দিয়ে জাতীয় গণমাধ্যম সপ্তাহ পালন করা হলেও এবারের আয়োজনকে ভিন্নভাবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। আগামী ১ মে থেকে ৭ মে পর্যন্ত পালিত হতে যাওয়া ‘১০ম জাতীয় গণমাধ্যম সপ্তাহ’কে শুধুমাত্র উৎসব বা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চাইছেন না সাংবাদিক নেতারা।তাদের দাবি, দেশের গণমাধ্যম খাত বর্তমানে নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অনেক সাংবাদিক কম বেতনে কাজ করছেন, কেউ কেউ মাসের পর মাস বেতন পাচ্ছেন না বলেও অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলা, হুমকি ও হয়রানির ঘটনাও বাড়ছে বলে দাবি উঠেছে। এসব বাস্তবতা সামনে রেখেই এবারের সপ্তাহকে অধিকারের আন্দোলনের প্রতীক হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা চলছে।আয়োজকদের একজন বলেন, “শুধু অনুষ্ঠান করে বা শুভেচ্ছা বিনিময় করে সাংবাদিকদের বাস্তব সমস্যার সমাধান হবে না। এখন প্রয়োজন ঐক্যবদ্ধভাবে দাবি তুলে ধরা।”১৪ দফা দাবিকে কেন্দ্র করে বাড়ছে আলোচনাএই সমাবেশের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সাংবাদিকদের ঘোষিত ১৪ দফা দাবি। বিভিন্ন গণমাধ্যমকর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা নানা অসন্তোষ থেকেই এসব দাবি সামনে এসেছে।দাবিগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সাংবাদিকদের অভিযোগ, মাঠে কাজ করতে গিয়ে প্রায়ই হামলা ও মামলার শিকার হতে হয়, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই সেসব ঘটনার সুষ্ঠু বিচার হয় না। এছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে কাজ করা সংবাদকর্মীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।এছাড়া বেতন বৈষম্য দূর করা, ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়ন, চাকরির স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা এবং বিনা নোটিশে ছাঁটাই বন্ধের দাবিও জোরালোভাবে সামনে এসেছে। অনেক সংবাদকর্মী দাবি করছেন, কিছু প্রতিষ্ঠানে মাসের পর মাস বেতন বকেয়া থাকলেও কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায় না।একজন সিনিয়র সাংবাদিক বলেন, “সংবাদকর্মীরা সমাজের নানা অন্যায় তুলে ধরেন, কিন্তু নিজেদের সমস্যাগুলো অনেক সময় চাপা পড়ে যায়। এবারের সমাবেশ সেই নীরবতার জায়গা ভাঙতে পারে।”প্রেস ক্লাব ঘিরে প্রস্তুতি, বিভিন্ন জেলা থেকে অংশগ্রহণের আহ্বানআগামী ৭ মে সকাল ১১টায় জাতীয় প্রেস ক্লাব প্রাঙ্গণে এই দাবি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সাংবাদিকদের অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ইতোমধ্যে কর্মসূচিটি নিয়ে প্রচারণা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে পোস্টার ও আহ্বানপত্র ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। সেখানে বলা হয়েছে, অধিকারের প্রশ্নে বিভক্তি নয়, বরং ঐক্যই হতে পারে সবচেয়ে বড় শক্তি।আয়োজকদের পাঠানো বার্তায় উল্লেখ করা হয়েছে, “নিজের অধিকার আদায়ে সবাইকে একসঙ্গে দাঁড়াতে হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ গড়ে তুলতে এই সমাবেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।”‘ঐক্য চাই’ স্লোগানে জোরসমাবেশের জন্য নির্ধারিত স্লোগান— “সাংবাদিক মোরা ভাই-ভাই, বিভেদ নয় ঐক্য চাই”— ইতোমধ্যে আলোচনায় এসেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গণমাধ্যম জগতে বিভিন্ন সংগঠন, মতপার্থক্য ও প্রতিষ্ঠানগত বিভাজন থাকলেও পেশাগত অধিকারের জায়গায় সবাইকে এক প্ল্যাটফর্মে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।বিশ্লেষকদের মতে, সাংবাদিক সমাজে ঐক্যের অভাব দীর্ঘদিনের একটি বাস্তবতা। ফলে যৌথ দাবি আদায়ের ক্ষেত্রেও অনেক সময় দুর্বলতা তৈরি হয়। এবারের কর্মসূচি সেই জায়গা থেকে নতুন বার্তা দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।একজন গণমাধ্যম গবেষক মনে করেন, “সাংবাদিকদের পেশাগত সুরক্ষা নিশ্চিত না হলে স্বাধীন সাংবাদিকতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই এই ধরনের কর্মসূচিকে শুধুমাত্র একটি সংগঠনের বিষয় হিসেবে দেখলে হবে না; এটি গণতন্ত্র ও তথ্যপ্রবাহের সঙ্গেও জড়িত।”সামাজিক বাস্তবতায় সাংবাদিকদের চ্যালেঞ্জবর্তমান সময়ে ডিজিটাল মাধ্যমের বিস্তার যেমন সংবাদ প্রকাশের গতি বাড়িয়েছে, তেমনি সাংবাদিকদের ওপর চাপও বাড়িয়েছে। দ্রুত সংবাদ প্রকাশের প্রতিযোগিতা, অনলাইন হয়রানি, অনিশ্চিত চাকরি এবং কম বেতনের মতো বিষয়গুলো এখন অনেক সংবাদকর্মীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সাংবাদিকদের অনেকে সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে কাজ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে পেশাগত পরিচয় ব্যবহার করে অপসাংবাদিকতার অভিযোগও উঠছে, যা পুরো পেশাটির ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলে মনে করেন অভিজ্ঞরা।এমন বাস্তবতায় সাংবাদিকদের মধ্যে পেশাগত মান উন্নয়ন, নীতিগত অবস্থান শক্ত করা এবং অধিকার রক্ষায় সম্মিলিত উদ্যোগ জরুরি হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।এখন নজর ৭ মের সমাবেশেসব মিলিয়ে আগামী ৭ মে’র কর্মসূচিকে ঘিরে সাংবাদিক মহলে বাড়ছে আগ্রহ। আয়োজকরা আশা করছেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিপুলসংখ্যক সংবাদকর্মী অংশ নেবেন এই সমাবেশে।তবে দাবি বাস্তবায়নের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট মহলের অনেকে মনে করছেন, সমাবেশের পর আলোচনার মাধ্যমে বিষয়গুলো সামনে এগোতে পারে।
অন্যদিকে অংশগ্রহণকারীদের মতে, এটি কেবল একটি দিনের কর্মসূচি নয়; বরং সাংবাদিকদের পেশাগত ভবিষ্যৎ, নিরাপত্তা এবং মর্যাদা রক্ষার দীর্ঘ আন্দোলনের অংশ।