গাজীপুরের কামতা গ্যাসক্ষেত্র থেকে আগামী জুনে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে ৫৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস: প্রতিমন্ত্রী
আগামী জুনের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে ৫৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস, আশা দেখাচ্ছে নতুন চার কূপদেশজুড়ে গ্যাস সংকটে যখন শিল্পকারখানা থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ উৎপাদন পর্যন্ত নানা খাতে চাপ বাড়ছে, ঠিক তখনই নতুন আশার কথা শুনাল সরকার। আগামী বছরের জুনের মধ্যেই জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত ৫৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম। সরকারের দাবি, নতুন চারটি কূপ খননের কাজ শেষ হলে শিল্প খাতে স্থবিরতা কিছুটা কাটবে, কমবে আমদানিনির্ভরতার চাপও।[TECHTARANGA-POST:1427]বুধবার দুপুরে গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার কামতা গ্যাস ফিল্ডে মূল্যায়ন ও উন্নয়ন কূপ খনন কার্যক্রমের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য ঘিরে স্থানীয় বাসিন্দা ও শিল্পমালিকদের মধ্যেও নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।‘বসে থাকা কারখানাগুলো চালু করা যাবে’অনিন্দ্য ইসলাম বলেন, বর্তমানে দেশের অনেক শিল্পকারখানা গ্যাসের স্বল্পতার কারণে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারছে না। কোথাও কোথাও উৎপাদন আংশিক বন্ধও রয়েছে। নতুন চার কূপ থেকে গ্যাস উত্তোলন শুরু হলে সেই সংকট কিছুটা কমানো সম্ভব হবে বলে আশা করছেন তিনি।তার ভাষায়, “আগামী বছরের জুনের মধ্যে ৫৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ করা গেলে যেসব কারখানা গ্যাসের অভাবে বসে আছে, সেগুলোকে সরবরাহ দেওয়া যাবে। এতে উৎপাদন বাড়বে, নতুন কর্মসংস্থানও তৈরি হবে।”প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, গ্যাস আমদানিতে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে। দেশীয় উৎস থেকে উৎপাদন বাড়াতে পারলে সেই চাপও কমবে। সরকার ধীরে ধীরে জ্বালানি খাতে বিদেশ নির্ভরতা কমিয়ে স্বনির্ভর হওয়ার পরিকল্পনা নিয়েই এগোচ্ছে বলে জানান তিনি।কামতা গ্যাসক্ষেত্র ঘিরে নতুন সম্ভাবনাগাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার কামতা গ্যাসক্ষেত্র দেশের পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর একটি। ১৯৮৪ সালে এখানকার কামতা-১ কূপে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস উত্তোলন শুরু হয়। ১৯৯১ সাল পর্যন্ত এখান থেকে প্রায় ২১ দশমিক ১০ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হয়েছিল।সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এ গ্যাসক্ষেত্রে মোট উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুত প্রায় ৬৬ দশমিক ০৪ বিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে এখনো প্রায় ৪৪ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস অবশিষ্ট রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করছেন, পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে অনুসন্ধান বাড়ানো গেলে দেশীয় উৎপাদন কিছুটা বাড়তে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে নতুন বড় গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার ছাড়া সংকট পুরোপুরি কাটবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।গ্যাস আমদানিতে সীমাবদ্ধতার কথাও জানালেন প্রতিমন্ত্রীঅনুষ্ঠানে গ্যাস আমদানি নিয়েও কথা বলেন অনিন্দ্য ইসলাম। তিনি স্বীকার করেন, সরকার চাইলেই যে অতিরিক্ত গ্যাস আমদানি করতে পারবে, বাস্তবে সেটি এত সহজ নয়।প্রতিমন্ত্রীর ভাষায়, বর্তমানে যে অবকাঠামো রয়েছে, তার সক্ষমতা সীমিত। ফলে অতিরিক্ত গ্যাস আমদানির সুযোগও কম। অর্থাৎ শুধু বিদেশ থেকে এলএনজি কিনে সংকট সামাল দেওয়ার পথেও বাস্তব কিছু বাধা রয়েছে।[TECHTARANGA-POST:1401]বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশে শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের চাহিদা যেভাবে বেড়েছে, সেই তুলনায় অবকাঠামো উন্নয়ন ও অনুসন্ধান কার্যক্রম অনেক বছর ধরেই পিছিয়ে ছিল। ফলে এখন চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে।আবাসিকে গ্যাস সংযোগ নিয়ে স্পষ্ট বার্তাআবাসিক গ্রাহকদের নতুন গ্যাস সংযোগ দেওয়া হবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, সরকারের বর্তমান অগ্রাধিকার তালিকায় শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতই সবার আগে।তিনি বলেন, “আমাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে শিল্পকারখানা এবং পাওয়ার প্ল্যান্টে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা। এরপর আবাসিক গ্রাহকদের বিষয়টি বিবেচনায় আসবে।”সরকারের এই অবস্থান নতুন কিছু নয়। গত কয়েক বছর ধরেই আবাসিক গ্যাস সংযোগ কার্যত সীমিত রাখা হয়েছে। এর বদলে এলপিজি ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। তবে শহরাঞ্চলের অনেক মধ্যবিত্ত পরিবার এখনও পাইপলাইনের গ্যাস সংযোগের অপেক্ষায় রয়েছে।দাম বাড়বে নাকি কমবে?দেশে জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগও কম নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লেই তার প্রভাব পড়ছে দেশের বাজারে। এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এখনই দাম বাড়বে না কমবে, তা নিশ্চিত করে বলার মতো পরিস্থিতি নেই।তিনি জানান, বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতি বিবেচনা করেই সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম, ডলারের বিনিময় হার এবং জ্বালানি আমদানির ব্যয়—সবকিছুই এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি খাতের অস্থিরতা সরাসরি প্রভাব ফেলে শিল্প উৎপাদন, পরিবহন ব্যয় এবং নিত্যপণ্যের দামের ওপর। ফলে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর এই উদ্যোগ সফল হলে সামগ্রিক অর্থনীতিতেও কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।কেন বারবার তৈরি হচ্ছে গ্যাস সংকট?বাংলাদেশে গ্যাস সংকট নতুন নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে গতি কম থাকা, পুরোনো ক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমে যাওয়া এবং শিল্পায়নের কারণে চাহিদা দ্রুত বাড়ার ফলেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।[TECHTARANGA-POST:1375]একদিকে নতুন নতুন শিল্পকারখানা গড়ে উঠছে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও গ্যাসের ওপর নির্ভরতা রয়ে গেছে। ফলে চাহিদা বাড়লেও সরবরাহ সেই হারে বাড়েনি।এ ছাড়া জ্বালানি খাতে পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে সরকার যে নতুন করে দেশীয় গ্যাস উৎপাদনে জোর দিচ্ছে, সেটিকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন অনেকে। যদিও এই উদ্যোগ বাস্তবে কত দ্রুত সুফল দেবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।