বিশ্বে বছরে জনপ্রতি ১৩২ কেজি খাবার নষ্ট, শীর্ষে মালদ্বীপ
বিশ্বজুড়ে প্রতি পাঁচ প্লেট খাবারের প্রায় এক প্লেট শেষ পর্যন্ত ফেলে দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে বছরে নষ্ট হয় ১০০ কোটি টনের বেশি খাবার। অথচ জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বের প্রায় ৬৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ ক্ষুধার্ত ছিল। অর্থাৎ, প্রতি ১৩ জনে একজন পর্যাপ্ত খাবার পায়নি।বিশ্বে ক্ষুধার্ত মানুষের হার টানা তৃতীয় বছরের মতো কমলেও তা এখনো করোনাভাইরাস মহামারির আগের সময়ের তুলনায় বেশি। অন্যদিকে উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ খাবার ফসল কাটার পর থেকে শুরু করে বাসাবাড়ি, রেস্তোরাঁ ও দোকানপাটে পৌঁছানোর পরও নষ্ট হচ্ছে। মাথাপিছু খাবার অপচয়ের হিসাবে বিশ্বের শীর্ষে রয়েছে মালদ্বীপ।জাতিসংঘের ‘স্টেট অব ফুড সিকিউরিটি অ্যান্ড নিউট্রিশন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’ শীর্ষক বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বের ৭ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ ক্ষুধার মুখে ছিল। ২০২৪ সালে এ হার ছিল ৮ দশমিক ১ শতাংশ এবং ২০২২ সালে তা বেড়ে সর্বোচ্চ ৮ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছিল।তবে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও ২০১৯ সালের তুলনায় এখনো বিশ্বে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৬ কোটি ১০ লাখ বেশি। অর্থাৎ, ক্ষুধা কমানোর অগ্রগতি থাকলেও সংকট এখনো কাটেনি।বিশ্বের অন্য যেকোনো অঞ্চলের তুলনায় আফ্রিকায় ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা বেশি। ২০২৫ সালে মহাদেশটির প্রায় ৩০ কোটি ৯০ লাখ মানুষ অপুষ্টিতে ভুগেছে, যা আফ্রিকার মোট জনসংখ্যার প্রায় প্রতি পাঁচজনে একজন। বিশ্বে মোট ক্ষুধার্ত মানুষের প্রায় অর্ধেকই আফ্রিকার বাসিন্দা।এশিয়ায় অপুষ্টিতে ভুগেছে প্রায় ২৯ কোটি ২০ লাখ মানুষ, যা এ অঞ্চলের মোট জনসংখ্যার ৬ শতাংশ। অন্যদিকে লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে এ সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ, যা জনসংখ্যার ৪ দশমিক ৮ শতাংশ।২০২৬ সালের বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচকেও বিভিন্ন দেশের খাদ্যনিরাপত্তা পরিস্থিতির পার্থক্য উঠে এসেছে। অপুষ্টি, বয়সের তুলনায় শিশুদের উচ্চতা কম হওয়া (স্টান্টিং), উচ্চতার তুলনায় ওজন কম হওয়া (ওয়েস্টিং) এবং শিশুমৃত্যুর হার বিবেচনায় ১০০ স্কোরের ভিত্তিতে দেশগুলোর পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা হয়।সূচক অনুযায়ী, আটটি দেশে ক্ষুধার পরিস্থিতি ‘উদ্বেগজনক’ পর্যায়ে রয়েছে। এর মধ্যে সাতটি দেশ আফ্রিকায়। ১২২টি দেশের তালিকায় সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে রয়েছে সোমালিয়া। এরপর রয়েছে ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো, চাদ ও মাদাগাস্কার।সুদান, দক্ষিণ সুদান, বুরুন্ডি ও ইয়েমেনের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সংঘাত ও পর্যাপ্ত তথ্যের অভাবে এসব দেশের সুনির্দিষ্ট স্কোর নির্ধারণ করা যায়নি।একদিকে কোটি কোটি মানুষ পর্যাপ্ত খাবার পাচ্ছে না, অন্যদিকে উৎপাদিত খাবারের বড় অংশ মানুষের কাছে পৌঁছানোর আগেই নষ্ট হচ্ছে।জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) জানিয়েছে, উৎপাদিত খাবারের প্রায় ১৩ শতাংশ ফসল কাটার পর থেকে খুচরা বিক্রির পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই নষ্ট হয়। গুদামজাতকরণ, পরিবহন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় এ ক্ষতি ঘটে। ফলমূল ও শাকসবজির ক্ষেত্রে ক্ষতির পরিমাণ তুলনামূলক বেশি।ফসল কাটার পর থেকে দোকানে পৌঁছানোর আগেই নষ্ট হওয়া এসব খাবারের বার্ষিক বাজারমূল্য ৪০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি।জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) হিসাব অনুযায়ী, ২০২২ সালে দোকানপাট, রেস্তোরাঁ ও বাসাবাড়িতে ভোক্তাদের জন্য বরাদ্দ করা প্রায় ১০৫ কোটি টন খাবার নষ্ট হয়েছে। অর্থাৎ, ভোক্তা পর্যায়ে খাবারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ফেলে দেওয়া হয়েছে।২০ টন ধারণক্ষমতার ট্রাকে এসব খাবার পরিবহন করতে হলে প্রয়োজন হবে প্রায় ৫ কোটি ২৫ লাখ ট্রাক।খাতভিত্তিক হিসাবে, খাবার অপচয়ের সবচেয়ে বড় অংশ ঘটে বাসাবাড়িতে।বাসাবাড়ি: মোট অপচয়ের ৬০ শতাংশ।রেস্তোরাঁ ও খাদ্যসেবা প্রতিষ্ঠান: ২৮ শতাংশ।দোকানপাট: ১২ শতাংশ।এই পরিসংখ্যান বলছে, খাবার অপচয় কমাতে শুধু উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়ন যথেষ্ট নয়; ভোক্তাদের অভ্যাসেও পরিবর্তন প্রয়োজন।ইউএনইপির তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে গড়ে প্রত্যেক মানুষ বছরে প্রায় ১৩২ কেজি খাবার নষ্ট করে। এর মধ্যে বাসাবাড়িতে অপচয় হয় জনপ্রতি প্রায় ৭৯ কেজি।তবে দেশভেদে খাবার অপচয়ের পরিমাণে বড় পার্থক্য রয়েছে। মাথাপিছু বছরে প্রায় ২৬০ কেজি খাবার নষ্ট করে তালিকার শীর্ষে রয়েছে মালদ্বীপ। এই পরিমাণ বৈশ্বিক গড়ের প্রায় দ্বিগুণ।এরপর রয়েছে সিরিয়া, ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্র, সিশেলস, মেক্সিকো ও তিউনিসিয়া। এসব দেশে মাথাপিছু বছরে ২১০ কেজির বেশি খাবার নষ্ট হয়। বিপরীতে, খাবার অপচয় কম এমন দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে স্পেন, যেখানে মাথাপিছু বছরে প্রায় ৩৯ কেজি বা তারও কম খাবার নষ্ট হয়।ইউএনইপির বিশ্লেষণে উষ্ণ আবহাওয়ার দেশগুলোতে বাসাবাড়িতে খাবার অপচয়ের প্রবণতা বেশি হওয়ার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে তাজা কৃষিপণ্যের বেশি ব্যবহার এবং রেফ্রিজারেটর বা হিমায়ন সুবিধার সীমাবদ্ধতার কথা বলা হয়েছে।খাবার নষ্ট হওয়ার প্রভাব শুধু খাদ্য সরবরাহের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, খাদ্য অপচয়ের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে বছরে এক ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি ক্ষতি হয়।খাবার ফেলে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা উৎপাদনে ব্যবহৃত অর্থ, জমি, পানি, জ্বালানি ও শ্রমও অপচয় হয়। ফলে খাবার অপচয় কমানো গেলে একদিকে অর্থনৈতিক ক্ষতি কমবে, অন্যদিকে প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহারও আরও কার্যকর করা সম্ভব হবে।বিশ্বে প্রায় ১৪০ কোটি হেক্টর বা ৩৫০ কোটি একর জমিতে এমন খাবার উৎপাদন করা হয়, যা শেষ পর্যন্ত কেউ খায় না। এ জমির পরিমাণ বিশ্বের মোট কৃষিজমির প্রায় ২৮ শতাংশ—পুরো কানাডার আয়তনের চেয়েও বেশি।খাবার অপচয় জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। বিশ্বে মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের প্রায় ৮ থেকে ১০ শতাংশের জন্য দায়ী নষ্ট ও অপচয় হওয়া খাবার। এর মধ্যে ভাগাড়ে পচতে থাকা খাবার থেকে নির্গত মিথেন গ্যাসও রয়েছে।অর্থাৎ খাবার উৎপাদনের জন্য জমি, পানি ও জ্বালানি ব্যবহার করার পর সেই খাবার ফেলে দেওয়া হলে সম্পদের অপচয়ের পাশাপাশি পরিবেশের ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হয়।