দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর
সর্বশেষ

চার বিশ্বকাপের বিরল কীর্তিতে নেইমার, পেলে-রোনালদোদের অভিজাত তালিকায় নতুন নাম

ব্রাজিল দলে জায়গা পাওয়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ছিল আলোচনা, সমালোচনা আর অনিশ্চয়তা। বিশেষ করে নতুন কোচ কার্লো আনচেলত্তির অধীনে শুরুতে সুযোগ না পাওয়ায় অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, ২০২৬ বিশ্বকাপে হয়তো আর দেখা যাবে না নেইমারকে। তবে সব জল্পনা উড়িয়ে শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপের চূড়ান্ত দলে জায়গা পেয়েছেন এই ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড। আর তাতেই ইতিহাসের বিশেষ এক তালিকায় নাম উঠেছে তাঁর।২০২৬ বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে ব্রাজিলের হয়ে চারটি বিশ্বকাপ খেলা ফুটবলারদের অভিজাত ক্লাবে প্রবেশ করলেন নেইমার। এর আগে পেলে, কাফু ও রোনালদোর মতো কিংবদন্তিদের সঙ্গে মাত্র সাতজন ব্রাজিলিয়ান এই কীর্তি গড়েছিলেন। নেইমার হলেন সেই তালিকার অষ্টম সদস্য।অনিশ্চয়তা কাটিয়ে বিশ্বকাপ মঞ্চে ফেরাগত কয়েক বছর চোট, ফিটনেস সমস্যা ও জাতীয় দলে অনিয়মিত পারফরম্যান্সের কারণে নেইমারের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। ইউরোপ ছেড়ে সৌদি আরবে যাওয়ার পরও সমালোচনা থামেনি। অনেকের ধারণা ছিল, নতুন প্রজন্মকে জায়গা দিতে অভিজ্ঞ এই তারকাকে হয়তো আর গুরুত্ব দেবে না ব্রাজিল।[TECHTARANGA-POST:1382]বিশেষ করে ইতালিয়ান কোচ কার্লো আনচেলত্তি দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম কয়েকটি ম্যাচে নেইমারকে স্কোয়াডে না রাখায় আলোচনা আরও জোরালো হয়। তবে অভিজ্ঞতা, বড় ম্যাচে পারফরম্যান্স এবং দলের ভেতরে তাঁর প্রভাব বিবেচনায় শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ দলে জায়গা পেয়েছেন তিনি।এর মাধ্যমে ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ এবং ২০২৬— টানা চারটি বিশ্বকাপে খেলতে যাচ্ছেন নেইমার। ব্রাজিল ফুটবলের ইতিহাসে এটি নিঃসন্দেহে বড় এক মাইলফলক।পেলের পথ ধরে নতুন অধ্যায়চার বিশ্বকাপ খেলা ব্রাজিলিয়ানদের তালিকায় সবচেয়ে আলোচিত নাম নিঃসন্দেহে পেলে। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই তারকা ১৯৫৮ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে বিশ্বকাপে অভিষেক করেন। সুইডেনের বিপক্ষে ফাইনালে জোড়া গোল করে বিশ্বকে চমকে দিয়েছিলেন তিনি।১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৬৬ ও ১৯৭০— চারটি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া পেলে ব্রাজিলকে এনে দেন তিনটি বিশ্বকাপ শিরোপা। বিশেষ করে ১৯৭০ সালের ফাইনালে ইতালির বিপক্ষে তাঁর গোল এখনও বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত হিসেবে ধরা হয়।নেইমারের সঙ্গে পেলের তুলনা সবসময়ই এসেছে। গোলসংখ্যার দিক থেকে ইতোমধ্যে জাতীয় দলের ইতিহাসে পেলের রেকর্ড স্পর্শ বা ছাড়িয়ে যাওয়ার দাবি উঠেছে বিভিন্ন পরিসংখ্যানে। তবে বিশ্বকাপ জয়ের দিক থেকে এখনও অনেকটাই পিছিয়ে আছেন বর্তমান প্রজন্মের এই তারকা।ব্রাজিলের কিংবদন্তিদের সেই বিশেষ তালিকানেইমারের আগে চারটি বিশ্বকাপে খেলা ব্রাজিলিয়ানদের মধ্যে ছিলেন কয়েকজন ঐতিহাসিক ফুটবলার। তাদের প্রত্যেকের ক্যারিয়ারই ছিল আলাদা বৈশিষ্ট্যে ভরা।দালমা সান্তোস ছিলেন ব্রাজিলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য রাইটব্যাক। ১৯৫৪ থেকে ১৯৬৬ পর্যন্ত চারটি বিশ্বকাপে খেলেছেন তিনি। পুরো ক্যারিয়ারে কখনও লাল কার্ড না দেখার রেকর্ড আজও বিস্ময় জাগায় ফুটবল বিশ্বে।গোলরক্ষক কাস্তিলহো ছিলেন ফ্লুমিনেন্সের ইতিহাসের অন্যতম বড় নাম। চারটি বিশ্বকাপ দলে ডাক পেলেও বেশিরভাগ সময় ব্যাকআপ হিসেবেই ছিলেন তিনি। তবুও দীর্ঘ সময় জাতীয় দলের সঙ্গে থাকা তাঁর ধারাবাহিকতার বড় প্রমাণ।নিলতন সান্তোসকে এখনও অনেকেই সর্বকালের অন্যতম সেরা লেফটব্যাক মনে করেন। ১৯৫০ থেকে ১৯৬২ পর্যন্ত চারটি বিশ্বকাপে খেলে ব্রাজিলের রক্ষণভাগকে শক্তিশালী করেছিলেন তিনি।[TECHTARANGA-POST:1380]আরেক কিংবদন্তি গোলরক্ষক এমারসন লেয়াও ১৯৭০, ১৯৭৪, ১৯৭৮ ও ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের স্কোয়াডে ছিলেন। ১৯৭০ সালে বিশ্বকাপজয়ী দলে তরুণ সদস্য হিসেবে থাকলেও পরবর্তী দুই আসরে তিনি ছিলেন মূল গোলরক্ষক।কাফু ও রোনালদো: আধুনিক যুগের দুই প্রতীকচারটি বিশ্বকাপ খেলাদের মধ্যে আধুনিক ফুটবলে সবচেয়ে বেশি আলোচিত নামগুলোর একটি কাফু। তিনি শুধু চারটি বিশ্বকাপ খেলেননি, টানা তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলার বিরল কীর্তিও গড়েছেন। ১৯৯৪, ১৯৯৮ ও ২০০২— তিনটি ফাইনালেই ছিলেন ব্রাজিলের হয়ে।২০০২ সালে অধিনায়ক হিসেবে বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দও পেয়েছিলেন কাফু। অনেকের মতে, নেতৃত্ব, ধারাবাহিকতা ও ফিটনেস— এই তিন দিক থেকে তিনি ব্রাজিল ফুটবলের অন্যতম সফল অধিনায়ক।অন্যদিকে রোনালদো ছিলেন গোলের মেশিন। ১৯৯৪ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত চারটি বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন ব্রাজিলের আক্রমণভাগের সবচেয়ে ভয়ংকর নামগুলোর একটি। ২০০২ বিশ্বকাপে তাঁর ৮ গোল ব্রাজিলকে এনে দেয় পঞ্চম বিশ্বকাপ শিরোপা।একসময় বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ ১৫ গোলের রেকর্ডও ছিল রোনালদোর দখলে। পরে সেই রেকর্ড ভাঙেন জার্মান তারকা মিরোস্লাভ ক্লোসা।নেইমারের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জচারটি বিশ্বকাপ খেলার কীর্তি অর্জন করলেও নেইমারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— তিনি কি ব্রাজিলকে আবারও বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করতে পারবেন?২০১৪ সালে ঘরের মাঠে ইনজুরি, ২০১৮ সালে হতাশা এবং ২০২২ সালে নাটকীয় বিদায়ের স্মৃতি এখনও তাড়া করে ফেরে ব্রাজিল সমর্থকদের। ফলে ২০২৬ বিশ্বকাপকে অনেকে নেইমারের শেষ সুযোগ হিসেবেও দেখছেন।বিশ্লেষকদের মতে, ব্যক্তিগত অর্জনের দিক থেকে নেইমার ইতোমধ্যে ব্রাজিলের সেরাদের কাতারে জায়গা করে নিয়েছেন। তবে বিশ্বকাপ জয়ের ট্রফি ছাড়া তাঁর ক্যারিয়ার নিয়ে বিতর্ক পুরোপুরি থামবে না।ব্রাজিল ফুটবলে অভিজ্ঞতা বনাম নতুন প্রজন্মনেইমারকে দলে রাখা নিয়ে ব্রাজিলের ফুটবল অঙ্গনে ভিন্নমতও রয়েছে। একদল মনে করছে, বড় মঞ্চে তাঁর অভিজ্ঞতা এখনও দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে কেউ কেউ বলছেন, নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়দের জায়গা করে দিতে এখন পরিবর্তনের সময়।তবে বিশ্বকাপের মতো আসরে অভিজ্ঞ ফুটবলারের গুরুত্ব সবসময়ই আলাদা। চাপের ম্যাচ, নকআউট পর্বের মানসিক লড়াই এবং নেতৃত্ব— এসব জায়গায় নেইমারের উপস্থিতি ব্রাজিলের জন্য বাড়তি সুবিধা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।[TECHTARANGA-POST:1335]শেষ কথাচারটি বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ পাওয়া যেকোনো ফুটবলারের জন্যই বড় অর্জন। কারণ দীর্ঘ সময় ধরে ফর্ম, ফিটনেস ও জাতীয় দলে জায়গা ধরে রাখা সহজ নয়। সেই কঠিন পথ পেরিয়েই এবার ব্রাজিলের কিংবদন্তিদের পাশে নাম লিখিয়েছেন নেইমার। এখন দেখার বিষয়, ইতিহাসের এই বিশেষ ক্লাবে নাম লেখানোর পর মাঠের পারফরম্যান্স দিয়ে কতটা আলো ছড়াতে পারেন তিনি। কারণ ব্রাজিল সমর্থকদের চোখে শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় মাপকাঠি একটাই— বিশ্বকাপ ট্রফি।

চার বিশ্বকাপের বিরল কীর্তিতে নেইমার, পেলে-রোনালদোদের অভিজাত তালিকায় নতুন নাম