জুলাইয়ের গ্রাফিতি ঘিরে চট্টগ্রামে উত্তেজনা, মুখোমুখি বিএনপি ও এনসিপি নেতাকর্মী
চট্টগ্রাম নগরীতে জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি বহনকারী গ্রাফিতি মুছে ফেলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। রোববার রাতে টাইগারপাস এলাকায় জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-র নেতাকর্মীরা পাল্টাপাল্টি অবস্থান নিলে পরিস্থিতি কিছু সময়ের জন্য অস্থির হয়ে ওঠে। ঘটনাকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে তর্ক-বিতর্ক।স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, নগরীর কয়েকটি দেয়ালে আঁকা জুলাই আন্দোলন সংশ্লিষ্ট গ্রাফিতি সম্প্রতি মুছে ফেলা হয়েছে—এমন অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এনসিপির নেতাকর্মীরা দাবি করেন, আন্দোলনের স্মৃতি মুছে ফেলার উদ্দেশ্যেই এসব গ্রাফিতি সরানো হয়েছে। অন্যদিকে বিএনপির স্থানীয় নেতারা বলছেন, তাদের দল বা নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সঠিক নয়।[TECHTARANGA-POST:1355]রাতে বাড়ে উত্তেজনারোববার (১৭ মে) রাতের দিকে টাইগারপাস এলাকায় দুই পক্ষের নেতাকর্মীরা জড়ো হতে শুরু করেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শুরুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট ও পাল্টা পোস্টকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরি হলেও পরে তা মাঠের অবস্থানে গড়ায়। একপর্যায়ে উভয় পক্ষের নেতাকর্মীরা স্লোগান দিতে থাকেন।এ সময় এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেন। যদিও কোনো বড় ধরনের সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়নি, তবে কয়েক ঘণ্টা ধরে এলাকায় চাপা উত্তেজনা বিরাজ করে।স্থানীয় এক দোকানদার বলেন, “রাতে হঠাৎ করেই অনেক মানুষ জড়ো হতে থাকে। আমরা দোকান দ্রুত বন্ধ করে দিই। সবাই ভয় পাচ্ছিল, কখন কী হয়।”আরেক প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্য, “দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থান থেকে কথা বলছিল। পুলিশ না থাকলে পরিস্থিতি খারাপ হতে পারত।”গ্রাফিতি নিয়ে কী অভিযোগ?জুলাই আন্দোলনকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন স্থানে দেয়ালচিত্র ও গ্রাফিতি আঁকা হয়েছিল। এসব চিত্র অনেকের কাছে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। চট্টগ্রামের কয়েকটি এলাকায় আঁকা এমন কিছু গ্রাফিতি সম্প্রতি মুছে ফেলা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।এনসিপির স্থানীয় কয়েকজন নেতা অভিযোগ করেন, পরিকল্পিতভাবেই আন্দোলনের স্মৃতি মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে। তাদের ভাষ্য, দেয়ালচিত্রগুলো শুধু শিল্প নয়, বরং একটি রাজনৈতিক সময়ের দলিল।তবে বিএনপির নেতারা বলছেন, বিষয়টি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাদের ওপর চাপানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। তাদের দাবি, কে বা কারা গ্রাফিতি মুছে ফেলেছে, সেটি এখনো স্পষ্ট নয়। তদন্ত ছাড়া কাউকে দায়ী করা ঠিক হবে না বলেও মন্তব্য করেন তারা।এক বিএনপি নেতা বলেন, “আমাদের দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হচ্ছে, কিন্তু কোনো প্রমাণ দেখানো হয়নি। আমরা চাই নিরপেক্ষ তদন্ত হোক।”প্রশাসনের অবস্থানঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানা গেছে। যদিও এ বিষয়ে রাত পর্যন্ত প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।[TECHTARANGA-POST:1325]পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।তবে এখন পর্যন্ত গ্রাফিতি মুছে ফেলার ঘটনায় কোনো মামলা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাল্টাপাল্টি প্রতিক্রিয়াঘটনার পর থেকেই ফেসবুকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। কেউ এটিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অংশ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ বলছেন—সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতীক নিয়ে এমন বিরোধ নতুন বিভাজন তৈরি করতে পারে।বিশ্লেষকরা মনে করছেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে গিয়ে দেয়ালচিত্র বা গণআন্দোলনের স্মারকগুলোর প্রতি একটি সহনশীল দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। কারণ এসব বিষয় তরুণদের আবেগ ও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।একজন শিক্ষক বলেন, “দেয়ালচিত্র শুধু রাজনীতি নয়, সময়ের ভাষাও বহন করে। এগুলো নিয়ে সংঘাত না বাড়িয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান দরকার।”রাজনৈতিক উত্তেজনার নতুন ইঙ্গিত?চট্টগ্রামে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ইস্যুতে রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা গেছে। এর মধ্যেই গ্রাফিতি বিতর্ক নতুন করে দলগুলোর মধ্যে উত্তেজনার ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয় পর্যবেক্ষকরা।বিশেষ করে তরুণদের অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মগুলো এখন নিজেদের অবস্থান জোরালোভাবে তুলে ধরছে। অন্যদিকে বড় রাজনৈতিক দলগুলোও মাঠের উপস্থিতি ধরে রাখতে সক্রিয় রয়েছে। ফলে ছোট একটি ইস্যুও দ্রুত বড় রাজনৈতিক রূপ নিচ্ছে।তবে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, এমন পরিস্থিতিতে কোনো ধরনের সহিংসতা যেন না ঘটে। কারণ রাজনৈতিক বিরোধের প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ নাগরিকদের জীবনেই পড়ে।এখন কী পরিস্থিতিসোমবার সকাল পর্যন্ত এলাকায় অতিরিক্ত সতর্কতা বজায় রাখা হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। দুই পক্ষের নেতাদের মধ্যেও অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগের চেষ্টা চলছে বলে আলোচনা রয়েছে। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ তা নিশ্চিত করেননি।[TECHTARANGA-POST:1302]গ্রাফিতি অপসারণের প্রকৃত কারণ ও কারা এর সঙ্গে জড়িত—তা এখনো স্পষ্ট নয়। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত বা প্রশাসনিক পদক্ষেপ হলে পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এমন সংবেদনশীল ইস্যুতে দায়িত্বশীল আচরণ জরুরি। কারণ দেয়ালের ছবি মুছে গেলেও, সেটিকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া সামাজিক বিভাজন দীর্ঘমেয়াদে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।