জিয়ার পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন খালেদা জিয়া, লাখো মানুষের অশ্রুসিক্ত বিদায়
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে জেল–জুলুম, নির্যাতন, অসুস্থতা ও কঠিন সময় পেরিয়ে দেশের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বেগম খালেদা জিয়া শেষ পর্যন্ত না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন। তাঁর মৃত্যুতে সারা দেশে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। রাজধানীজুড়ে ছিল কান্না, দোয়া আর লাখো মানুষের ঢল। শেষ পর্যন্ত প্রিয় স্বামী, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান–এর কবরের পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। বুধবার বিকাল পৌনে ৫টায় রাজধানীর জিয়া উদ্যানে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়। এর আগে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা তাঁকে গার্ড অব অনার প্রদান করেন। রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা ও ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে সম্পন্ন হয় পুরো দাফন কার্যক্রম। মায়ের কবরে প্রথম নামলেন তারেক রহমানধর্মীয় রীতি অনুযায়ী বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সবার আগে কবরে নেমে নিজ হাতে মাকে দাফন করেন। তিনিই প্রথম মায়ের কবরে মাটি দেন। পরে পরিবারের সদস্য, স্বজন, তিন বাহিনীর প্রধান এবং বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা একে একে কবরে মাটি দেন।দাফন শেষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস–এর পক্ষে তাঁদের সামরিক সচিব ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। পরে তারেক রহমান, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর প্রধানরাও শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। শেষে মরহুমার রুহের মাগফিরাত কামনায় বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। মানিক মিয়া এভিনিউ যেন জনসমুদ্রদাফনের আগে দুপুরে রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউতে অনুষ্ঠিত হয় তাঁর জানাজা। সকাল থেকেই জাতীয় সংসদ ভবনসংলগ্ন এলাকায় মানুষের ঢল নামে। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরো এলাকা পরিণত হয় জনসমুদ্রে।দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে বাস, ট্রাক, মাইক্রোবাস ও ট্রেনে করে নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ ঢাকায় আসেন শেষ শ্রদ্ধা জানাতে। অনেকের চোখে ছিল অশ্রু, হাতে কালো ব্যাজ। কেউ কোরআন তেলাওয়াত করছিলেন, কেউ নীরবে দাঁড়িয়ে ছিলেন প্রিয় নেত্রীর কফিনের দিকে তাকিয়ে।অনেকেই বলছিলেন, দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এত বড় জানাজা খুব কমই দেখা গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও দিনভর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল তাঁর মৃত্যু ও শেষ বিদায়। রাষ্ট্র ও রাজনীতির শীর্ষ ব্যক্তিদের উপস্থিতিজাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত জানাজায় ইমামতি করেন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি আবদুল মালেক। পুরো আয়োজন পরিচালনা করেন বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান।জানাজায় অংশ নেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, সেনাবাহিনী প্রধান ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান মোহাম্মদ নাজমুল হাসান এবং বিমানবাহিনী প্রধান হাসান মাহমুদ খান।এছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, কূটনীতিক, বিশিষ্ট নাগরিক ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। আবেগঘন বক্তব্যে কেঁদে ফেলেন অনেকেজানাজার আগে দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়ে তারেক রহমান বলেন, তাঁর মা জীবিত অবস্থায় কারও কথায় বা আচরণে কষ্ট দিয়ে থাকলে তিনি পরিবারের পক্ষ থেকে ক্ষমাপ্রার্থী।এই বক্তব্যের সময় উপস্থিত অনেক নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। অনেককে কাঁদতেও দেখা যায়।আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ছিল নজরজানাজায় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, রাশিয়া, কাতার, ইরানসহ ৩২টি দেশের কূটনীতিক উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে।এছাড়া পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিক উপস্থিত থেকে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ঢাকায় এসে ভারতের শোকবার্তা পৌঁছে দেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অবসানদীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিস, লিভার ও কিডনির জটিলতায় ভুগছিলেন খালেদা জিয়া। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় রাজধানীর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। পরে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে দেশজুড়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। অবশেষে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন বলে বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তিনি ছিলেন এক প্রভাবশালী ও বিতর্কিত অধ্যায়ের কেন্দ্রীয় চরিত্র। তাঁর মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে এক শূন্যতা, যা নিয়ে আলোচনা চলবে দীর্ঘদিন।