কর্ণফুলীতে বন্দরের জাহাজ থেকে তেল পাচারের চেষ্টা, আটক ৯
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীতে বন্দর কর্তৃপক্ষের একটি জাহাজ থেকে গোপনে ডিজেল সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগে অভিযান চালিয়ে প্রায় ৪ হাজার লিটার তেল জব্দ করেছে কোস্ট গার্ড। এ ঘটনায় কথিত পাচারচক্রের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে ৯ জনকে আটক করা হয়েছে।শনিবার (৯ মে) রাতে পরিচালিত এ অভিযানের তথ্য রোববার নিশ্চিত করেন কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন। তিনি জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কর্ণফুলী নদীর ডাঙ্গারচর এলাকায় অভিযান চালিয়ে তেল পাচারের ঘটনাটি উদঘাটন করা হয়।গভীর রাতে নদীতে অভিযানকোস্ট গার্ড সূত্র জানায়, শনিবার রাত প্রায় ১০টার দিকে কর্ণফুলী থানার ডাঙ্গারচর এলাকার ডায়মন্ড সিমেন্ট ফ্যাক্টরি সংলগ্ন নদীপথে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে কোস্ট গার্ড বেইস চট্টগ্রাম।[TECHTARANGA-POST:1192]অভিযানের সময় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ‘কান্ডারী-৬’ নামের একটি জাহাজ থেকে ‘ওটি আজু শাহ’ নামের একটি অয়েল ট্যাঙ্কারে ডিজেল স্থানান্তরের ঘটনা দেখতে পান সদস্যরা। পরে সন্দেহ হলে তারা ট্যাঙ্কারটি তল্লাশি চালান।সেখানে প্রায় ৪ হাজার লিটার ডিজেল পাওয়া যায়, যার বাজারমূল্য আনুমানিক ৪ লাখ টাকা বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। কোস্ট গার্ডের দাবি, এসব তেল চোরাইভাবে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছিল।এ সময় ঘটনাস্থল থেকে ৯ জনকে আটক করা হয়। আটক ব্যক্তিদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। বিষয়টি তদন্তাধীন থাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখনো বিস্তারিত তথ্য জানায়নি।বন্দরের জাহাজ ঘিরে নতুন প্রশ্নঘটনার পর চট্টগ্রাম বন্দরের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও তদারকি ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব জাহাজ থেকে কীভাবে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল বাইরে নেওয়ার চেষ্টা হলো, তা নিয়ে নানা আলোচনা চলছে।স্থানীয়দের একাংশের দাবি, কর্ণফুলী নদী ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই ছোট ছোট জাহাজ ও ট্যাঙ্কারের মাধ্যমে জ্বালানি পাচারের অভিযোগ রয়েছে। তবে বেশিরভাগ ঘটনা প্রকাশ্যে আসে না। মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে কিছু চক্রকে ধরা হলেও পরে আবার একই ধরনের কার্যক্রম শুরু হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।নদীপথ সংশ্লিষ্ট কয়েকজন শ্রমিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, রাতের অন্ধকারে অনেক সময় তেল স্থানান্তরের কাজ হয়। বৈধ ও অবৈধ কার্যক্রমের পার্থক্য সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা কঠিন। ফলে সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু চক্র সক্রিয় থাকে বলে তারা দাবি করেন।তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি।জব্দ তেল হস্তান্তরকোস্ট গার্ড জানিয়েছে, অভিযানে জব্দ হওয়া ডিজেল পরে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। একই সঙ্গে আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।[TECHTARANGA-POST:1174]কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা বলেন, ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনা আর না ঘটে, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।তিনি আরও জানান, এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠনের প্রস্তুতি চলছে। সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সমন্বয়ে তদন্ত শেষে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।কর্ণফুলী নদীতে আগেও উঠেছিল অভিযোগকর্ণফুলী নদী চট্টগ্রাম বন্দরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। প্রতিদিন এ নদী দিয়ে শত শত জাহাজ ও কার্গো চলাচল করে। জ্বালানি পরিবহন, পণ্য খালাস ও বন্দরসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কার্যক্রমের কেন্দ্র হওয়ায় নদীপথকে ঘিরে চুরি ও অনিয়মের অভিযোগ নতুন নয়।বিভিন্ন সময়ে জ্বালানি তেল চুরি, অবৈধ স্থানান্তর কিংবা চোরাচালানের অভিযোগ সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, নদীপথে নজরদারি দুর্বল হলে অসাধু চক্র সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করে। বিশেষ করে গভীর রাতে এ ধরনের ঝুঁকি বাড়ে।নৌ নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন, বন্দর ও নদীপথে ডিজিটাল মনিটরিং, জাহাজভিত্তিক জ্বালানি হিসাব এবং নিয়মিত তদারকি জোরদার না হলে এমন ঘটনা পুরোপুরি ঠেকানো কঠিন হবে।সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবজ্বালানি তেল দেশের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। এ ধরনের অভিযোগ শুধু আর্থিক ক্ষতির বিষয় নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সম্পদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ছোট পরিসরের তেল চুরি বা পাচার দীর্ঘ সময় চলতে থাকলে তা বড় ধরনের সিন্ডিকেটে রূপ নিতে পারে।এছাড়া বন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ উঠলে সাধারণ মানুষের আস্থায়ও প্রভাব পড়ে। তাই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে স্বচ্ছ তদন্ত এবং দায় নির্ধারণকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কাউকে সরাসরি দায়ী না করার পক্ষেও মত রয়েছে। কারণ, অনেক সময় শ্রমিক, মাঝি কিংবা পরিবহনকর্মীরা না জেনেও এমন ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন বলে দাবি করা হয়।[TECHTARANGA-POST:1160]তদন্তের দিকে নজরঘটনার পর এখন নজর তদন্ত কমিটির দিকে। কীভাবে বন্দরের জাহাজ থেকে ডিজেল সরানোর চেষ্টা হলো, কারা এর সঙ্গে জড়িত এবং এর পেছনে বড় কোনো চক্র আছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।
কোস্ট গার্ড জানিয়েছে, নদীপথে অবৈধ কার্যক্রম বন্ধে তাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে বন্দর এলাকায় নজরদারি বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে।