পুলিশের জন্য আসছে ওভারটাইম ভাতা, অবসরে মিলতে পারে অনারারি পদোন্নতি
পুলিশ সদস্যদের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের স্বীকৃতি হিসেবে ওভারটাইম ভাতা চালুর পরিকল্পনা করছে সরকার। একই সঙ্গে দীর্ঘ চাকরি জীবনে পদোন্নতি না পাওয়া সদস্যদের অবসরের সময় অনারারি পদোন্নতি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।রোববার (১০ মে) রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ মিলনায়তন-এ ‘পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ কল্যাণ সভায় তিনি এসব তথ্য তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তারেক রহমান।অতিরিক্ত দায়িত্বের স্বীকৃতি হিসেবে ওভারটাইম ভাতাঅনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ সদস্যদের প্রায়ই নির্ধারিত সময়ের বাইরে কাজ করতে হয়। বিশেষ করে উৎসব, রাজনৈতিক কর্মসূচি, গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান কিংবা জরুরি পরিস্থিতিতে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করতে হয় তাদের।[TECHTARANGA-POST:1167]এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে অতিরিক্ত ডিউটির জন্য বিশেষ নীতিমালার আওতায় ওভারটাইম ভাতা দেওয়ার বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে বলে জানান তিনি।মন্ত্রী বলেন, এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে কনস্টেবল থেকে শুরু করে ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার সদস্যরা সরাসরি উপকৃত হবেন। এতে তাদের কর্মস্পৃহা বাড়বে এবং সাধারণ মানুষের প্রতি সেবার মানও উন্নত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।পুলিশ বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরেই অতিরিক্ত দায়িত্বের বিপরীতে আর্থিক স্বীকৃতির দাবি ছিল। মাঠপর্যায়ে কর্মরত সদস্যদের অভিযোগ, নির্ধারিত ছুটিও অনেক সময় তারা ভোগ করতে পারেন না। ফলে ওভারটাইম ভাতার ঘোষণাকে অনেকেই ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।অবসরে অনারারি পদোন্নতির পরিকল্পনাসভায় পুলিশ সদস্যদের পদোন্নতি বঞ্চনার বিষয়টিও সামনে আনেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, অনেক সদস্য দীর্ঘ ৩০ থেকে ৪০ বছর চাকরি করেও একই পদে থেকে অবসরে যান। বিশেষ করে কনস্টেবল পর্যায়ের বহু সদস্য পুরো চাকরি জীবন শেষ করেও কোনো পদোন্নতি পান না।এ অবস্থাকে ‘মানসিকভাবে কষ্টদায়ক’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, চাকরিজীবনে সন্তোষজনক রেকর্ড থাকলে অবসরের সময় সম্মানসূচক বা অনারারি পদোন্নতি দেওয়ার নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে।প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী—
কনস্টেবলদের অনারারি এএসআই
এএসআইদের অনারারি এসআই
এসআইদের অনারারি ইন্সপেক্টর
পদে উন্নীত করার সুযোগ রাখা হতে পারে।সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ধরনের পদোন্নতি আর্থিক সুবিধার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না হলেও সামাজিক মর্যাদা ও আত্মতৃপ্তির জায়গা থেকে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে অবসরের পর পরিচয় ও মর্যাদার বিষয়টি অনেক সদস্যের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।স্বাস্থ্যসেবা ও আবাসন নিয়ে নতুন পরিকল্পনাপুলিশ সদস্যদের শারীরিক ও মানসিক চাপের বিষয়েও কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানান, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব এবং মানসিক চাপের কারণে অনেক সদস্য স্বাস্থ্যগত সমস্যায় ভোগেন।[TECHTARANGA-POST:1148]এ কারণে কেন্দ্রীয় ও বিভাগীয় পর্যায়ের পুলিশ হাসপাতালগুলোকে আরও আধুনিক করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজনে উন্নত চিকিৎসা পরীক্ষার জন্য নতুন ও মানসম্মত হাসপাতাল নির্মাণের কথাও ভাবা হচ্ছে বলে জানান তিনি।আবাসন সংকট নিয়েও সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে আবাসনের ঘাটতি রয়েছে। এ সমস্যা সমাধানে ভূমি অধিগ্রহণ ও প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।পুলিশ সদস্যদের একটি বড় অংশ সরকারি ব্যারাক বা ভাড়া বাসায় পরিবার নিয়ে বসবাস করেন। বিশেষ করে বড় শহরগুলোতে আবাসন ব্যয় বাড়ায় নিম্ন ও মধ্যপদমর্যাদার সদস্যরা বেশি চাপের মধ্যে থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে।আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের দাবিদেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি দাবি করেন, গত দুই মাসে পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে।তার ভাষ্য অনুযায়ী, মাদক কারবারি, চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।তবে অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করেন, শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়। এর পাশাপাশি তদন্তের গতি বাড়ানো, বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে কমিউনিটি পুলিশিং জোরদার করাও জরুরি।পুলিশ বাহিনীর মনোবল বাড়ানোর চেষ্টা?বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশ সদস্যদের কল্যাণ ও পেশাগত সুবিধা নিয়ে সরকারের এই ধরনের ঘোষণা বাহিনীর মনোবল বৃদ্ধির একটি প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা যেতে পারে।[TECHTARANGA-POST:1141]বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পুলিশ সদস্যরা প্রায়ই অতিরিক্ত দায়িত্ব, মানসিক চাপ, সীমিত বিশ্রাম এবং জনসমালোচনার মুখে কাজ করেন। মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী সদস্যদের মধ্যে অনেক সময় হতাশাও তৈরি হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।এ অবস্থায় ওভারটাইম ভাতা, স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন এবং সম্মানসূচক পদোন্নতির মতো উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তা বাহিনীর অভ্যন্তরে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ঘোষণাগুলো বাস্তবে কত দ্রুত কার্যকর হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।অনুষ্ঠানে যারা উপস্থিত ছিলেন‘পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬’-এর এই বিশেষ কল্যাণ সভায় আরও বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী।সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। এছাড়া অনুষ্ঠানের শেষাংশে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন অতিরিক্ত আইজিপি।
পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিভিন্ন ইউনিটের সদস্য এবং সরকারি কর্মকর্তারাও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।