বাংলাদেশকে আগামী ৫ বছরে ৫ বিলিয়ন ডলার দেবে এডিবি, বাড়ছে বার্ষিক ঋণ সহায়তা
বাংলাদেশকে ৫ বিলিয়ন ডলার সহায়তার ঘোষণা এডিবির, বাড়ছে ঋণ সহায়তাওবাংলাদেশের অর্থনীতি যখন একদিকে বৈশ্বিক চাপ, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং ডলার সংকটের মতো বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে, ঠিক তখনই বড় ধরনের আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দিল এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশকে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে দেশের জন্য বার্ষিক ঋণ সহায়তা প্রায় ২০ শতাংশ বাড়ানোর ঘোষণাও এসেছে।[TECHTARANGA-POST:1494]সোমবার সকালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকে এডিবি সভাপতি মাসাতো কান্দা এই পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার উপস্থিত ছিলেন।এডিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শুধু দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার পরিকল্পনাই নয়, ২০২৬ সালের বার্ষিক প্রতিশ্রুতি কর্মসূচির আওতায় প্রায় ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের ঋণচুক্তিও সই হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের অনেকে এটিকে বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক বার্তা হিসেবে দেখছেন।নতুন কোন খাতে খরচ হবে এই অর্থ?এডিবি জানিয়েছে, “ইন্টিগ্রেটেড গ্রোথ নেটওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ” নামে একটি নতুন কর্মসূচির আওতায় এই অর্থ সহায়তা দেওয়া হবে। আগামী পাঁচ বছরে ধাপে ধাপে এই অর্থ ছাড় করা হতে পারে।সংস্থাটির দাবি, এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হবে বিনিয়োগ বাড়ানো, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানো। বিশেষ করে জেলা ও বিভাগভিত্তিক অসম উন্নয়ন কমিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার দিকেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার অর্থায়ন পাওয়া যেতে পারে। এটি এডিবির বিদ্যমান ঋণ সহায়তা কাঠামোর মধ্যেই যুক্ত হবে।বর্তমানে বাংলাদেশে এডিবির বার্ষিক সার্বভৌম ঋণ প্রতিশ্রুতির পরিমাণ প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার। মধ্যমেয়াদে সেটি বাড়িয়ে প্রায় ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।কেন এখন এই সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ?গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি একাধিক চাপের মধ্যে রয়েছে। বৈশ্বিক মন্দা, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ, জ্বালানির উচ্চ মূল্য এবং রপ্তানি বাজারের অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি সহজ ছিল না।এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), সার ও পরিবহন ব্যয় বাড়তে শুরু করেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়ের ওপর।এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে অতিরিক্ত ২৫০ মিলিয়ন ডলার সহায়তা দেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছে এডিবি। সংস্থাটি বলছে, বাড়তি জ্বালানি ব্যয় ও আমদানি চাপে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে এই অর্থ ব্যবহার করা হতে পারে।[TECHTARANGA-POST:1476]বিশ্লেষকদের মতে, এই সহায়তা শুধু অর্থের অঙ্ক নয়, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রতি আস্থারও একটি বার্তা।“বাংলাদেশ নতুন এক পর্যায়ে প্রবেশ করছে”বৈঠকে এডিবি সভাপতি মাসাতো কান্দা বলেন, বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে। অর্জিত স্থিতিশীলতা ধরে রাখা, নতুন প্রবৃদ্ধির খাত তৈরি এবং আরও বহুমুখী ও সহনশীল অর্থনীতি গড়ে তুলতে এডিবি পাশে থাকবে।তার বক্তব্যকে অনেকে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী প্রস্তুতির সঙ্গে মিলিয়ে দেখছেন। কারণ, আগামী বছরগুলোতে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হয়ে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে স্থায়ীভাবে জায়গা করে নিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এতে যেমন নতুন সুযোগ তৈরি হবে, তেমনি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ও অর্থনৈতিক চাপও বাড়বে।এডিবির দাবি, বাড়তি অর্থায়ন বিনিয়োগনির্ভর প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, সুশাসন এবং অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণে সহায়তা করবে। পাশাপাশি এলডিসি উত্তরণ প্রক্রিয়াকেও সহজ করবে।ঋণ বাড়ছে, বাড়ছে প্রশ্নওতবে বড় অঙ্কের ঋণ সহায়তার ঘোষণার পাশাপাশি কিছু প্রশ্নও সামনে আসছে। অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করছেন, উন্নয়ন প্রকল্পে বিদেশি ঋণ প্রয়োজন হলেও তার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।অভিযোগ উঠেছে, অতীতে অনেক প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি, দীর্ঘসূত্রতা এবং দুর্বল বাস্তবায়নের কারণে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যায়নি। ফলে নতুন অর্থায়ন কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যাবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নতুন সহায়তা এমন খাতে ব্যয় করা হবে যা সরাসরি কর্মসংস্থান, যোগাযোগব্যবস্থা ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে ভূমিকা রাখবে।এদিকে সাধারণ মানুষের মধ্যেও এক ধরনের মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। কেউ এটিকে অর্থনীতির জন্য স্বস্তির খবর হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ বিদেশি ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে কী ভাবছেন বিশেষজ্ঞরা?অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, শুধু ঋণ পাওয়া নয়, সেই অর্থ দিয়ে কী ধরনের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনা যাচ্ছে সেটিই আসল বিষয়। যদি এই অর্থ শিল্প, অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে ব্যবহার করা যায়, তাহলে তা দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।তবে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে বড় অঙ্কের অর্থও কাঙ্ক্ষিত ফল নাও দিতে পারে বলে মনে করছেন তারা।[TECHTARANGA-POST:1470]বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, বাংলাদেশের সামনে এখন দুই ধরনের বাস্তবতা আছে। একদিকে আন্তর্জাতিক সহযোগীদের আস্থা বাড়ছে, অন্যদিকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাও বাড়ছে। এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সঠিক অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়াই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
এডিবি আরও জানিয়েছে, বাংলাদেশের মধ্যমেয়াদি উন্নয়ন কাঠামো বাস্তবায়নে সহায়তার জন্য অতিরিক্ত ২০ লাখ ডলারের কারিগরি সহায়তাও দেওয়া হবে। এই সহায়তা মূলত পরিকল্পনা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন সক্ষমতা বাড়াতে ব্যবহার করা হতে পারে।