ঈদযাত্রায় ঢাকার বাইরে মানুষের ঢল: ট্রেন, সড়ক ও নৌপথে ভোগান্তি, বাড়তি চাপ সামলাতে হিমশিম কর্তৃপক্ষ
পবিত্র ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকা এখন প্রায় খালি হওয়ার পথে। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত শুধু একটাই দৃশ্য—ঘরমুখো মানুষের ঢল। সড়ক, রেল ও নৌপথে যাত্রীর চাপ এতটাই বেড়েছে যে স্বাভাবিক পরিবহন ব্যবস্থায় এখন স্পষ্ট চাপ পড়ছে।বুধবার (১৮ মার্চ) ভোর থেকেই রাজধানীর কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে দেখা গেছে উপচেপড়া ভিড়। পরিবার-পরিজন নিয়ে মানুষ ছুটছেন নিজ নিজ গন্তব্যে, কেউ আবার ছোট শিশুদের নিয়ে দীর্ঘ অপেক্ষায় প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছেন।কমলাপুরে ভোর থেকেই উপচে পড়া ভিড়ভোরের শুরুতেই স্টেশনে হাজারো যাত্রী ভিড় করতে থাকেন। ট্রেন আসার আগেই প্ল্যাটফর্মে জায়গা নেওয়ার জন্য তৈরি হয় চাপা প্রতিযোগিতা।অনেক যাত্রী অভিযোগ করেন, ট্রেনে আসন না পেয়ে বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়ে ছাদে উঠে পড়ছেন কিছু মানুষ, যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে কর্তৃপক্ষ।স্টেশন সূত্রে জানা গেছে, সকাল সোয়া ৭টা পর্যন্ত ছয়টি ট্রেন নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ছেড়ে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে ধূমকেতু, পারাবত, নীলসাগর, সোনার বাংলা, এগারোসিন্দুর প্রভাতী ও নারায়ণগঞ্জ কমিউটার ট্রেন।রেলওয়ের চ্যালেঞ্জ: সময় ঠিক রাখা কঠিনবাংলাদেশ রেলওয়ে জানিয়েছে, ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন রাখতে ট্রেনের সময়সূচি ঠিক রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। তবে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি যাত্রীচাপের কারণে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।রেলওয়ে কর্মকর্তারা বলছেন, অতিরিক্ত যাত্রীর কারণে অনেক ট্রেনে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি ভিড় তৈরি হচ্ছে, যা নিরাপত্তার দিক থেকেও চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।মহাসড়কে যানজট, ধীরগতি বাড়ছেসড়কপথেও একই চিত্র। ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে হালকা থেকে মাঝারি যানজট দেখা গেছে।বিশেষ করে টোল প্লাজা, নির্মাণাধীন অংশ এবং সংকীর্ণ সড়কে যানবাহনের ধীরগতির কারণে যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়ছে।যাত্রীরা বলছেন, স্বাভাবিক সময়ে যে পথ কয়েক ঘণ্টায় অতিক্রম করা যায়, ঈদের সময় সেটি অনেক বেশি সময় নিচ্ছে।ট্রাক-লরি চলাচলে সাময়িক নিষেধাজ্ঞাঈদযাত্রা স্বস্তিদায়ক করতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ১৭ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত মহাসড়কে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও লরি চলাচল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যবাহী যানবাহন এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে রাখা হয়েছে।সদরঘাটেও যাত্রীচাপনৌপথে রাজধানীর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে দেখা গেছে অতিরিক্ত যাত্রীচাপ। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি মানুষ লঞ্চে করে নিজ নিজ গন্তব্যে যাচ্ছেন।লঞ্চগুলো যাত্রী পূর্ণ করেই নির্ধারিত সময়ে ছেড়ে যাচ্ছে। পদ্মা সেতু চালুর পর নৌপথে যাত্রী কিছুটা কমলেও ঈদের সময় আবারও চাপ বেড়ে যায়।২০০টির বেশি ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টে নজরদারিসড়ক পরিবহণ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দেশের মহাসড়কে ২০০টির বেশি যানজটপ্রবণ স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে।এসব স্থানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা হয়েছে। উদ্দেশ্য—যাত্রীদের নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক যাত্রা নিশ্চিত করা।পদ্মা সেতুতে তুলনামূলক স্বস্তিপদ্মা সেতু এলাকায় যানবাহনের চাপ বাড়লেও বড় ধরনের যানজট তৈরি হয়নি। দক্ষিণাঞ্চলের যাত্রীরা তুলনামূলক স্বাচ্ছন্দ্যে পারাপার করছেন।তবে সেতু সংলগ্ন সড়কগুলোতে চাপ বাড়ায় কিছুটা ধীরগতি লক্ষ্য করা গেছে।বিভিন্ন রুটে ভোগান্তির শঙ্কাঢাকা-সিলেট, যশোর-খুলনা ও বরিশাল রুটে ভাঙাচোরা সড়ক ও নির্মাণাধীন কাজের কারণে যানবাহনের গতি কমে গেছে।যাত্রীদের অভিযোগ, এসব রুটে দীর্ঘ সময় আটকে থাকতে হচ্ছে, যা ঈদযাত্রার স্বস্তি কমিয়ে দিচ্ছে।প্রশাসনের প্রস্তুতি ও আহ্বানসরকারি সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ঈদযাত্রা স্বাভাবিক রাখতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। রেল, সড়ক ও নৌপথে সমন্বিতভাবে কাজ চলছে।তবে যাত্রীদের প্রতি শৃঙ্খলা বজায় রাখা, সময় মেনে চলা এবং নিরাপত্তা বিধি অনুসরণের আহ্বান জানানো হয়েছে।শেষ কথাঈদ মানেই আনন্দ, কিন্তু সেই আনন্দের যাত্রায় ভিড়, যানজট ও দীর্ঘ অপেক্ষা যেন নিয়মিত বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। প্রশাসনের প্রস্তুতি থাকলেও যাত্রীচাপের কারণে চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ঈদযাত্রা যতটা না স্বস্তির, তার চেয়ে বেশি এখন এক ধরনের ধৈর্যের পরীক্ষা হয়ে উঠেছে।