দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর
সর্বশেষ

সাইবার বুলিংয়ের শিকার ১০০ কিশোরীর ৩১ জনের মধ্যে গুরুতর বিষণ্নতার লক্ষণ

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হয়রানি বা সাইবার বুলিংয়ের শিকার বাংলাদেশি কিশোরীদের মধ্যে গুরুতর বিষণ্নতার লক্ষণ তুলনামূলক বেশি। প্রতি ১০০ জন সাইবার বুলিংয়ের শিকার কিশোরীর মধ্যে ৩১ জনের মধ্যে মেজর ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডার (এমডিডি) বা গুরুতর বিষণ্নতার লক্ষণ পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত সব কিশোরীর মধ্যে এ লক্ষণের হার ১২ শতাংশ।বাংলাদেশি কিশোরীদের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, গত ১২ মাসে সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়নি এমন কিশোরীদের তুলনায় এর শিকার কিশোরীদের গুরুতর বিষণ্নতার লক্ষণ থাকার আশঙ্কা প্রায় চার গুণ বেশি। অনলাইনে হয়রানির মাত্রা বাড়ার সঙ্গে বিষণ্নতার ঝুঁকিও বাড়তে দেখা গেছে।‘বাংলাদেশি কিশোরীদের মধ্যে সাইবার বুলিংয়ের সঙ্গে মেজর ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডারের সম্পর্ক’ শীর্ষক গবেষণাটি ২০২৫ সালের ১২ আগস্ট স্প্রিংগার নেচার লিংকে প্রকাশিত হয়।বাংলাদেশ কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্য ও সুস্থতা জরিপ ২০১৯-২০-এর তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষণাটি পরিচালনা করেন আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য বিভাগ এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের গবেষকেরা।গবেষণায় ৪ হাজার ৯৮৪ জন কিশোরীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, অংশগ্রহণকারীদের ১২ শতাংশের মধ্যে মেজর ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডারের লক্ষণ রয়েছে। সাইবার বুলিংয়ের শিকার কিশোরীদের মধ্যে এ হার ৩১ শতাংশ।গবেষণার ফল অনলাইন হয়রানি ও কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়। তবে এই সম্পর্কের অর্থ এই নয় যে, বিষণ্নতার প্রতিটি ঘটনার একমাত্র কারণ সাইবার বুলিং। কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যে ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক নানা বিষয়ও ভূমিকা রাখতে পারে।গবেষণায় অঞ্চলভেদে সাইবার বুলিংয়ের হারে পার্থক্য পাওয়া গেছে। বিভাগগুলোর মধ্যে বরিশালে কিশোরীদের সাইবার বুলিংয়ের হার সবচেয়ে বেশি, ১৩ শতাংশ। এরপর রয়েছে রংপুরে ১১ শতাংশ এবং ময়মনসিংহে ১০ শতাংশ।চট্টগ্রাম, খুলনা ও রাজশাহীতে এ হার ৮ শতাংশ করে। ঢাকায় ৬ শতাংশ এবং সিলেটে সবচেয়ে কম, ৪ শতাংশ।অঞ্চলভিত্তিক এই পার্থক্য সাইবার বুলিং প্রতিরোধে সচেতনতামূলক উদ্যোগ ও সহায়তার ব্যবস্থা আরও কার্যকরভাবে পরিকল্পনা করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। তবে কেন কোনো অঞ্চলে এ হার বেশি বা কম, তা বুঝতে আলাদা বিশ্লেষণ প্রয়োজন।গবেষণায় দেখা গেছে, বিবাহিত ও অবিবাহিত—উভয় শ্রেণির কিশোরীদের সাইবার বুলিংয়ের প্রধান উৎস অপরিচিত ব্যক্তি। তবে অবিবাহিত কিশোরীদের ক্ষেত্রে বন্ধু ও সহপাঠীদের সম্পৃক্ততাও দেখা গেছে।বিবাহিত বা আগে বিবাহিত কিশোরীদের ৬ দশমিক ৬ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁরা স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের কাছ থেকেও সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়েছেন।এ তথ্য দেখায়, অনলাইন হয়রানি শুধু অপরিচিত ব্যক্তির কাছ থেকে আসে না; পরিচিতজন বা ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মধ্যেও এমন আচরণ ঘটতে পারে। ফলে প্রতিরোধের ক্ষেত্রে অনলাইন নিরাপত্তার পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কের বিষয়টিও গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, অনলাইনে হয়রানি বা সহিংসতার শিকার হলে তা গোপন না রেখে দ্রুত সহায়তা নেওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করা বা ‘ভিকটিম ব্লেমিং’ থেকে বিরত থাকতে হবে।প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাইবার ইউনিটের সহায়তা নিয়ে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে বলেও জানান তিনি।ডা. হেলাল উদ্দিনের মতে, সাইবার সহিংসতার কারণে মানসিক সমস্যা তৈরি হলে যথাযথ চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। মৃদু সমস্যার ক্ষেত্রে কাউন্সেলিংয়ে উন্নতি হতে পারে। আর গুরুতর ক্ষেত্রে ওষুধ ও কাউন্সেলিং—দুই ধরনের চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।অনলাইনে হয়রানির শিকার হলে বিশ্বস্ত অভিভাবক, শিক্ষক বা অন্য কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে জানানো, হয়রানির প্রমাণ সংরক্ষণ করা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে কিশোরীদের অভিযোগ গুরুত্ব দিয়ে শোনা এবং তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য সমীক্ষা ২০১৮-১৯ অনুযায়ী, বাংলাদেশের ১৩ শতাংশ কিশোর-কিশোরী বিভিন্ন ধরনের মানসিক সমস্যায় ভুগছে।ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রায় ৯২ শতাংশ চিকিৎসাসেবার বাইরে রয়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ সীমিত।এই বাস্তবতায় সাইবার বুলিংয়ের শিকার কিশোরীদের জন্য সহজলভ্য কাউন্সেলিং ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। অনলাইন হয়রানির ঘটনা প্রকাশ্যে আনার পর ভুক্তভোগীরা যেন সামাজিক লজ্জা, অপমান বা দোষারোপের শিকার না হন, সে বিষয়েও পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সচেতন থাকতে হবে।সাইবার বুলিং প্রতিরোধে গবেষকেরা সহজে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক কর্মসূচি এবং দ্রুত কাউন্সেলিংয়ের সুযোগ তৈরির সুপারিশ করেছেন।একই সঙ্গে কিশোরীদের নিরাপদে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সচেতন করা এবং অভিভাবকদের সঙ্গে অনলাইন অভিজ্ঞতা নিয়ে খোলামেলা আলোচনার পরিবেশ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।পরিবারের সদস্যদের উচিত কিশোরীদের অনলাইন অভিজ্ঞতা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং হয়রানির ঘটনা জানালে তাঁদের বিশ্বাস করা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাইবার বুলিং সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি অভিযোগ জানানোর গোপনীয় ও নিরাপদ ব্যবস্থা থাকাও জরুরি।সাইবার বুলিংকে অনেক সময় অনলাইনের সাময়িক ঝামেলা বা ব্যক্তিগত বিরোধ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু গবেষণার ফল বলছে, এর সঙ্গে কিশোরীদের গুরুতর বিষণ্নতার লক্ষণের উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক রয়েছে। তাই অনলাইন হয়রানিকে শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি কিশোরীদের মানসিক সুস্থতা ও নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত।একই সঙ্গে ভুক্তভোগীদের নীরব থাকতে বলা বা তাঁদের আচরণকে দায়ী করা সমস্যাকে আরও জটিল করতে পারে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হলো—হয়রানির অভিযোগ গুরুত্ব দিয়ে দেখা, নিরাপদে সহায়তা পাওয়ার সুযোগ তৈরি করা এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা।অনলাইনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারের শিক্ষা নয়; কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্য ও মর্যাদা রক্ষারও অংশ।

সাইবার বুলিংয়ের শিকার ১০০ কিশোরীর ৩১ জনের মধ্যে গুরুতর বিষণ্নতার লক্ষণ