সাবিনা ইয়াসমিনের গানে জমে উঠল গুলশান সোসাইটির সন্ধ্যা, নতুন কমিটির বড় পরিকল্পনার ঘোষণা
রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশানকে আরও আধুনিক ও বাসযোগ্য নগর অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হলো গুলশান সোসাইটির নবনির্বাচিত কমিটির শপথ অনুষ্ঠান। তবে আনুষ্ঠানিকতার বাইরেও পুরো আয়োজনের মূল আকর্ষণ হয়ে ওঠেন কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন। তার একের পর এক জনপ্রিয় গানে মুখর হয়ে ওঠে অনুষ্ঠানের পুরো পরিবেশ।শনিবার (৯ মে) রাতে রাজধানীর শেরাটন হোটেলে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে গুলশান সোসাইটির নতুন নির্বাহী কমিটির আনুষ্ঠানিক পরিচিতি, শপথ গ্রহণ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ঘোষণা দেওয়া হয়। পাশাপাশি ছিল সাংস্কৃতিক আয়োজন, যেখানে সংগীত পরিবেশন করেন দেশের জনপ্রিয় শিল্পীরা।শুরুতেই সংগীতের আবহসন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে অনুষ্ঠান শুরু হয় সংগীতশিল্পী সাব্বির জামান–এর গান দিয়ে। শুরু থেকেই আয়োজনে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। তিনি পর্যায়ক্রমে পাঁচটি গান পরিবেশন করেন। অতিথিরা সংগীত উপভোগের পাশাপাশি একে অপরের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় ও মতবিনিময়ে অংশ নেন।[TECHTARANGA-POST:1168]এরপর মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় বিদায়ী কমিটির কার্যক্রম উপস্থাপনার মাধ্যমে। বিদায়ী পরিষদের সদস্যরা তাদের মেয়াদকালে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক উদ্যোগ, নাগরিক সমস্যা সমাধানের প্রচেষ্টা এবং সোসাইটির প্রশাসনিক কার্যক্রম তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে তাদের হাতে সম্মাননা স্মারকও তুলে দেওয়া হয়।নতুন কমিটির শপথ, সামনে দুই বছরের পরিকল্পনাগুলশান সোসাইটির নির্বাচনে টানা দ্বিতীয়বারের মতো সভাপতি নির্বাচিত হওয়া ওমর সাদাত নতুন কমিটির সদস্যদের পরিচয় করিয়ে দেন। পরে নবনির্বাচিত নির্বাহী কমিটি আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করে।শপথ শেষে বক্তব্যে ওমর সাদাত আগামী দুই বছরের কর্মপরিকল্পনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তিনি জানান, গুলশানকে আন্তর্জাতিক মানের একটি আধুনিক নগর এলাকা হিসেবে গড়ে তুলতে বিশেষ টাস্কফোর্স কাজ শুরু করেছে। শুধু গুলশান নয়, বনানী, বারিধারা ও নিকেতন এলাকার প্রতিনিধিরাও এতে যুক্ত রয়েছেন।তার ভাষ্য অনুযায়ী, নগরজীবনের অন্যতম বড় সমস্যা দখলবাজি, অব্যবস্থাপনা ও যত্রতত্র বর্জ্য ফেলা নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এ কাজে রাজউক ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সহযোগিতা নেওয়ার কথাও জানান তিনি।নাগরিক সমস্যার সমাধানে জোরঅনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান। তিনি নগর ব্যবস্থাপনায় নাগরিক অংশগ্রহণের গুরুত্ব তুলে ধরেন। একই সঙ্গে সোসাইটিভিত্তিক উদ্যোগ নগরজীবনের নানা সংকট কমাতে সহায়ক হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন।গুলশান সোসাইটির মহাসচিব মুজিবুর রহমান মৃধা-সহ অন্য বক্তারাও পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তারা বলেন, শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা ও সামাজিক সম্প্রীতি ধরে রাখাও এখন বড় চ্যালেঞ্জ।[TECHTARANGA-POST:1150]অনুষ্ঠানে উপস্থিত কয়েকজন বাসিন্দা জানান, গুলশানের মতো এলাকায় যানজট, ফুটপাত দখল, অনিয়ন্ত্রিত বর্জ্য ফেলা ও পার্কিং সংকট দিন দিন বাড়ছে। এসব সমস্যা সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ দেখতে চান তারা।মঞ্চে উঠেই মাতালেন সাবিনা ইয়াসমিনরাত সাড়ে ৯টার দিকে মঞ্চে ওঠেন দেশের সংগীতাঙ্গনের অন্যতম কিংবদন্তি সাবিনা ইয়াসমিন। তিনি মঞ্চে আসার পর পুরো অনুষ্ঠানের আবহ যেন অন্য মাত্রা পায়।‘সুন্দর সুবর্ণ তারুণ্য লাবণ্য’, ‘আমি রজনীগন্ধা ফুলের মতো’, ‘দুঃখ ভালোবেসে প্রেমের খেলা খেলতে হয়’, ‘চিঠি দিও’, ‘এই মন তোমাকে দিলাম’, ‘ওগো বন্ধু কাছে থেকো’, ‘শুধু গান গেয়ে পরিচয়’, ‘ইশারায় শিস দিয়ে’, ‘সে যে কেন এলো না’ এবং ‘সবকটা জানালা খুলে দাও না’সহ তার জনপ্রিয় গানগুলোতে অতিথিদের অনেকেই গলা মেলান।অনুষ্ঠানে উপস্থিত কয়েকজন অতিথি বলেন, দীর্ঘদিন পর এমন একটি আয়োজনে সংগীত, সামাজিক যোগাযোগ ও নাগরিক পরিকল্পনা—সবকিছুর সমন্বয় দেখা গেছে। বিশেষ করে সাবিনা ইয়াসমিনের পরিবেশনা পুরো আয়োজনকে স্মরণীয় করে তোলে।সামাজিক সম্প্রীতি ও নগর সংস্কৃতির বার্তাশুধু শপথ অনুষ্ঠান নয়, পুরো আয়োজনটি ছিল এক ধরনের সামাজিক সংযোগ তৈরির প্রচেষ্টা বলেও মনে করছেন অনেকে। রাজধানীর ব্যস্ত নগরজীবনে বাসিন্দাদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ কমে যাওয়ার অভিযোগ অনেক দিনের। এমন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সেই দূরত্ব কিছুটা হলেও কমে আসে বলে মত দিয়েছেন অংশগ্রহণকারীরা।বিশেষজ্ঞদের মতে, নগর উন্নয়ন কেবল রাস্তা বা অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি এলাকার সামাজিক বন্ধন, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং নাগরিক সচেতনতার সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে। গুলশান সোসাইটির মতো সংগঠনগুলো যদি নাগরিক সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক সম্প্রীতি ধরে রাখতে ভূমিকা রাখে, তাহলে সেটি দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।[TECHTARANGA-POST:1118]তবে এসব পরিকল্পনার বাস্তবায়ন কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়, নিয়মিত তদারকি এবং বাসিন্দাদের সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর—এমন মন্তব্যও এসেছে অনুষ্ঠানে উপস্থিত কয়েকজনের কাছ থেকে।শেষ হলো গানে গানেরাত গভীর পর্যন্ত চলে অনুষ্ঠান। শেষদিকে আবারও আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয় সাবিনা ইয়াসমিনের গানে। তার সংগীত পরিবেশনার মধ্য দিয়েই শেষ হয় গুলশান সোসাইটির এই বিশেষ সন্ধ্যা।
নতুন কমিটির দায়িত্ব গ্রহণের পাশাপাশি নাগরিক উন্নয়ন ও সাংস্কৃতিক সম্প্রীতির যে বার্তা দেওয়া হয়েছে, এখন সেটির বাস্তব প্রতিফলন দেখতে অপেক্ষায় গুলশানবাসী।