হামের চিকিৎসায় দিশেহারা পরিবারগুলো, এক রোগে ভাঙছে আর্থিক ও মানসিক স্থিতি
দেশজুড়ে হামের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়েছেন শিশু রোগীদের পরিবারগুলো। একের পর এক হাসপাতালে ঘুরে চিকিৎসা নিতে গিয়ে অনেক পরিবারই আর্থিকভাবে ভেঙে পড়ছে। পিরোজপুরের এক পরিবারের অভিজ্ঞতা বলছে, একটি শিশুর চিকিৎসাই কিভাবে পুরো সংসারের আয় বন্ধ করে দিতে পারে, জমে থাকা সঞ্চয় শেষ করে দিতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত ঋণের চাপে ফেলে দিতে পারে।এক বছরের এক শিশুকে নিয়ে টানা প্রায় তিন মাস বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ছুটতে হয়েছে পিরোজপুরের জাকির হোসেনকে (ছদ্মনাম)। শুরুটা হয়েছিল ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে জ্বর দিয়ে, আর শেষ হয়নি এখনও—কারণ চিকিৎসা এখনো দীর্ঘমেয়াদি পর্যায়ে আছে। এই সময়ের মধ্যে চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও যাতায়াতে তাঁর খরচ দাঁড়িয়েছে প্রায় দেড় লাখ টাকার মতো, আর পুরো পরিবারের আয় কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।[TECHTARANGA-POST:1245]হাম আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি একই ধরনের সংকটে পড়ছেন দেশের হাজারো পরিবার। চিকিৎসা জটিলতা, হাসপাতাল ঘুরে বেড়ানো, শয্যা সংকট এবং বাড়তি খরচ মিলিয়ে পরিস্থিতি অনেকের জন্যই সহ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে।জ্বর থেকে শুরু, হাসপাতাল ঘুরে বেড়ানোর দীর্ঘ যাত্রাজাকির হোসেনের সন্তানের অসুস্থতার শুরু হয় ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে। প্রথমে পিরোজপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হলে চিকিৎসার পর ১ মার্চ তাকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। তবে রিপোর্টে ব্রঙ্কাইটিস ও রক্তস্বল্পতার উল্লেখ ছিল। বাড়ি ফেরার দুই দিনের মাথায় আবারও অসুস্থ হয়ে পড়ে শিশুটি।এরপর শুরু হয় হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ছুটে চলার এক দীর্ঘ যাত্রা। প্রথমে বরিশালে চিকিৎসকের পরামর্শ, পরে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি। সেখানে নিউমোনিয়া ধরা পড়ে এবং সাত দিন চিকিৎসার পর ছাড়পত্র দেওয়া হয়।কিন্তু অবস্থার উন্নতি হয়নি। খুলনার একটি বেসরকারি ক্লিনিকে পরীক্ষায় হামের সংক্রমণ ধরা পড়ে। এরপর আবার পিরোজপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করাতে হয় শিশুটিকে।পরিস্থিতি আরও জটিল হলে চিকিৎসকের পরামর্শে শিশুটিকে ঢাকায় নেওয়া হয়। ৩ মে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং পরে ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।এই দীর্ঘ চিকিৎসা পথচলায় পরিবারটি শুধু শারীরিক নয়, মানসিকভাবেও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।চিকিৎসা ব্যয়, বন্ধ হয়ে যাওয়া আয়ের উৎসজাকির হোসেন জানান, ছেলের চিকিৎসায় এখন পর্যন্ত প্রায় দেড় লাখ টাকা খরচ হয়েছে। এর বড় অংশই এসেছে সঞ্চয় ভেঙে ও ধার করে। পাশাপাশি তাঁর ছোট ব্যবসা ও কৃষিকাজ বন্ধ হয়ে গেছে, ফলে পরিবারের আয়ের উৎস সম্পূর্ণভাবে থেমে যায়।এখানেই শেষ নয়। বৃষ্টিতে কৃষিজ ফসলের ক্ষতি হয়ে আরও এক থেকে দেড় লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে তাঁকে। সব মিলিয়ে পরিবারটি এখন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সামনে দাঁড়িয়ে।চিকিৎসকদের মতে, শিশুটির এখনো হামের পরবর্তী জটিলতার কারণে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা প্রয়োজন, যা খরচ আরও বাড়াতে পারে।এ ধরনের পরিস্থিতি শুধু জাকির হোসেনের পরিবারেই সীমাবদ্ধ নয়—বরং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।হামের প্রকোপ: পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট সংকটসরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত সারা দেশে অন্তত ৫৯ হাজার শিশু হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৪২৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে প্রায় পৌনে ৩৭ হাজার শিশু, আর চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরেছে প্রায় ৩৩ হাজার।[TECHTARANGA-POST:1252]রাজধানীর ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড হাসপাতালে শুধু ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত ৪ হাজার ৪২৫ শিশু ভর্তি হয়েছে। বর্তমানে সেখানে ২১০ শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে।সংখ্যাগুলো বলছে, পরিস্থিতি এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়—বরং একটি ব্যাপক জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিয়েছে।হাসপাতাল ঘুরে বেড়ানো এবং শয্যা সংকটের বাস্তবতাহামে আক্রান্ত শিশুদের বড় একটি সমস্যা হলো—একটি হাসপাতালে চিকিৎসা শেষ হলেও জটিলতা দেখা দিলে আবার অন্য হাসপাতালে যেতে হয়।অনেক ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট বা অন্যান্য সংক্রমণ যুক্ত হয়ে যায়, যার ফলে আইসিইউ বা পিআইসিইউ প্রয়োজন হয়। কিন্তু এসব ইউনিটে শয্যা সংকট থাকায় পরিবারগুলোকে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটতে হচ্ছে।ফরিদপুরের ভ্যানচালক আবির শেখ (ছদ্মনাম) জানান, সন্তানের চিকিৎসায় ঢাকায় আসতে বাধ্য হন কারণ স্থানীয় হাসপাতালে পর্যাপ্ত শয্যা পাওয়া যায়নি। এখন পর্যন্ত তিনি প্রায় ৪০ হাজার টাকা খরচ করেছেন, যার বেশিরভাগই ধার করা।আরেকটি ঘটনায় যশোর থেকে আসা এক অভিভাবক জানান, শেষ পর্যন্ত বারান্দায় বসিয়েই শিশুর চিকিৎসা চলছে, কারণ আইসিইউ শয্যা পাওয়া যায়নি।পরিবারের ওপর নীরব অর্থনৈতিক চাপহামের চিকিৎসা ব্যয়ের বিষয়ে আলাদা কোনো জাতীয় সমীক্ষা না থাকলেও বিভিন্ন গবেষণা বলছে, এই রোগের চিকিৎসা অনেক পরিবারকে আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে।বিএমসি জার্নালে প্রকাশিত ২০২০ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশে হামে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর গড় ব্যয় ছিল প্রায় ১৫৯ ডলার, যার প্রায় অর্ধেকই বহন করেছে পরিবার।বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সময়ে এই ব্যয় আরও বেড়েছে। কারণ—
ওষুধের একটি বড় অংশ বাইরে থেকে কিনতে হয়
একাধিক হাসপাতালে যেতে হয়
আইসিইউ প্রয়োজন হলে খরচ বহুগুণ বেড়ে যায়
অ্যাম্বুলেন্স ও যাতায়াত ব্যয় যুক্ত হয়
অভিভাবকের আয় বন্ধ হয়ে যায়
ফলে একেকটি গুরুতর কেসে খরচ ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা বা তারও বেশি হয়ে যাচ্ছে।[TECHTARANGA-POST:1224]স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে সংকটের মূল কারণঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. সাইফুন নাহিন শিমুল মনে করেন, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা এই সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাঁর মতে, রোগীর স্বজনদের অস্থিরতা সামলানোর পর্যাপ্ত দক্ষতা অনেক ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকর্মীদের নেই, যা অপ্রয়োজনীয় জটিলতা তৈরি করছে।তিনি আরও বলেন, উপজেলা পর্যায়ে অক্সিজেনসহ মৌলিক চিকিৎসা ব্যবস্থা থাকলেও অনেক সময় রোগীকে অযথা বড় হাসপাতালে পাঠানো হয়, ফলে খরচ বেড়ে যায়।পাবলিক হেলথ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক আবু জামিল ফয়সাল বলেন, হামের এই ব্যাপক বিস্তার শুধু স্বাস্থ্যগত সমস্যা নয়, এটি এখন সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিয়েছে।সামাজিক প্রভাব: এক রোগে ভাঙছে পরিবারহামের চিকিৎসার এই চাপ শুধু আর্থিক ক্ষতিতেই সীমাবদ্ধ নয়। অনেক পরিবারে দেখা যাচ্ছে—
ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়া
কৃষি বা ছোট ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়া
কর্মজীবী অভিভাবকের কাজ হারানো
মানসিক চাপ ও অনিশ্চয়তা
দীর্ঘমেয়াদি দারিদ্র্যের ঝুঁকি
একটি শিশুর চিকিৎসার জন্য পরিবারকে দীর্ঘ সময় কাজ থেকে দূরে থাকতে হওয়ায় অনেকেই নতুন করে দারিদ্র্যের চক্রে ঢুকে পড়ছে। স্বাস্থ্য ব্যয়ের বড় অংশ ব্যক্তির পকেট থেকে আসায় এই চাপ আরও তীব্র হচ্ছে।শেষ কথা: সংকট কমাতে প্রয়োজন সমন্বিত ব্যবস্থাহামের প্রকোপ কমলেও এর প্রভাব এখনো বহু পরিবারকে ভোগাচ্ছে। চিকিৎসা ব্যবস্থার সমন্বয়হীনতা, শয্যা সংকট, ওষুধের বাড়তি ব্যয় এবং তথ্যের ঘাটতি মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল আকার নিয়েছে।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উপজেলা পর্যায়ে কার্যকর চিকিৎসা ব্যবস্থা, প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী, শক্তিশালী রেফারেল সিস্টেম এবং দ্রুত রোগী ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না গেলে এই ধরনের সংকট আরও বাড়বে।
বর্তমানে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসার পাশাপাশি সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—পরিবারগুলো এই আর্থিক ও মানসিক চাপ কতদিন সামাল দিতে পারবে।