দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর
সর্বশেষ

তিন মাসে কোটি টাকার ব্যাংক হিসাব বেড়েছে ৫ হাজার ৭৭টি

একদিকে দ্রব্যমূল্যের চাপে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের বড় একটি অংশ, অন্যদিকে ব্যাংকিং খাতে বাড়ছে এক কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাব। মাত্র তিন মাসে এমন হিসাবের সংখ্যা বেড়েছে ৫ হাজার ৭৭টি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে দেশের ব্যাংকগুলোতে এক কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৫৬২টিতে। মার্চ শেষে এ সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৩৬ হাজার ৪৮৫টি। অর্থাৎ তিন মাসে এই হিসাব বেড়েছে প্রায় ৩ দশমিক ৭ শতাংশ। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সংখ্যা দিয়ে দেশে প্রকৃত কোটিপতি মানুষের সংখ্যা নির্ধারণ করা যায় না। এসব হিসাবের মধ্যে ব্যক্তি ছাড়াও কোম্পানি, করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও সরকারি সংস্থার হিসাব রয়েছে। একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান একাধিক ব্যাংক হিসাবও পরিচালনা করতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, জুন শেষে দেশের ব্যাংকগুলোতে মোট হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮ কোটি ৬৩ লাখ ৮৪ হাজার ৫৮৮টি। এসব হিসাবে মোট আমানতের পরিমাণ ২২ লাখ ১০ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকা। এর তিন মাস আগে মার্চ শেষে মোট আমানত ছিল ২১ লাখ ৫৮ হাজার ২ কোটি টাকা। সে হিসাবে মার্চ থেকে জুন—এই তিন মাসে ব্যাংক খাতের মোট আমানত বেড়েছে ৫২ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ শুধু কোটি টাকার হিসাবই বাড়েনি, একই সময়ে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় মোট আমানতের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ব্যাংকের কোটি টাকার হিসাব নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি। একটি ব্যাংক হিসাবে এক কোটি টাকা থাকা মানেই ওই হিসাবে থাকা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মোট সম্পদের পরিমাণ এক কোটি টাকা—এমন নয়। আবার একটি কোম্পানি বা সরকারি প্রতিষ্ঠানের হিসাবও এই পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান একাধিক ব্যাংকে একাধিক হিসাব পরিচালনা করলে প্রতিটি হিসাব আলাদাভাবে গণনা হওয়ার সম্ভাবনাও থাকে। তাই পরিসংখ্যানটি মূলত ব্যাংক হিসাবে এক কোটি টাকার বেশি আমানতের সংখ্যা বোঝায়, দেশে প্রকৃত কোটিপতির সংখ্যা নয়। গুরুত্বপূর্ণ দিক জুন শেষে এক কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাব ১ লাখ ৪১ হাজার ৫৬২টি। মার্চ শেষে এই সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৩৬ হাজার ৪৮৫টি। মাত্র তিন মাসে বেড়েছে ৫ হাজার ৭৭টি হিসাব। জুন শেষে ব্যাংক খাতের মোট আমানত ২২ লাখ ১০ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকা। মার্চের তুলনায় মোট আমানত বেড়েছে ৫২ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা। বাংলাদেশে বড় অঙ্কের ব্যাংক আমানতের হিসাবের এই বৃদ্ধি নতুন কোনো ঘটনা নয়। স্বাধীনতার পরের সময়ের সঙ্গে তুলনা করলে পরিবর্তনের মাত্রা আরও স্পষ্ট হয়। তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭২ সালে দেশে কোটি টাকার আমানত থাকা হিসাব ছিল মাত্র ৫টি। ১৯৯০ সালে তা বেড়ে হয় ৯৪৩টি। ২০০৮ সালে কোটি টাকার হিসাবের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৯ হাজার ১৬৩টি। এরপর ২০২০ সালের ডিসেম্বর শেষে তা বেড়ে হয় ৯৩ হাজার ৮৯০টি। পরবর্তী সময়েও সংখ্যা বাড়তে থাকে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বর শেষে কোটি টাকার হিসাব ছিল ১ লাখ ১৬ হাজার ৯০৮টি। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে তা দাঁড়ায় ১ লাখ ৩৪ হাজার ৪৪টিতে। আর চলতি বছরের জুনেই তা ছাড়িয়ে গেছে ১ লাখ ৪১ হাজার। এই পরিসংখ্যানের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো—একই সময়ে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের অর্থনৈতিক অভিজ্ঞতা এক নয়। উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের আয় ও ব্যয়ের হিসাবকে কঠিন করে তুলেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লে একই আয় দিয়ে আগের মতো সঞ্চয় করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক পরিবারকে জরুরি খরচ মেটাতে আগের সঞ্চয় ব্যবহার করতে হয়। অন্যদিকে বড় ব্যবসা, করপোরেট প্রতিষ্ঠান এবং উচ্চ সম্পদধারী মানুষের হাতে থাকা অর্থের একটি অংশ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় জমা হচ্ছে। পাশাপাশি ব্যাংকের বাইরে থাকা কিছু অর্থ আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থায় ফিরে এলেও মোট আমানত বাড়তে পারে। নিজস্ব পর্যবেক্ষণে, এই পরিসংখ্যানের আসল প্রশ্ন ‘কতজন কোটিপতি বেড়েছে’—এটি নয়; বরং ব্যাংকিং ব্যবস্থায় নতুন করে জমা হওয়া অর্থ সমাজের কোন অংশ থেকে আসছে এবং অর্থনীতিতে সেই অর্থ কীভাবে তৈরি হচ্ছে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শুধু কোটি টাকার হিসাব বাড়ছে বলেই সাধারণ মানুষের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক হবে না। ব্যাংকে বড় অঙ্কের আমানত বাড়ার সঙ্গে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের আর্থিক চাপের তথ্য পাশাপাশি রাখলে অর্থনীতিতে সম্পদ বণ্টনের বৈষম্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। তবে শুধু ব্যাংক আমানতের এই একটি পরিসংখ্যান দিয়ে আয় বৈষম্যের মাত্রা নির্ধারণ করা যায় না। এ জন্য মানুষের আয়, সম্পদ, ঋণ, মূল্যস্ফীতি, ভোগব্যয় এবং কর্মসংস্থানের মতো আরও অনেক সূচক একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির সুফল কতটা বিস্তৃত জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাচ্ছে, তা বুঝতে এমন সমন্বিত চিত্রই বেশি কার্যকর। একজন সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাংকে কোটি টাকার হিসাব বাড়ার খবর তখনই স্বস্তির হবে, যখন এর সঙ্গে কর্মসংস্থান, আয়, ক্রয়ক্ষমতা এবং জীবনযাত্রার মানও উন্নত হবে। শুধু ব্যাংকে বড় অঙ্কের টাকা জমা হচ্ছে—এটি অর্থনীতির একটি দিক দেখায়, পুরো অর্থনীতির ছবি নয়। তাই কোটি টাকার হিসাব বৃদ্ধিকে একদিকে অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর আস্থার সম্ভাব্য ইঙ্গিত হিসেবে দেখা যেতে পারে, অন্যদিকে কার হাতে সম্পদ জমা হচ্ছে এবং সেই সম্পদের সুফল কতটা মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে, সেই প্রশ্নও সামনে রাখা জরুরি।

তিন মাসে কোটি টাকার ব্যাংক হিসাব বেড়েছে ৫ হাজার ৭৭টি