দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর
সর্বশেষ

নিয়ামতপুরে একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় শোকের ছায়া, উঠানেই পাশাপাশি দাফন

নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামে একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় পুরো এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোক ও নীরবতা। যেই উঠানে প্রতিদিন শিশুরা খেলাধুলা করত, সেই উঠানেই পাশাপাশি চারটি কবর—এ দৃশ্য দেখে স্তব্ধ হয়ে পড়েছেন স্বজন ও স্থানীয়রা।নিহত দম্পতি ও তাদের দুই ছোট শিশুকে একসঙ্গে দাফন করা হয় বাড়ির উঠানেই, যা এলাকাবাসীর হৃদয়ে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে।উঠানেই পাশাপাশি চারটি কবরবুধবার (২৩ এপ্রিল) সন্ধ্যা ৬টার দিকে বাহাদুরপুর গ্রামের ওই বাড়ির উঠানে চারটি কবর খোঁড়া হয়। সেখানে শায়িত করা হয় নিহত হাবিবুর রহমান (৩৫), তার স্ত্রী পপি সুলতানা, এবং তাদের দুই সন্তান—৯ বছরের পারভেজ রহমান ও ৩ বছরের সাদিয়া আক্তারকে।স্বজনদের ভাষায়, মৃত্যুর পরও যেন তারা একসঙ্গেই রয়ে গেল। কবরের পাশেই দাঁড়িয়ে অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। পুরো পরিবেশে নেমে আসে শোকের ভারী আবহ।ময়নাতদন্ত শেষে গ্রামে ফেরে মরদেহএর আগে নওগাঁ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে মরদেহগুলো গ্রামে আনা হয়। মরদেহ আসার খবর ছড়িয়ে পড়তেই আশপাশের গ্রাম থেকে হাজারো মানুষ ছুটে আসেন শেষবারের মতো তাদের দেখতে।বাদ আসর জানাজা শেষে স্থানীয়রা চোখের পানিতে বিদায় জানান চারজনকে। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পুরো গ্রাম।শান্ত স্বভাবের পরিবারের করুণ পরিণতিস্থানীয়দের ভাষ্যমতে, হাবিবুর রহমান ছিলেন শান্ত ও নিরিবিলি স্বভাবের মানুষ। পরিবার নিয়ে তিনি গ্রামেই বসবাস করতেন। তাদের দুই সন্তানও এলাকার সবার কাছে পরিচিত ও প্রিয় ছিল।প্রতিদিন যে উঠানে শিশুদের হাসি শোনা যেত, সেই উঠানেই এখন চারটি কবর—এ দৃশ্য কেউই মেনে নিতে পারছেন না।একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “এমন ঘটনা এই গ্রামে আগে কখনও ঘটেনি। পুরো এলাকা এখন স্তব্ধ।”হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ও পুলিশি তদন্তপুলিশ জানায়, গত সোমবার গভীর রাতে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটে। নিজ ঘরের ভেতরেই ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলা কেটে হত্যা করা হয় একই পরিবারের চারজনকে।ঘটনার পরপরই এলাকায় আতঙ্ক ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। পরে নিহত পপি সুলতানার বাবা মোয়াজ্জেম হোসেন বাদী হয়ে নিয়ামতপুর থানায় মামলা করেন।তিনজন গ্রেপ্তার, চলছে তদন্তমামলার পর পুলিশ অভিযান চালিয়ে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে। তারা হলেন নিহত হাবিবুর রহমানের ভগ্নিপতি শহিদুল ইসলাম এবং তার ভাগ্নে শাহিন ও সবুজ।নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম জানান, প্রাথমিক তদন্তে পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের বিষয়টি সামনে এসেছে। সেই বিরোধ থেকেই এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।গ্রেপ্তারকৃতদের আদালতে হাজির করা হলে তারা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।আরও কেউ জড়িত কি না, চলছে অনুসন্ধানআইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, এই ঘটনায় আরও কেউ জড়িত আছে কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পলাতক আসামিদের ধরতে পুলিশ, ডিবি, সিআইডি ও পিবিআই যৌথভাবে কাজ করছে। প্রযুক্তির সহায়তায় অভিযান অব্যাহত রয়েছে।গ্রামে জমি বিরোধের দীর্ঘ ছায়াস্থানীয়দের মতে, গ্রামাঞ্চলে পারিবারিক জমি ও সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ অনেক সময় দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে। বাহাদুরপুরের ঘটনাটিও সেই পুরনো বিরোধের ভয়াবহ পরিণতি বলে মনে করছেন অনেকে।একজন স্থানীয় প্রবীণ বলেন, “ছোট বিরোধ যদি সময়মতো মেটানো না যায়, তাহলে তা ভয়ংকর রূপ নেয়—এই ঘটনা তারই প্রমাণ।”বিশেষজ্ঞদের মতসামাজিক বিশ্লেষকদের মতে, পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ দীর্ঘদিন ঝুলে থাকলে তা সম্পর্কের মধ্যে অবিশ্বাস ও উত্তেজনা তৈরি করে। অনেক ক্ষেত্রে এটি সহিংসতায় রূপ নেয়।তারা মনে করেন, এ ধরনের বিরোধ দ্রুত আইনি বা সামাজিকভাবে সমাধান করা না গেলে ভবিষ্যতে আরও বড় বিপদের আশঙ্কা থাকে।শোকাহত পুরো এলাকাএই হত্যাকাণ্ডে শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো বাহাদুরপুর গ্রামই যেন শোকে ডুবে গেছে। বিশেষ করে দুই শিশুর মৃত্যু মানুষকে বেশি নাড়া দিয়েছে।অনেকের চোখে এখনো ভেসে উঠছে সেই নিষ্পাপ মুখ দুটি। এলাকাবাসীর একটাই দাবি—দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা হোক এবং দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হোক।শেষ কথা নিয়ামতপুরের এই মর্মান্তিক ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল, পারিবারিক বিরোধ কত ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। একটি পরিবার এক মুহূর্তে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া শুধু একটি ঘটনা নয়, বরং সমাজের জন্য গভীর সতর্কবার্তা।

নিয়ামতপুরে একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় শোকের ছায়া, উঠানেই পাশাপাশি দাফন