দেশে ভয়াবহভাবে বাড়ছে হাম রোগ: একদিনে ১০ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ১৪২৮
দেশে আবারও উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে হাম (Measles) রোগের সংক্রমণ। গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ১০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একই সময়ে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ৪২৮ জন শিশু, যা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।এই সংক্রমণ বৃদ্ধির ধারা স্বাস্থ্য খাতে নতুন করে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য প্রকাশরোববার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুম থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ১০ শিশুর মধ্যে ৪ জনের মৃত্যু নিশ্চিতভাবে হামের কারণে হয়েছে। বাকি ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে হামের মতো উপসর্গ নিয়ে, যেগুলো এখনো পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়নি।[TECHTARANGA-POST:1066]একই সময়ে আক্রান্ত ১ হাজার ৪২৮ শিশুর মধ্যে—
১৫০ জনের শরীরে পরীক্ষার মাধ্যমে হাম নিশ্চিত হয়েছে
১ হাজার ২৬৮ জনকে সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে
স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সন্দেহভাজন রোগীদেরও পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।এক মাসে পরিস্থিতির ভয়াবহ চিত্রস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হয়েছে।এই সময়ে—
নিশ্চিতভাবে হাম আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু: ২৮ জন শিশু
হামের উপসর্গ নিয়ে সন্দেহভাজন মৃত্যু: ১৫১ জন শিশু
অর্থাৎ, মাত্র এক মাসে হাম ও এর উপসর্গে মোট ১৭৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।এছাড়া একই সময়ে—
নিশ্চিত আক্রান্ত শিশু: ২,৬৩৯ জন
সন্দেহভাজন আক্রান্ত শিশু: ১০,২২৫ জন
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে, কারণ অনেক ক্ষেত্রেই পরীক্ষা ছাড়াই চিকিৎসা নেওয়া হচ্ছে।হাম কী এবং কেন এটি ঝুঁকিপূর্ণহাম একটি ভাইরাসজনিত সংক্রামক রোগ, যা খুব দ্রুত এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তিতে ছড়ায়। বিশেষ করে যেসব শিশু টিকা নেয়নি বা যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তারা বেশি ঝুঁকিতে থাকে।হামের সাধারণ লক্ষণগুলো হলো—
উচ্চ জ্বর
কাশি
চোখ লাল হওয়া
শরীরে লালচে ফুসকুড়ি
সময়মতো চিকিৎসা না নিলে এটি নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, মস্তিষ্কে জটিলতা এবং এমনকি মৃত্যুর কারণও হতে পারে।টিকাদান কর্মসূচির ভূমিকাবাংলাদেশে বহু বছর ধরে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে শিশুদের হাম প্রতিরোধে কাজ করা হচ্ছে। এই কর্মসূচির আওতায় শিশুদের বিনামূল্যে হাম টিকা দেওয়া হয়।তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনো অনেক শিশু টিকা থেকে বঞ্চিত থাকে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চল ও কিছু শহুরে বস্তিতে সচেতনতার অভাব এবং টিকা গ্রহণে অনীহা বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিচ্ছে।স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সতর্কতা ও পদক্ষেপস্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে মাঠপর্যায়ে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যকর্মীদের সক্রিয়ভাবে আক্রান্ত ও সন্দেহভাজন শিশুদের পর্যবেক্ষণে রাখা হচ্ছে।অভিভাবকদের উদ্দেশে দেওয়া নির্দেশনায় বলা হয়েছে—
শিশুদের দ্রুত টিকাদানের আওতায় আনতে হবে
জ্বর বা ফুসকুড়ির মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেতে হবে
আক্রান্ত শিশুদের আলাদা রেখে চিকিৎসা দিতে হবে
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগজনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হাম একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ হওয়া সত্ত্বেও এর এই ধরনের বিস্তার অত্যন্ত উদ্বেগজনক।তাদের মতে, সময়মতো টিকাদান নিশ্চিত করা গেলে এবং জনসচেতনতা বাড়ানো গেলে এই সংক্রমণ অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।একজন বিশেষজ্ঞ বলেন, “হাম নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো টিকাদান কাভারেজ। যেখানে টিকা কম, সেখানে সংক্রমণ দ্রুত ছড়ায়।”গ্রামীণ এলাকায় ঝুঁকি বেশিবিশেষজ্ঞদের মতে, শহরের তুলনায় গ্রামীণ ও দূরবর্তী এলাকায় হাম সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি। কারণ সেখানে স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা, সচেতনতা এবং টিকা গ্রহণের হার তুলনামূলকভাবে কম।এছাড়া অনেক অভিভাবক রোগের প্রাথমিক লক্ষণকে গুরুত্ব না দেওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে পড়ে।জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য সতর্ক সংকেতবিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি শুধু একটি রোগের প্রাদুর্ভাব নয়, বরং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য একটি সতর্ক সংকেত।টিকাদান কর্মসূচি, স্বাস্থ্য শিক্ষা এবং দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা না গেলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।[TECHTARANGA-POST:1049]উপসংহারদেশে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যুর এই ঊর্ধ্বগতি শিশুস্বাস্থ্যের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে সংক্রমণ বাড়ছে, অন্যদিকে অনেক শিশু এখনো টিকার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। তাই এখনই প্রয়োজন টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা এবং অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো।