বৈরী আবহাওয়ায় লিচুর ফলন কমে দুশ্চিন্তায় সোনারগাঁয়ের চাষিরা, লোকসানের শঙ্কা বাগান মালিকদের
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলায় চলতি মৌসুমে লিচুর ফলন আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় গভীর দুশ্চিন্তায় পড়েছেন স্থানীয় চাষি ও বাগান মালিকরা। বৈরী আবহাওয়া, তীব্র তাপপ্রবাহ, অনিয়মিত বৃষ্টি এবং পোকার আক্রমণে বহু বাগানের মুকুল নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে গত বছরের তুলনায় এবার উৎপাদন অনেক কম বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।উপজেলার পৌরসভা, বৈদ্যেরবাজার, জামপুর ও সাদিপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন লিচু বাগান ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ গাছেই ফলের সংখ্যা কম। যেসব গাছে লিচু এসেছে, সেগুলোর আকারও তুলনামূলক ছোট। অনেক গাছের মুকুল ঝরে পড়ে গেছে আগেই।১১০ হেক্টর জমিতে ২৭২টি লিচু বাগান, তবু নেই আশানুরূপ ফলনউপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, সোনারগাঁয়ে প্রায় ১১০ হেক্টর জমিতে ২৭২টি লিচু বাগান রয়েছে। সাধারণত এই অঞ্চলটি লিচু উৎপাদনের জন্য পরিচিত হলেও এবারের পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন।[TECHTARANGA-POST:1183]স্থানীয় চাষিদের দাবি, মৌসুমের শুরুতে গাছে ভালো মুকুল এলেও পরবর্তী সময়ে আবহাওয়ার আচমকা পরিবর্তন সব কিছু ওলট-পালট করে দিয়েছে। কখনো প্রচণ্ড গরম, আবার হঠাৎ বৃষ্টি—এই ওঠানামার কারণে মুকুল ধরে রাখতে পারেনি গাছগুলো।একই সঙ্গে পোকার আক্রমণও বড় ক্ষতির কারণ হয়েছে বলে জানান অনেকে। এতে শুধু ফলন কমেনি, অনেক গাছে লিচু ধরাই বন্ধ হয়ে গেছে।চাষিদের হতাশা, বাড়ছে খরচের চাপলিচু বাগানের মালিক ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, এবারের মৌসুমে খরচ উঠানোই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সার, কীটনাশক ও শ্রমিক খরচ আগের মতোই থাকলেও উৎপাদন কমে যাওয়ায় আয় অনেক কমে গেছে।লিচু ব্যবসায়ী মাসুম বিল্লাহ বলেন, “গত বছর যে গাছে কয়েক হাজার লিচু পেয়েছিলাম, এবার সেই গাছেই অর্ধেকও নেই। পরিচর্যা আর ওষুধে অনেক টাকা গেছে, কিন্তু ফলন কমে যাওয়ায় লোকসানের আশঙ্কা করছি।”অন্যদিকে পৌর এলাকার লাহাপাড়া গ্রামের চাষি গোলজার হোসেন জানান, সময়মতো বৃষ্টি না হওয়ায় গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়েছে। পরে আবার অতিরিক্ত গরমে অনেক মুকুল ঝরে পড়ে। তাঁর ভাষায়, “বাজারে দাম কিছুটা ভালো হলেও ফলন না থাকায় লাভের মুখ দেখা কঠিন।”বাগানে গিয়ে দেখা মিলল বাস্তব চিত্রবিভিন্ন বাগান পরিদর্শনে দেখা গেছে, গাছগুলোতে আগের বছরের তুলনায় ফলের ঘনত্ব অনেক কম। কিছু কিছু গাছে অল্প লিচু ঝুলে থাকলেও আকারে সেগুলো ছোট ও অসম্পূর্ণ।চাষিদের কেউ কেউ জানিয়েছেন, আগের বছর যে জায়গায় শ্রমিকরা ব্যস্ত থাকতেন ফল সংগ্রহে, এবার সেখানে কাজের চাপ অনেক কম। ফলে মৌসুমী শ্রমিকদের মধ্যেও হতাশা তৈরি হয়েছে।[TECHTARANGA-POST:1162]বাজারে দাম বেশি, কিন্তু লাভ নেই চাষিদেরউৎপাদন কমে যাওয়ায় স্থানীয় বাজারে লিচুর সরবরাহও কম। এতে দাম কিছুটা বেড়েছে। তবে চাষিরা বলছেন, দাম বাড়লেও উৎপাদন কম হওয়ায় সামগ্রিক আয় কমে গেছে।ফলে যারা বড় পরিসরে বাগান করেছেন, তাদের অনেকেই এবার আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন।কৃষি অফিসের ব্যাখ্যা ও পর্যবেক্ষণউপজেলা কৃষি অফিস জানিয়েছে, চলতি মৌসুমে আবহাওয়ার অস্বাভাবিক পরিবর্তন লিচু চাষে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে তাপপ্রবাহ ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ফলন কমার অন্যতম কারণ।কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, কিছু ক্ষেত্রে চাষিদের পর্যাপ্ত পরিচর্যার অভাব এবং সময়মতো কীটনাশক প্রয়োগ না করাও উৎপাদন কমার পেছনে ভূমিকা রেখেছে।উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবু সাঈদ তারেক বলেন, “এবার বৈরী আবহাওয়ার কারণে কিছু এলাকায় লিচুর ফলন আংশিকভাবে কমেছে। আমরা চাষিদের নিয়মিত পানি দেওয়া ও পরিচর্যার পরামর্শ দিয়েছিলাম, তবে সবাই তা যথাযথভাবে অনুসরণ করেননি। তারপরও বেশিরভাগ এলাকায় ফলন মোটামুটি ভালো হয়েছে।”তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় চাষিদের আরও আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ও পরামর্শ দেওয়া হবে।জলবায়ুর প্রভাব ও কৃষকের ভবিষ্যৎ উদ্বেগবিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের অনিয়মিত আবহাওয়া এখন কৃষিখাতে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। শুধু লিচু নয়, অন্যান্য ফল উৎপাদনেও এর প্রভাব পড়ছে।সোনারগাঁয়ের মতো এলাকায়, যেখানে অনেক পরিবার লিচু চাষের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে ফলন কমে গেলে স্থানীয় অর্থনীতিতেও চাপ পড়ে।চাষিরা বলছেন, যদি সরকারি সহায়তা ও প্রযুক্তিগত পরামর্শ বাড়ানো না হয়, তাহলে আগামী মৌসুমেও একই ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা থেকে যাবে।[TECHTARANGA-POST:1152]শেষ কথাসব মিলিয়ে সোনারগাঁয়ের লিচু চাষিরা এবারের মৌসুমে এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। আবহাওয়ার অনুকূল না থাকা, পোকার আক্রমণ এবং সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাব মিলিয়ে ফলন কমে যাওয়ায় অনেকেই আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ার শঙ্কায় রয়েছেন।
তবে কৃষি বিভাগ বলছে, প্রয়োজনীয় সহায়তা ও পরামর্শ দেওয়া হলে আগামী মৌসুমে পরিস্থিতি কিছুটা হলেও উন্নত হতে পারে।