সুরে সুরে ডেঙ্গু সচেতনতা: রাজধানীতে ভ্রাম্যমান সংগীত কর্মসূচির উদ্বোধন
রাজধানীতে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার শঙ্কার মধ্যেই এবার ভিন্নধর্মী উদ্যোগ নিল ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি)। সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে গান, সংগীত ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মাধ্যমে শুরু হয়েছে ভ্রাম্যমান ডেঙ্গু প্রতিরোধ কার্যক্রম। শনিবার (১০ মে ২০২৬) আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের একান্ত সচিব আব্দুর রহমান সানি। অনুষ্ঠানে নগরবাসী, সাংস্কৃতিক কর্মী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু মাইকিং বা প্রচারণা নয়, মানুষের আবেগ ও অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দিয়েই এই ব্যতিক্রমধর্মী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন আয়োজকরা। তাদের দাবি, সচেতনতার বার্তা যদি মানুষের মন ছুঁতে পারে, তাহলে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে নাগরিক অংশগ্রহণ আরও বাড়বে।[TECHTARANGA-POST:1165]সংগীতের মাধ্যমে সচেতনতার বার্তাউদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ডেঙ্গু প্রতিরোধ নিয়ে বিশেষ সংগীত পরিবেশন করা হয়। বিভিন্ন শিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা গান, ছড়া ও পথনাটকের মাধ্যমে মানুষকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান। আয়োজকদের ভাষ্য, ডেঙ্গু প্রতিরোধকে শুধু প্রশাসনিক কাজ হিসেবে না দেখে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে হবে।অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, অনেক সময় মানুষ ডেঙ্গুর ঝুঁকি সম্পর্কে জানলেও নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখেন না। বাসার বারান্দা, ছাদ, ফুলের টব বা জমে থাকা পানিতে এডিস মশার লার্ভা জন্ম নেয়। এসব বিষয়ে মানুষকে মনে করিয়ে দিতে সাংস্কৃতিক মাধ্যম কার্যকর হতে পারে বলেও মত দেন তারা।ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টন বলেন, নগরবাসীকে সম্পৃক্ত না করে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। সিটি কর্পোরেশন নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করলেও নাগরিকদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল হতে হবে। তিনি আরও বলেন, সচেতনতার ঘাটতির কারণেই অনেক এলাকায় ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়ে।ভ্রাম্যমান কর্মসূচি চলবে বিভিন্ন এলাকায়জানা গেছে, এই সংগীতভিত্তিক সচেতনতা কার্যক্রম শুধু উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। রাজধানীর বিভিন্ন ওয়ার্ড, আবাসিক এলাকা ও জনবহুল স্থানে ভ্রাম্যমান টিম ঘুরে ঘুরে ডেঙ্গু প্রতিরোধের বার্তা পৌঁছে দেবে।কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন জানান, মানুষের মধ্যে ভয় তৈরি না করে সচেতনতা বাড়ানোই তাদের মূল লক্ষ্য। তাই প্রচারণায় ব্যবহার করা হচ্ছে সহজ ভাষা, গান এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার গল্প। এতে শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বয়স্ক মানুষও সহজে বিষয়টি গ্রহণ করতে পারছেন।একজন অংশগ্রহণকারী বলেন, “অনেক সময় প্রচলিত প্রচারণা মানুষ শুনতে চায় না। কিন্তু গান বা সাংস্কৃতিক আয়োজন হলে সবাই আগ্রহ নিয়ে শোনে। এতে বার্তাও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।”ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগপ্রতি বছর বর্ষা মৌসুমের আগে রাজধানীতে ডেঙ্গু প্রতিরোধ কার্যক্রম জোরদার করা হয়। তবে বিভিন্ন এলাকায় এখনও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, জমে থাকা পানি ও মশার বংশবিস্তার নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টদের মতে, সচেতনতার পাশাপাশি নিয়মিত মনিটরিংও জরুরি।নগরবাসীর একটি অংশের অভিযোগ, কিছু এলাকায় মশকনিধন কার্যক্রম নিয়মিত হলেও কোথাও কোথাও তা পর্যাপ্ত নয়। যদিও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, পরিস্থিতি মোকাবেলায় সমন্বিতভাবে কাজ চলছে এবং বিভিন্ন এলাকায় অভিযান অব্যাহত রয়েছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু শুধু একটি মৌসুমি রোগ নয়, এটি এখন নগর ব্যবস্থাপনার বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। তাই শুধু প্রশাসনের ওপর দায় চাপিয়ে দিলে হবে না; বাসাবাড়ি, অফিস এবং আশপাশ পরিষ্কার রাখার দায়িত্বও নাগরিকদের নিতে হবে।নাগরিক অংশগ্রহণ ছাড়া সমাধান কঠিন[TECHTARANGA-POST:1159]অনুষ্ঠানে বক্তারা আরও বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অনেক সময় দেখা যায়, সিটি কর্পোরেশন অভিযান চালানোর পরও কিছুদিনের মধ্যে আবার একই এলাকায় পানি জমে থাকে। এতে এডিস মশা দ্রুত বিস্তার লাভ করে।সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সংগীত ও সংস্কৃতিভিত্তিক এই প্রচারণা তরুণদের সম্পৃক্ত করতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন উদ্যোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং মানুষ আগ্রহ নিয়ে তা অনুসরণ করে।তবে কিছু নাগরিকের দাবি, সচেতনতামূলক কর্মসূচির পাশাপাশি বাস্তব পদক্ষেপ আরও বাড়ানো প্রয়োজন। বিশেষ করে ড্রেনেজ ব্যবস্থা, মশকনিধন ও নিয়মিত পরিদর্শন জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন তারা। যদিও পুরো বিষয়টি এখনও চলমান কার্যক্রমের অংশ এবং বিভিন্ন সংস্থা সমন্বয় করে কাজ করছে বলে দাবি করা হচ্ছে।সামাজিক প্রভাব ও বাস্তবতাডেঙ্গু এখন শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, এটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপও তৈরি করছে। পরিবারে কেউ আক্রান্ত হলে চিকিৎসা ব্যয়, কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়া এবং মানসিক উদ্বেগ—সবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি কঠিন হয়ে ওঠে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে আতঙ্ক আরও বেশি কাজ করে।এমন বাস্তবতায় সচেতনতামূলক কর্মসূচিকে অনেকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। কারণ মানুষকে নিয়মিত মনে করিয়ে না দিলে অনেকেই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেন না। তবে সচেতনতার পাশাপাশি কার্যকর মাঠপর্যায়ের উদ্যোগ এবং নাগরিকদের দায়িত্বশীল আচরণ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়তে পারে বলে মত সংশ্লিষ্টদের।বর্তমান অবস্থা ও করণীয়ডিএনসিসির এই ভ্রাম্যমান সংগীতভিত্তিক কর্মসূচি রাজধানীতে ডেঙ্গু প্রতিরোধ প্রচারণায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে বলে মনে করছেন অনেকে। আয়োজকরা জানিয়েছেন, আগামী দিনগুলোতে আরও বড় পরিসরে এ কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।এদিকে নগরবাসীকেও সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। বাসাবাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখা, তিন দিনের বেশি কোথাও পানি জমতে না দেওয়া এবং ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।