দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর
সর্বশেষ

ডাকসুর মেয়াদ শেষ, এখন ৯০ দিনের রুটিন দায়িত্বে বর্তমান কমিটি

এক বছর দায়িত্ব পালন শেষ করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)। কিন্তু নতুন নির্বাচনের তপশিল এখনও ঘোষণা হয়নি। ফলে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, সর্বোচ্চ আরও ৯০ দিন রুটিন দায়িত্ব পালন করতে হতে পারে বর্তমান কমিটিকে।নতুন নির্বাচন ঠিক কবে হবে, সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা দিতে পারেননি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম। তিনি জানিয়েছেন, ডাকসুর গঠনতন্ত্রে পরিবর্তন আনা হবে কি না, সে বিষয়েও সিন্ডিকেট সভায় আলোচনা হবে।এদিকে বর্তমান ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফরহাদ জানিয়েছেন, তাঁরা দায়িত্ব ছাড়তে চান। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নির্বাচন বা দায়িত্ব হস্তান্তর নিয়ে স্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত না আসায় পরিস্থিতি অনিশ্চিত হয়ে আছে।দীর্ঘ ২৮ বছর পর ২০১৯ সালে ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এরপর ছয় বছর পর ২০২৫ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে ১৪ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব নেয় শিবির-সমর্থিত প্যানেল।ডাকসুর গঠনতন্ত্রের ৬ নম্বর অনুচ্ছেদের (গ) উপধারা অনুযায়ী, নির্বাচিত কমিটির মেয়াদ ৩৬৫ দিন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন না হলে সর্বোচ্চ আরও ৯০ দিন দায়িত্ব পালন করার সুযোগ রয়েছে।তবে এই অতিরিক্ত সময়কে পূর্ণাঙ্গ নতুন মেয়াদ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। উপাচার্যের বক্তব্য অনুযায়ী, মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বর্তমান কমিটির কাজ হবে মূলত রুটিন দায়িত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তারা নতুন কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না।ডাকসুর ভিপি আবু সাদিক কায়েমের সঙ্গে দায়িত্ব ছাড়ার বিষয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তবে জিএস এস এম ফরহাদ বলেন, তাঁরা দায়িত্ব ছাড়তে চান।ফরহাদের ভাষ্য, প্রশাসন নির্বাচন দেওয়ার কথা বললেও বাস্তবে এখনো কোনো দৃশ্যমান কার্যক্রম নেই। ফলে শুধু আশ্বাসে তাঁরা সন্তুষ্ট নন।উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেছেন, ডাকসু নির্বাচন অবশ্যই হবে। এরই মধ্যে একটি সভা হয়েছে এবং হল প্রশাসন নির্বাচনের পরিবেশ আছে কি না, সে বিষয়ে তাঁকে চিঠি দেবে।তবে নির্বাচন আয়োজনের নির্দিষ্ট সময়সীমা দিতে পারেননি তিনি। তাঁর বক্তব্য, ডাকসু নির্বাচন বড় ধরনের আয়োজন। তাই ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানীও জানিয়েছেন, সব ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনের সম্মতি ও সহায়তা পাওয়ার পর নির্বাচনের তারিখ দেওয়া হবে।এখানেই মূল প্রশ্নটি তৈরি হয়েছে—নির্বাচনের জন্য ঐকমত্য তৈরির প্রক্রিয়া কতদিন চলবে? কারণ গঠনতন্ত্রে ৯০ দিনের একটি সীমা থাকলেও নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি দৃশ্যমান না হলে সেই সময়ও দ্রুত শেষ হয়ে যেতে পারে।বর্তমান ডাকসুর এক বছরের কার্যক্রম নিয়েও শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের দ্বিমত রয়েছে। সম্প্রতি ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক এ বি জুবায়ের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দেওয়া ৩৫ লাখ টাকা দিয়ে ডাকসু ৩৫ কোটি টাকার কাজ করেছে। তাঁর এই বক্তব্যের পর ডাকসুর কাজ ও ব্যয়ের ধরন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন কয়েকজন শিক্ষার্থী।সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তারের অভিযোগ, শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন ভোগান্তি কমানোর জায়গায় ডাকসু যথেষ্ট কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। তাঁর মতে, রেজিস্ট্রার বিল্ডিংয়ের প্রশাসনিক জটিলতা কমাতে ডিজিটাল ব্যবস্থা, ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতার মতো বিষয়গুলোতে প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসেনি।নারীদের হলের গেট রাত ১০টার মধ্যে বন্ধের প্রতিবাদে ছাত্রীদের আন্দোলনের প্রসঙ্গও তিনি তুলে ধরেন। তাঁর অভিযোগ, ওই সময় ডাকসু শিক্ষার্থীদের পাশে যথেষ্টভাবে দাঁড়ায়নি।অন্যদিকে আরেক শিক্ষার্থী সিরাজুম মুনিরার মতে, ডাকসু কিছু কল্যাণমূলক কাজ করেছে। তবে শিক্ষার্থীদের যে ভোগান্তির জায়গাগুলো সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়ার কথা ছিল, সেগুলো পুরোপুরি দূর করা সম্ভব হয়নি।সমাজসেবা সম্পাদক এ বি জুবায়ের এসব অভিযোগের জবাবে বলেন, ডাকসু নীতিগত জায়গায় কাজ করার চেষ্টা করেছে। রেজিস্ট্রার বিল্ডিংকে পেপারলেস করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রশাসনের বাধায় তা বাস্তবায়ন করা যায়নি বলে তাঁর দাবি। নারীদের হলের গেটের বিষয়েও তিনি প্রশাসনের অসহযোগিতার কথা উল্লেখ করেছেন।গুরুত্বপূর্ণ দিকবর্তমান ডাকসুর ৩৬৫ দিনের নিয়মিত মেয়াদ শেষ হয়েছে।নির্বাচন না হলে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সর্বোচ্চ আরও ৯০ দিন রুটিন দায়িত্ব পালন করা যাবে।নতুন নির্বাচনের নির্দিষ্ট সময়সীমা এখনো জানায়নি প্রশাসন।ডাকসুর এক বছরের কাজ ও ব্যয় নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে।গত ডাকসু নির্বাচনের প্রায় ১০ মাস আগে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকেই অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছিল আগের বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কিন্তু বর্তমান প্রশাসনের সময়ে নতুন নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিয়ে এখন পর্যন্ত তেমন দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যায়নি বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।ছাত্র সংগঠনগুলোর অবস্থানও এক নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি দুর্জয় রায় দ্রুত নির্বাচন দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন বলেছেন, তাঁদের সঙ্গে প্রশাসন এখনো নির্বাচনের বিষয়ে কোনো বৈঠক করেনি।শিক্ষার্থীদের মধ্যেও ভবিষ্যৎ নির্বাচন নিয়ে ভিন্নমত আছে। কেউ দ্রুত নির্বাচন চান, আবার কেউ মনে করছেন নির্বাচন আরও দীর্ঘ সময় পিছিয়ে যেতে পারে। তবে আরেক শিক্ষার্থী মো. হানিফের বক্তব্য, কোনো ছাত্র সংগঠনই শিক্ষার্থীদের আকাঙ্ক্ষার বাইরে গিয়ে নির্বাচন ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না।উপাচার্যের বক্তব্য অনুযায়ী, নিয়মিত মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় বর্তমান ডাকসু এখন আর আগের মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার অবস্থানে নেই। সর্বোচ্চ ৯০ দিনের রুটিন দায়িত্বের অর্থ হলো—প্রশাসনিক ধারাবাহিকতার প্রয়োজনীয় কাজ চলবে, কিন্তু নতুন নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ থাকবে না।এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি সীমারেখা। কারণ নির্বাচিত ছাত্র সংসদের মূল শক্তি আসে শিক্ষার্থীদের ভোটে পাওয়া ম্যান্ডেট থেকে। সেই মেয়াদ শেষ হওয়ার পর দীর্ঘ সময় একই কমিটি সক্রিয় থাকলে তাদের প্রতিনিধিত্বের বৈধতা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে।ডাকসু শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি সংগঠন নয়; দেশের ছাত্ররাজনীতি ও গণতান্ত্রিক চর্চার ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠান। তাই নির্বাচন নিয়ে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হলে তার প্রভাব ক্যাম্পাসের বাইরেও পড়তে পারে।শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা খুব জটিল নয়—নির্বাচন হলে সময়মতো হোক, না হলে কেন হচ্ছে না সেটিও পরিষ্কারভাবে জানানো হোক। প্রশাসনের কাছে স্বচ্ছ রোডম্যাপ থাকলে গুঞ্জন ও রাজনৈতিক সন্দেহ দুটোই কমবে।ডাকসুর সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু নতুন নির্বাচন আয়োজন নয়; ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি না করে নেতৃত্বের বৈধতা ধরে রাখা। ৯০ দিনের রুটিন দায়িত্বের সুযোগটি যদি নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতির সময় হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তাহলে এটি একটি স্বাভাবিক ট্রানজিশন হতে পারে। কিন্তু এই সময় যদি শুধু আশ্বাস আর অপেক্ষায় কেটে যায়, তাহলে ৯০ দিন শেষ হওয়ার আগেই নতুন করে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রশ্ন তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে।তাই এখন সবচেয়ে প্রয়োজন একটি পরিষ্কার নির্বাচনী রোডম্যাপ—কবে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা হবে, কবে পরিবেশ যাচাই হবে, কবে তপশিল এবং কবে ভোট। ডাকসুর পরবর্তী অধ্যায় নিয়ে অনিশ্চয়তা কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়ও সেটিই।

ডাকসুর মেয়াদ শেষ, এখন ৯০ দিনের রুটিন দায়িত্বে বর্তমান কমিটি