মতবিরোধের মধ্যেই জি-২০ অর্থমন্ত্রীদের বৈঠক শেষ, রাশিয়ার উপস্থিতিতে ইউরোপের অসন্তোষ
রাশিয়ার অর্থমন্ত্রী আন্তন সিলুয়ানভের উপস্থিতি ঘিরে ইউরোপীয় দেশগুলোর অসন্তোষ, চীনের আপত্তি এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব—বিভিন্ন মতবিরোধের মধ্যেই শেষ হয়েছে জি-২০ অর্থমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকারদের দুই দিনের বৈঠক।যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর ক্যারোলাইনা অঙ্গরাজ্যের অ্যাশভিলে অনুষ্ঠিত বৈঠকটি মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) শেষ হয়। বৈঠকে রাশিয়ার অংশগ্রহণ নিয়ে ইউরোপীয় প্রতিনিধিদের আপত্তি থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট দাবি করেছেন, রাশিয়ার উপস্থিতি আলোচনার ওপর উল্লেখযোগ্য কোনো প্রভাব ফেলেনি।জি-২০ বৈঠকে রুশ অর্থমন্ত্রী আন্তন সিলুয়ানভের উপস্থিতি ইউরোপীয় প্রতিনিধিদের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর দীর্ঘ সময় ধরে রাশিয়ার উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের এমন আন্তর্জাতিক বৈঠকে অংশগ্রহণ নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে আপত্তি রয়েছে।বৈঠকের প্রচলিত ‘ফ্যামিলি ফটো’তেও সিলুয়ানভকে দেখা যায়নি। ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের আপত্তির পর ছবিটি রুশ প্রতিনিধিকে বাদ দিয়েই তোলা হয়।কানাডার অর্থমন্ত্রী ফ্রাঁসোয়া-ফিলিপ শ্যাম্পেনও স্বীকার করেছেন, রাশিয়ার উপস্থিতি নিয়ে যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থনীতিবিষয়ক প্রধান ভালদিস ডোমব্রোভস্কিসের বক্তব্য, রাশিয়ার উপস্থিতিকে এখনো স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে দেখার সময় আসেনি।ইউরোপের আপত্তির বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার দরজা খোলা রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেন, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ ও আলোচনা চালিয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ।বেসেন্টের মতে, বৈঠকে অংশ নেওয়া প্রায় সব দেশ সম্মেলনের সভাপতির বিবৃতিতে সমর্থন দিয়েছে। তার দাবি, এতে বোঝা যায় রাশিয়ার উপস্থিতি আলোচনাকে বাধাগ্রস্ত করেনি।তবে একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়াকে অর্থনৈতিক সুবিধা দেওয়ার বিষয়ে কঠোর অবস্থানও জানিয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত মস্কোর জন্য অর্থনৈতিক স্বস্তির সুযোগ নেই—এমন বার্তাও বৈঠকের আলোচনায় উঠে এসেছে।বৈঠকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মতবিরোধ দেখা দিয়েছে চীনকে ঘিরে। জি-২০’র সভাপতির বিবৃতিতে অতিরিক্ত ও দীর্ঘস্থায়ী বাণিজ্যিক ভারসাম্যহীনতার ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করা হয়।বিশেষ করে বাজারব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন নীতির কারণে বৈশ্বিক বাজারে পণ্যের দামে চাপ এবং অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হতে পারে—এমন উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। তবে চীন এ বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে চীনের অতিরিক্ত শিল্প উৎপাদন ও কম দামে পণ্য রপ্তানি নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর সমালোচনার প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, জ্বালানি নিরাপত্তা, বাণিজ্যনীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতিও আলোচনায় ছিল। হরমুজ প্রণালীতে নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন নৌ চলাচলের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।জি-২০তে ১৯টি দেশ ছাড়াও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আফ্রিকান ইউনিয়ন রয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও আর্থিক স্থিতিশীলতা জোরদারের লক্ষ্যেই জোটটির কার্যক্রম পরিচালিত হয়।অ্যাশভিলের বৈঠকের মধ্য দিয়ে আগামী ডিসেম্বরে মিয়ামিতে অনুষ্ঠেয় জি-২০ নেতাদের শীর্ষ সম্মেলনের প্রস্তুতিও এগিয়েছে। তবে এবারের বৈঠক দেখিয়েছে, অর্থনৈতিক ইস্যুর সঙ্গে ভূরাজনৈতিক বিরোধ এখন জি-২০ আলোচনার ওপরও সরাসরি প্রভাব ফেলছে।গুরুত্বপূর্ণ দিক:রুশ অর্থমন্ত্রীর উপস্থিতি নিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর আপত্তিযুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনার পক্ষে অবস্থানচীনের সঙ্গে বাণিজ্য ভারসাম্য নিয়ে মতবিরোধমধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনাআগামী জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনের প্রস্তুতি এগিয়ে যাওয়াজি-২০ মূলত বৈশ্বিক অর্থনীতি নিয়ে কাজ করলেও সাম্প্রতিক বাস্তবতায় যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, জ্বালানি নিরাপত্তা ও বাণিজ্য বিরোধ থেকে অর্থনীতিকে আলাদা রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। এবারের বৈঠকের সবচেয়ে বড় বার্তা সম্ভবত এটিই—বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য শুধু অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, দেশগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগও গুরুত্বপূর্ণ।বিশেষ পর্যবেক্ষণ: রাশিয়ার উপস্থিতি নিয়ে ইউরোপের আপত্তি এবং একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনার দরজা খোলা রাখার অবস্থান জি-২০’র ভেতরের বাস্তব দ্বন্দ্বকে সামনে এনেছে। অর্থনৈতিক সহযোগিতার এই প্ল্যাটফর্মে ভবিষ্যতে ভূরাজনৈতিক মতবিরোধ কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।