পাহাড়ি এলাকায় ম্যালেরিয়ার থাবা, এখনো ঝুঁকিতে সীমান্ত অঞ্চল
দেশজুড়ে ম্যালেরিয়ার ভয় আগের তুলনায় কমলেও পাহাড়ি ও সীমান্তবর্তী এলাকায় এখনো এই রোগ শক্ত অবস্থানে রয়েছে। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় উদ্বেগ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত প্রায় ১৮ বছরে দেশে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন ৬ লাখেরও বেশি মানুষ। এই সময়ে মৃত্যু হয়েছে ৬৭৯ জনের। দেশের মোট ১৩টি জেলার ৭২টি উপজেলায় রোগটির উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এসব এলাকার বেশির ভাগই ভারত ও মিয়ানমার সীমান্ত ঘেঁষা।সবচেয়ে বেশি আক্রান্তের ঘটনা ঘটেছে রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে। বিশেষ করে বান্দরবানেই মোট রোগীর বড় অংশ পাওয়া গেছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, ঘন বন এবং বেশি বৃষ্টিপাত—এই তিনটি বিষয় সেখানে মশার বংশবিস্তার বাড়িয়ে দেয়। ফলে ম্যালেরিয়া সহজেই ছড়িয়ে পড়ে।বিশেষজ্ঞদের মতে, ম্যালেরিয়া মূলত ছড়ায় স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশার মাধ্যমে। এই মশা সাধারণত বনাঞ্চল ও আর্দ্র পরিবেশে বেশি জন্মায়। জ্বর, কাঁপুনি, ঘাম, মাথাব্যথা—এসব লক্ষণ দেখা দিলেই দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। সময়মতো চিকিৎসা না হলে রোগটি প্রাণঘাতী হতে পারে।দেশে ম্যালেরিয়ার প্রবণতা গত এক দশকে ওঠানামা করেছে। ২০০৮ সালের পর রোগীর সংখ্যা কমতে শুরু করলেও ২০১৩ ও ২০১৪ সালে হঠাৎ করে বেড়ে যায়। ২০১৪ সালে আক্রান্ত প্রায় ৬০ হাজারে পৌঁছে। এরপর আবার কমতে শুরু করে। তবে ২০২২ সালে আবার ১৮ হাজার রোগী শনাক্ত হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংখ্যা কিছুটা কমলেও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট ১০ হাজার ১৬২ জন ম্যালেরিয়া রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে শুধু বান্দরবানেই ৫ হাজারের বেশি রোগী পাওয়া গেছে। রাঙামাটি, কক্সবাজার ও খাগড়াছড়ি মিলিয়ে মোট আক্রান্তের প্রায় ৯৮ শতাংশ এই চার জেলাতেই সীমাবদ্ধ।মৃত্যুর ঘটনাতেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে। পার্বত্য এলাকায় গুরুতর রোগীরা চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রামে আসেন। ফলে মৃত্যুর বড় অংশ চট্টগ্রামের হাসপাতালগুলোতেই রেকর্ড হয়। গত বছর ১৬ জন মারা যান, যার মধ্যে ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে চট্টগ্রামে চিকিৎসাধীন অবস্থায়।জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু পরিবেশ নয়—মানুষের আচরণও এখানে বড় ভূমিকা রাখছে। পাহাড়ি এলাকার অনেক মানুষ নিয়মিত মশারি ব্যবহার করেন না। আবার অনেকেই অসুস্থ হওয়ার পর দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যান না। এতে রোগ জটিল হয়ে ওঠে।আরেকটি বড় কারণ হলো সীমান্ত এলাকা। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে মানুষের চলাচল ও সংযোগ থাকায় সংক্রমণ পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমারের মধ্যে যৌথ উদ্যোগ ছাড়া এই রোগ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।পটভূমি হিসেবে জানা যায়, বাংলাদেশে ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে গত দুই দশকে বড় ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকার ও বেসরকারি সংস্থাগুলো মিলে মশারি বিতরণ, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত পরীক্ষা-চিকিৎসা কার্যক্রম চালু করেছে। এতে শহর ও সমতল অঞ্চলে ম্যালেরিয়া প্রায় নিয়ন্ত্রণে এসেছে।এছাড়া আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘গ্লোবাল ফান্ড’-এর সহায়তায় দেশে ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচি চলছে। এই তহবিল মূলত এইডস, যক্ষ্মা ও ম্যালেরিয়ার মতো রোগ মোকাবিলায় বিশ্বজুড়ে কাজ করে।সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে ম্যালেরিয়াজনিত মৃত্যু শূন্যে নামিয়ে আনা এবং ২০৩৩ সালের মধ্যে পুরোপুরি রোগ নির্মূলের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এজন্য নজরদারি জোরদার, দ্রুত শনাক্তকরণ এবং দুর্গম এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে ভালো অগ্রগতি করেছে। তবে পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো নির্দিষ্ট এলাকায় এখনো বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।
সবশেষে বলা যায়, ম্যালেরিয়া আর সারা দেশের সমস্যা না হলেও নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় এটি এখনো ভয়াবহ। সচেতনতা, দ্রুত চিকিৎসা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করতে পারলে ভবিষ্যতে এই রোগ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।