দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর
সর্বশেষ

ওয়াশিংটনে ইসরায়েল–লেবানন কূটনৈতিক বৈঠক: যুদ্ধবিরতির পথ খুললেও উত্তেজনা কাটেনি

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির উত্তাপের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে মুখোমুখি বসেছেন ইসরায়েল ও লেবাননের শীর্ষ কূটনীতিকরা। প্রায় তিন দশকের বেশি সময় পর হওয়া এই সরাসরি বৈঠককে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন কূটনৈতিক সম্ভাবনা, তবে যুদ্ধবিরতির প্রশ্নে এখনো বড় ধরনের মতভেদ রয়ে গেছে। ফলে আলোচনার পরও অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে পরিস্থিতি নিয়ে।দুই দেশের বিরল মুখোমুখি আলোচনামার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর মধ্যস্থতায় অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে অংশ নেন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ইয়েচিয়েল লেইটার এবং লেবাননের রাষ্ট্রদূত নানা হামাদে মুওয়াদ। প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী এই বৈঠককে ১৯৯০-এর দশকের পর দুই দেশের মধ্যে সরাসরি উচ্চপর্যায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।বৈঠক শেষে দুই পক্ষই আলোচনাকে “ইতিবাচক” বলে উল্লেখ করলেও, যুদ্ধবিরতি বা স্থায়ী সমঝোতার বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট অগ্রগতি হয়নি বলে জানা গেছে।যুদ্ধবিরতি ইস্যুতে গভীর মতভেদআলোচনায় সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে উঠে এসেছে যুদ্ধবিরতির শর্তাবলি। ইসরায়েল পক্ষ স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, তাদের প্রধান লক্ষ্য হলো লেবাননের ভূখণ্ড থেকে হিজবুল্লাহর (Hezbollah) সামরিক সক্ষমতা কমানো বা সম্পূর্ণভাবে নিষ্ক্রিয় করা।অন্যদিকে লেবানন প্রতিনিধি দল দ্রুত যুদ্ধবিরতির ওপর জোর দিয়েছে। তাদের মতে, প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত সংঘাত বন্ধ করা এবং বাস্তুচ্যুত নাগরিকদের নিরাপদে নিজ বাড়িতে ফেরার পরিবেশ তৈরি করা।এই ভিন্ন অবস্থানই এখন আলোচনার ভবিষ্যৎকে জটিল করে তুলেছে।সংঘাতের পেছনের আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটবর্তমান সংঘাতের বিস্তৃতি মূলত মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার সঙ্গে সম্পর্কিত। ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান আঞ্চলিক টানাপোড়েন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সাম্প্রতিক হামলা ও পাল্টা হামলার ধারাবাহিকতায় সীমান্ত অঞ্চলে গোলাবর্ষণ, ড্রোন ও বিমান হামলা নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।ফলে ইসরায়েল–লেবানন সীমান্ত এখন কার্যত একটি সক্রিয় সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে পরিণত হয়েছে।হিজবুল্লাহর অনুপস্থিতি ও পাল্টা হামলাএই কূটনৈতিক আলোচনায় হিজবুল্লাহ অংশ নেয়নি। বরং সংগঠনটি এই বৈঠকের বিরোধিতা করে উত্তর ইসরায়েলের দিকে একাধিক রকেট ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।এতে বোঝা যায়, কূটনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের সংঘাতও সমানভাবে চলমান রয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও অস্থির করে তুলছে।ইসরায়েলের কঠোর অবস্থানইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ জানিয়েছেন, দক্ষিণ লেবাননের লিটানি নদী পর্যন্ত এলাকা সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ না হওয়া পর্যন্ত তারা সামরিক অবস্থান থেকে সরে আসবে না।বিশ্লেষকদের মতে, এই অবস্থান বাস্তবে একটি দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা বাফার জোন তৈরির পরিকল্পনার ইঙ্গিত দিতে পারে, যা লেবাননের সার্বভৌমত্ব প্রশ্নেও নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করছে।বৈশ্বিক অর্থনীতিতে উদ্বেগের ছায়াএই সংঘাতের আরেকটি বড় দিক হলো মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পথ হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz)। বিশ্বের তেল সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই রুট যদি বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম দ্রুত বেড়ে যেতে পারে।বিশ্ব অর্থনীতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে ইতোমধ্যেই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা সতর্কতা জারি করেছে।মানবিক সংকট গভীর হচ্ছে লেবাননেযুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে লেবাননে মানবিক সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, এখন পর্যন্ত ২ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং ১১ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।আবাসন, খাদ্য ও চিকিৎসা সংকট দিন দিন আরও তীব্র হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তাকে বাড়িয়ে তুলছে।স্থানীয় ও কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়াআলোচনার বিষয়ে দুই পক্ষের অবস্থান ভিন্ন হলেও বৈঠকটিকে একটি “কূটনৈতিক অগ্রগতি” হিসেবে দেখছেন কিছু আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক। তাদের মতে, দীর্ঘদিন পর সরাসরি সংলাপ শুরু হওয়াটাই ভবিষ্যতের জন্য একটি সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে।তবে অনেকে মনে করছেন, যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা ও রাজনৈতিক অবস্থান যদি না বদলায়, তাহলে এই আলোচনা খুব বেশি দূর এগোতে নাও পারে।প্রশাসনিক ও আন্তর্জাতিক উদ্যোগের প্রয়োজনবিশ্লেষকদের মতে, শুধুমাত্র দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় এই সংঘাত সমাধান করা কঠিন হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন হতে পারে।কূটনৈতিক চাপ, মানবিক করিডর এবং যুদ্ধবিরতির বাস্তব পরিকল্পনা ছাড়া পরিস্থিতি স্থিতিশীল করা কঠিন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।উপসংহারওয়াশিংটনে ইসরায়েল ও লেবাননের এই বিরল বৈঠক তাৎক্ষণিক কোনো সমাধান না দিলেও নতুন কূটনৈতিক সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছে। তবে যুদ্ধবিরতি, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে গভীর মতভেদ থাকায় পরিস্থিতি এখনো অস্থির। সব মিলিয়ে, আলোচনার টেবিলে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত শান্তির পথে এগোয় কিনা, নাকি আবারও সংঘাতের বাস্তবতায় ফিরে যায়—সেই প্রশ্নই এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়।

ওয়াশিংটনে ইসরায়েল–লেবানন কূটনৈতিক বৈঠক: যুদ্ধবিরতির পথ খুললেও উত্তেজনা কাটেনি