বৈদেশিক ঋণ বাড়লেও তাৎক্ষণিক সংকট নয়, মিলছে সাময়িক স্বস্তি
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক ঋণ এখন আর কেবল পরিসংখ্যান নয়; এটি নীতি নির্ধারণ, উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার কেন্দ্রীয় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে বিদেশি অর্থায়নের ওপর নির্ভরতা বাড়লেও সাম্প্রতিক প্রান্তিকের তথ্য বলছে, ঋণের প্রবৃদ্ধি কিছুটা ধীর হয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন—এই স্বস্তি সাময়িক; কাঠামোগত দুর্বলতা এখনো বহাল রয়েছে।মোট ঋণের চিত্র: সামান্য হ্রাস, ভেতরে সতর্কবার্তাবাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সংশোধিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে দেশের মোট বৈদেশিক ঋণ দাঁড়িয়েছে ১১২.১২ বিলিয়ন ডলার, যা জুনে ছিল ১১৩.৫৭ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ প্রায় ১.২৭ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।সংখ্যাগতভাবে এটি স্বস্তিদায়ক মনে হলেও বিশ্লেষকরা বলছেন, ঋণ কমার প্রধান কারণ সরকারি দায় হ্রাস নয়; বরং বেসরকারি খাতের স্বল্পমেয়াদি ঋণ সংকোচন। এতে ডলার প্রবাহ, বিনিয়োগ ও আমদানির গতি কমে যাওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।সরকারি খাত: দীর্ঘমেয়াদি দায়ের ভারসেপ্টেম্বর প্রান্তিকে সরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ দাঁড়িয়েছে ৯২.৫৪ বিলিয়ন ডলার—মোট ঋণের ৮০ শতাংশেরও বেশি। এর প্রায় সবটাই দীর্ঘমেয়াদি।উৎসভিত্তিক চিত্র
বহুপক্ষীয় ঋণ: ৪৭.২৩ বিলিয়ন ডলার (৪২%)
দ্বিপক্ষীয় ঋণ: ৩২.০৫ বিলিয়ন ডলার (২৮.৬%)
আইএমএফ ঋণ: ৬.১১ বিলিয়ন ডলার
বাণিজ্যিক ঋণ: ১১.২৯ বিলিয়ন ডলার
কম সুদের কারণে বহুপক্ষীয় ও দ্বিপক্ষীয় ঋণ তুলনামূলক সুবিধাজনক হলেও দীর্ঘমেয়াদে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হলে এসব ঋণ অর্থনৈতিক বোঝায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা: লুকানো দায়রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও সরকারি করপোরেশনগুলোর বৈদেশিক ঋণ দাঁড়িয়েছে ১২.০৬ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি দায় প্রায় ৮.৮৫ বিলিয়ন ডলার।অনেক প্রকল্প আয় সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হওয়ায় শেষ পর্যন্ত ঋণ পরিশোধের দায় সরকারের বাজেটের ওপর পড়ে—যা কার্যত জনগণের করের অর্থেই মেটাতে হয়।বেসরকারি খাত: ট্রেড ক্রেডিটে পতনবেসরকারি খাতের মোট বৈদেশিক ঋণ জুনের ১৯.৮৩ বিলিয়ন ডলার থেকে সেপ্টেম্বরে ১৯.৫৮ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে।স্বল্পমেয়াদি ঋণের পরিবর্তন
ট্রেড ক্রেডিট: ৭.০৮ → ৫.৯৯ বিলিয়ন ডলার
বায়ার্স ক্রেডিট: ৫.২৫ → ৪.১৫ বিলিয়ন ডলার
এতে বোঝা যায়, আমদানি কমেছে, ব্যবসায়ীরা সতর্ক অবস্থানে গেছে, কিংবা বৈদেশিক অর্থায়ন কঠিন হয়েছে।তবে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ সামান্য বেড়ে ৯.৯৬ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা শিল্পখাতে টেকসই বিনিয়োগের ইঙ্গিত দেয়।বেসরকারি ঋণের প্রধান উৎস দেশবাংলাদেশের করপোরেট বৈদেশিক ঋণের বড় উৎস কয়েকটি দেশ—
চীন: ৩.৪২ বিলিয়ন ডলার
নেদারল্যান্ডস: ১.৩৯ বিলিয়ন ডলার
যুক্তরাজ্য: ১.০৮ বিলিয়ন ডলার
যুক্তরাষ্ট্র: ৮৩৫ মিলিয়ন ডলার
হংকং: ৬১৬ মিলিয়ন ডলার
বিশ্লেষকদের মতে, ঋণের উৎস ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ায় কেন্দ্রীভূত হওয়ায় ভবিষ্যতে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।প্রধান ঝুঁকির ক্ষেত্র১. সরকারি খাতে অতিনির্ভরতা
২. ডলার আয়ের তুলনায় দায় বেশি
৩. রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের অদক্ষতা
৪. ট্রেড ক্রেডিট সংকোচনে শিল্পে চাপ
৫. ঋণের উৎসে ভৌগোলিক কেন্দ্রীভবনবিশেষজ্ঞদের মত: ঋণ নয়, আয় বাড়ানোই সমাধানঅর্থনীতিবিদরা বলছেন, ঋণ কমানোই একমাত্র লক্ষ্য নয়। বরং—
ঋণের খরচ কমানো
প্রকল্প থেকে আয় নিশ্চিত করা
রফতানি ও রেমিট্যান্স বৃদ্ধি
উৎপাদনশীল বিনিয়োগে অর্থ ব্যবহার
—এই চারটি বিষয় নিশ্চিত করলেই টেকসই সমাধান সম্ভব। অন্যথায় ঋণ ‘ডেট ট্র্যাপ’-এ পরিণত হতে পারে।করণীয় কী?বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি সুপারিশ করেছেন—
ঋণ গ্রহণের আগে টেকসইতা বিশ্লেষণ বাধ্যতামূলক করা
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সংস্কার
রফতানি বহুমুখীকরণ
আমদানিনির্ভরতা কমানো
প্রকল্প অনুমোদনে কঠোর ব্যয়–সুবিধা বিশ্লেষণ
দীর্ঘমেয়াদি শিল্প অর্থায়ন বাড়ানো
সামনে কোন পথ?সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের তথ্য সাময়িক স্বস্তি দিলেও প্রকৃত চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। সরকারি দীর্ঘমেয়াদি দায়, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা এবং বেসরকারি অর্থায়নের সংকোচন—সব মিলিয়ে অর্থনীতিতে সতর্কতার বার্তা দিচ্ছে।বাংলাদেশের উন্নয়নের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে একটি মৌলিক প্রশ্নে—ঋণ বাড়িয়ে উন্নয়ন, নাকি আয় বাড়িয়ে টেকসই প্রবৃদ্ধি?
টেকসই পথ একটাই: ঋণ নয়, উৎপাদন ও আয় বৃদ্ধিনির্ভর অর্থনীতি।